একটু অপেক্ষা


আজ হঠাৎ ই কেন জানি না, ছেলের আবদারে বল খুঁজতে স্টোর রুমে গিয়ে হঠাৎ স্তব্ধের মত বসে পরলাম পুরানো সেই পড়ার টেবিলটাতে আর তাতে পরে থাকা ডাইরিটায় হাত বুলাতে লাগলাম। প্রথম পাতা খুলতেই মনে পড়ে গেল আমার মনের পর্দায় ঢাকা মুহুর্ত গুল
সেই রাতের কথা,
বাবা সেদিন বাড়ি ফিরছিল না। মাকেও অতটা চিন্তিত দেখছিলাম না। কারন আমার বাবা অমনি। মাকে জিজ্ঞেস করলে বলল
দেখ কোথায় হয়ত গিয়ে আবার জুয়া খেলতিসে সে
ওই কথা অমনভাবে ঘুরিয়ে দিয়ে বলল
বাবা, আয় তুই ভাত খা।
না মা তুমি খাইছ?
হা খাইছি রে বাপ, নে তুই খা।
না না তুমি খাও নাই।
মা আবার চোখের কোনে জল নিয়ে বলল অমন করতে নাই বাবা,তুই খেয়ে ঘুমা।

সকাল হতেই দেখি বাড়ি ভর্তি মানুষ। বিছানা ছেড়ে উঠে বারান্দায় গিয়ে আমি যা দেখলাম তা সহ্য করার মত ক্ষমতা আমার ছিল না। আমি ভাবতেও পারি নাই আমাদের পরিবারে এমন একটা বড় ধাক্কা লাগবে। আমাদের কে একা করে দিয়ে আমার বাবা চিরতরে চলে গেছেন সেই ওপারে ওই পরপারে। যেখান থেকে কেউ ফেরে না। নাম না জান সেই অচিন না ফেরার দেশে, যেখানে সবাই যেতে পারে কিন্তু ফেরে না। কে বা কারা যেন আমার বাবা কে মেরে ফেলে দিয়ে চলে গেছে।
ন্যায় বিচারের জন্য স্থানীয় গ্রাম্ম্য প্রতিনিধি ও পুলিশের কাছে গেলে তারা শুধু বলত
যা তো বিরক্ত করিস না।।যাহ্‌ যাহ।
তখন শুধু ভাবতাম, আচ্ছা এটাই কি তাদের দায়িত্ব। সরকার কি এই জন্য তাদের কাজ দিছে।নাকি এটাই বর্ত্তমান সমাজ।।যদি এটাই বর্তমানের সংস্কারিত সমাজ তাইলে আমি থুতু দেই এদের ও এদের সমাজ কে।

অনেক কষ্ট করে আম্মু আমাদের ওখানকার এক সুয়েটার কারখানায় কাজ নিলেন আমাদের সংসার ও আমার লেখাপড়ার তাড়নায়। আমি তখন সবে দশম শ্রেনিতে পড়ি ভেবে পাচ্ছিলাম না কি হবে আমাদের? কি করব আমি? এই প্রশ্নগুলো যখন মাথার ভিতর ঘুরত তখন সকালের সুর্যের সুক্ষ্ম কিরনের মত একটু আশার আলো খুজে পেলাম। সেদিন স্কুলে ছিল সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতার স্কুল বাছাই পর্ব একজনি নিবে। ছাত্র হিসেবে অতটা খারাপ না হওয়ায় শিক্ষক আমার নাম দিয়ে দিল। সেদিন কোন প্রস্তুতিই আমার ছিল না তবুও কিভাবে যেন আমি টিকে গেলাম। যেদিন মুল প্রতিযোগিতা ছিল সেদিন পরে যাবার মত আমার তেমন কিছু ছিল না, মা কোথায় থেকে যেন একটা সুয়েটার এনে দিলেন প্যান্ট আগে থেকেই ছিল তাই । মাকে জিজ্ঞেস করলাম কই পাইছ? বলল যে বাবা তাড়াতাড়ি যা দেরি হয়ে যাচ্ছে। মার দোয়া নিয়ে আমি গেলাম পরীক্ষা দিতে। আল্লাহর রহমতে আমি উপজেলায় প্রথম হলাম। তারপর আমার স্যার বলল তার বাড়ি থেকে পড়াশুনা করতে এবং উনি আমার মাকে বলে দিবেন। স্যারের ওখানে থেকে পরীক্ষা দিয়ে আমি জেলা, বিভাগ ও দেশের মধ্যেও প্রথম স্থান অধিকার করলাম। বেশ কিছু টাকাও পেলাম আমি।
তা দিয়ে মার জন্য একটা শাড়ি কিনলাম, কিছু আরো জিনিসপত্র কিনলাম। আজ বাড়ি যাচ্ছি আমি। প্রথমে বাড়ি গিয়েই আগে আমি মায়ের গলা ধরে চুমু খাব তারপর মার হাতে আমার কেনা শাড়ি টা তুলে দিব। মা কতই না খুশি হবে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ট্রেন স্টেশনে চলে আসল বুঝতেও পারিনি।
এবার একটা রিকশা নিয়ে বাড়ি গেলাম গিয়ে যা দেখলাম তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। বাড়ি যেতে না যেতেইই শুনলাম আমার মা নাকি হাজতে। মনে হল সে সময় আমার মাথার উপর যেন পুরো আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।
আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না কি হতে কি হয়ে গেল। কি করব ভেবে না পেয়ে স্যারের কাছে গেলাম উনি বললেন, আমার মা যে সুয়েটার কারখানায় কাজ করত সেখান থেকে সুয়েটার চুরি করে এনে আমায় দিয়েছিল। কাপড় ছিল না বলে মা ওদের একটা সুয়েটার দেবার জন্য বলেছিলেন কিন্তু যখন তারা দেয় নি তখন নাকি মা চুরি করেছেন। আচ্ছা যে মানুষ এত সুয়েটার তৈরি করে তার কি একটা সুয়েটার ও প্রাপ্য নয়। আমার মা চোর নয়। আমার মা চোর নয়। আমার কোন কথাই তাদের কানে গেল না। তারা আমার মাকে কোর্টে চালান করল। টাকা নেই বলে কোন উকিল ঠিক করতে পারলাম না আমার মায়ের জেল হয়ে গেল ১০ বছর। সব যেন আমার চোখের সামনেই ঘটে গেল কিছুই করতে পারলাম না আমি।

এর কয়েকদিন পর জাপানী এক সংস্থা আমার মেধা ও আমার পরিস্থিতি দেখে আমার পড়াশুনার ভার নিতে চাইল।।আমার শিক্ষক এই ব্যাবস্থা করে দিলেন। আমার অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মায়ের কড়া নির্দেশে রাজি হলাম। মা শুধু বলল,
বাবা আমার সপ্ন পূরন করিস।
দশ বছর পর আমি যখন আসলাম তখন শুনলাম এক মাস আগে নাকি আমার মা মারা গেছে। আচ্ছা বিধাতা আমার সাথে কেন এমন খেলে? আচ্ছা মা আর একটু অপেক্ষা করতে পারলা না? ও মা আর একটু অপেক্ষা!!
আমি তোমার সপ্ন পূরন করে ফিরেছি একটু ওই মাটি থেকে উঠে এসে আমায় দেখ না মা!
আজ আমি এক মস্ত বড় ইঞ্জিনিয়ার। বাড়ি গাড়ি সব আছে। কিন্তু কোথাও প্রান নেই। আজও আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে
মা! দেখ না তোমার ছেলে তোমার সপ্ন পূরন করছে। তোমার ছেলে তোমার সপ্ন পুরন করছে।
আমার মা যদি আমার জন্য আর একটু অপেক্ষা করত তাইলে…………..
অপেক্ষা,
সেটাই আর করল না।
বাবা ও বাবা কাঁদছ কেন? ছেলের ডাকে হুশ ফিরল। দেখি পানিতে ডাইরিটা ভিজে গেছে। ছেলেকে বললাম ওই চোখে কিছু পড়ছিল।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।