নীল বলপেন

– চা খাবেন?
– হুম । চিনি ছাড়া । ক’দিন হল ডায়াবেটিস ধরেছে। চিনি স্পর্শ নিষেধ।

মিসির আলি হাসি মুখে চা নিয়ে ফিরলেন।  বললেন, আপনার জন্য সুখবর, ঘরে চিনি নেই। আজ না হয় চিনি ছাড়াই  চা খেলাম।
-আমি কিছু বলতে চাচ্ছিলাম ।
মিসির আলি তা অগ্রাহ্য করে বললেন , আপনার একটা বিশেষত্ব আছে। আপনি দরজায় এলেই বোঝা যায় কে এসেছে ।
– কিভাবে ?
– সবাই বাসার কলিংবেল চাপ দিয়ে প্রকাশ করে কেউ এসেছে। তবে আপনি তা করেন না। টোকাও দেন না। কড়া নাড়েন । আমি হাসি হাসি মুখে বললাম, ও আচ্ছা।
মিসির আলি বললেন, কোন কাজে এসেছেন নাকি এমনিতেই গল্প গুজব? -না এমনি। অনেক দিন আপনার সাথে দেখা হয় না। তাই চলে এলাম ।
মিসির আলি চা শেষ করে সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, আমার UNSOLVED খাতাটার কথা মনে আছে?
-জি । মনে আছে ।
-ওখানকার ২৯ নম্বর ঘটনাটা বলি । অনেক ইন্টাররেস্টিং। আপনার লেখালেখিতেও কাজে দিতে পারে ।
-আপনি নম্বরও মনে রাখেন?
-অবসরে খাতাটা নিয়েই বসি। রহস্য সমাধানের চেষ্টা করি। দেখতে দেখতে মুখস্ত হয়ে গেছে।
আমি মাথা নেড়ে বুঝালাম যে আমি বুঝেছি ।
তখন রাত ৮টা বেজে ২৭। মিসির আলি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে খাতে পা তুলে বসে গল্প বলতে শুরু করলেন।

ঘটনাটা বেশ কয়েক বছর আগের । এক সকালে আমার কাছে একটা চিঠি আসে। চিঠির খামে ঠিকানা লেখা নেই। প্রেরকের ঘরে লেখা মুস্তাকিম হিমেল, খুব সম্ভবত ৯ম-১০ ক্লাসের ছাত্র। মজার বিষয় হলো খামের মধ্যে ছিল একটা কলম, একটা চিঠি আর কিছু ছেড়া কাগজ। কাগজ গুলো সম্ভবত ডায়েরি থেকে ছেড়া হয়েছে। চিঠিতে খুব স্পষ্ট হরফে লেখা ছিল ,

শ্রদ্ধেয় মিসির আলি ,
আমি আপনার সম্পর্কের কেউ নই। আপনার ছাত্রও নই। তবে বলতে পারেন আপনার ভক্ত  আপনাকে নিয়ে লেখা সব বইই পড়েছি। আপনার বুদ্ধিমত্তা দেখে আমি বাকরুদ্ধ। তাই আপনাকে নিজের জীবনের একটা রহস্য পাঠাচ্ছি। আপনার আগ্রহ থাকলে দয়াকরে আগামি বুধবার আদাবর ১৩৬ নং রোডে ‘খাবারের দুনিয়া’  রেস্টুরেন্টে চলে আসবেন। আমি বিকেল ৫ টা থেকে আপনার জন্য অপেক্ষা করবো।
ইতি
হিমেল মোস্তাকিম

-ছেলেটা একটা কাগজে অনুরোধ করে চিঠি লিখেছে । আর অন্য কাগজে রহস্য লিখে পাঠিয়েছে ।
-বাহ আজকাল দেখি ছেলেমেয়েরাও আপনাকে রহস্যও পাঠাতে শুরু করেছে!  ভাল।
মিসির আলি হাসলেন। কিছুক্ষণ থেমে বলা শুরু করলেন । ছেলেটা রহস্য এর শিরোনাম দেয় ‘নীল বলপেন’ ।

নীল বলপেন?
আপনাকে যে কলম পাঠালাম সেটাই এই নীল বলপেন। আমার দাদা তার মৃত্যুর আগে আমাকে এই কলমটা দেয়। দাদা কোথা থেকে কলমটা পায়, জানা নেই । কলমটার বিশেষত্ব হল লেখক কলমটা দিয়ে যদি নিজের সম্পর্কে কোন নেগেটিভ কথা লেখে তাহলেতা সত্যি হয়ে যায় । আমি অন্যকে নিয়ে নেগেটিভ কথা লিখেছি। তবে তা কখোনই ঠিক হয় নি । নেগেটিভ কাজ কর্মের ভয়াবহতা দেখে আর কলমটা ব্যাবহার করি না ।
আপনার ঠিকানাটা অনেক কষ্টে পেয়েছি। জানি না চিঠি আপনার পর্যন্ত পৌঁছাবে না কিনা। তবে আপনার কাছে অনুরোধ যদি পারেন একটু চেষ্টা করবেন বুধবারে আসার জন্য।

-ছেলেটার চিঠি ও লেখা দেখে মনে হল ছেলেটা খুব অন্যমনস্ক । কারন সে আমাকে নেগেটিভ লেখা কাগজ গুলো পাঠিয়েছে। তবে তা রহস্য লেখাতে উল্লেখ করেনি। আর ঠিকানা পেতে কষ্ট হয়েছে – এগুলো চিঠিতে লেখা উচিত ছিল।
-নেগেটিভ লেখা কথা গুলো কি ছিল?
-একটা কাগজে লেখা,
“লেখা পড়ার যা অবস্থা ,পরীক্ষায় তো ফেল করবো”
-আরেকটাতে তে লেখা ,
“ছেলেটা যে ভাবে হুমকি দিলো , কবে যে মার দেয় কে জানে”
-৩য় টা একটু বেশিই সন্দেহজনক আমার বিশ্বাস এটা দেখেই ছেলেটা বুঝতে পায়  হয়তো কলমে  সমস্যা আছে ।
-কি ছিল সেটাতে?
-“দেশের যানজটের যা অবস্থা, আমি যে কবে অ্যাকসিডেন্ট করে রাস্তায় পরে থাকি”
-তার মানে প্রথমে ফেল করে, তারপর মার খায়, তারপর অ্যাকসিডেন্ট?
-হুম। আমি যা বুঝলাম ছেলেটা’নেগেটিভ মাইন্ড এর একজন। আমার মনে হল এগুলো কোন একভাবে মিলে গেছে। তবে কিছু খটকা আছে। তাই আমি ভাবলাম “খাবারের দুনিয়া” রেস্টুরেন্ট এ যাবো । কিছু প্রশ্নের উত্তর পেলেই হবে ।
-আপনি নিজে কোন নেগেটিভ কথা লিখে পরীক্ষা করেননি?
-করেছি। বুধবার আদাবর যাওয়ার আগে কাগজে কলমটা দিয়ে লিখেছিলাম,
“আজ আমার পকেটমার হবে । কোন এক কারনে হয়তো আমি হাসপাতালে থাকবো ।”
-এগুলো কি সত্যি হয়েছিল?
-আমি বাসে উঠি শ্যামলি যাবো বলে । হঠাৎ চোখটা বন্ধ হয়ে যায়। চোখ খুলে নিজেকে আবিষ্কার করি আমি হাসপাতালে। ডাক্তার বলে আমি নাকি দুই দিন ঘুমিয়ে ছিলাম। হাতে ক্যানুলা লাগানো। স্যালাইন ছিল একমাত্র  খাদ্য। সুস্থ হয়ে দেখি আমার পকেটে তাকা পয়সা নেই। ছিনতাইকারি  বোধহয় আমাকে তাদের তৈরি কিছু খাইয়েছিল অথবা নাকে চেপে ধরেছিল। তাই তার ইফেক্ট এত দৃঢ় ।
-কলমটা কি আপনার সাথে ছিল নাকি ঘরে ?
-ঘরে। ঠিকানা না থাকায় হিমেলের কোন সন্ধান পেলাম না ।
-আপনিতো বিভিন্ন ভাবে অনেক ঠিকানা বের করতে পারেন । হিমেলেরটা কেন করলেন না?
মিসির আলি হাসলেন। তার মুখে এমন হাসি খুব কম দেখা যায়। বললেন , এখন আপনাকে একটা কথা বলবো । যার জন্য আপনি একেবারেই প্রস্তুত নন । প্রস্তুতি হিসেবে আরও এককাপ চিনি ছাড়া চা চলবে ?
-অবশ্যই ।
মিসির আলি দেখি ভালোই চা বানায় । চিনি ছাড়া চা তেমন ভাল লাগে না তবে সে বানিয়েছে অপূর্ব ।
মিসির আলি বললেন, আমি হাসপাতালে থেকে ঘরে ফিরে কলমের বিবরণ লিখতে বসলাম । কালো রঙের কলম। কলমের হেড টাও কালো, শিষ মাথাটা রুপালি ।
আবার মিসির আলির মুখে আগের মত দুর্লভ হাসি দেখা গেল। সে বলল, তারপর আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। দেখি সকাল হয়েছে। চোখে আলো পড়ছে ।
আমি অবাক হয়ে বললাম, সকাল হয়ে গেছে মানে? আপনি এতক্ষন সপ্ন দেখছিলেন ? রহস্য শেষ তাহলে ?
মিসির আলি ৪র্থ সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন , রহস্যের সবথেকে বড় ঘটনাটা এখানেই ঘটে। আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি টেবিলে একটা সাদা খাম কোন নাম লেখা নেই সেখানে। খামের ভেতর সেইরকম একটা কলম, ২ টা ভাল কাগজ মনে হয় চিঠি ছিল , কিছু ছেড়া কাগজ রুল টানা। খাম কিভাবে টেবিলে আসলো আমার জানা নেই । এটাও রহস্য। তবে অবাক ব্যাপার সেই কলমটাতে কোন কালি নেই। আর কাগজ গুলতে কোথাও কোন লেখা নেই। সব সাদা কাগজ। লোকটা বোধহয় সব কিছু নীল বলপেন দিয়ে লিখে ছিল। সপ্ন সাদা কালো হয় তাই বোধহয় স্বপ্নে বুঝিনি ।
-আপনি এবারও চাইলে প্রেরকের ঠিকানা বের করতে পারতেন ? তাই না ?
-পারতাম যদি কলমটা ডাকে পাঠানো হতো হতো । তবে চিঠিটা ডাকে পাঠানো হয়নি । কিভাবে আমার কাছে আসে তা আমি এখনো বের করতে পারিনি । তবে আমি আদাবর গিয়েছিলাম ঠিক তার পরের বুধবারে ।
-কি দেখলেন সেখানে?
-মিসির আলি হালকা হেসে বললেন, আদাবরে ১৩৬ নং রোডই নেই ।
-কলমটা কি এখনো আছে আপনার কাছে?
-সেটা বলবো না । আপনার কাছে না হয় সেটা শুধু রহস্য হয়েই থাকুক, আমার কাছে অমীমাংসিত ।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।