লেবু – বেলু

-অ্যাই লেবু অ্যাই । লাস্ট বেঞ্চে পড়ে পড়ে ঘুমনো হচ্ছে?
লেবু একদম অস্ট্রেলিয়ান ক্যাঙ্গারুদের মত করে লাফ দিয়ে দাঁড়াল । আর গলা ছেড়ে গান শুরু করলো , ও পিয়া ও পিয়া তুমি কোথায় , ও পিয়া ও পিয়া তুমি কোথায় ।
সবাই হো হো করে হাসি শুরু করার আগেই জব্বার স্যার তার বিখ্যাত থাপ্পড় দিয়ে ক্লাস থামিয়ে দিলো ।

— লাস্ট বেঞ্চে পড়ে পড়ে পিয়াকে ডাকা হচ্ছে? এই টুকু ছেলে । নাক টিপলে তো একটা বড়সর দুধের ব্যবসা শুরু করা যাবে । কালকেই তোর আব্বাকে নিয়ে আসবি । তোর পিয়াকে আমি জাহান্নাম এ পাঠাবো।

-স্যার আমার তো আব্বা নাই ।
স্যার হঠাৎ একটু থতমত খেলো । মাথা ঠাণ্ডা করে বলল, আচ্ছা তোর হোমওয়ার্ক কালকে ২০ বার করে আনবি!

– আচ্ছা স্যার ।

বাড়ি যাওয়ার পথে বেলু লেবুকে বলল,  কিরে করবি নাকি ২০ বার ?

– কাঁচ কলা । কালকে স্যার এর ক্লাস নাই । আছে আবার সেই শনি বার । এত দিনে স্যার এই কথা ভুলে আলু ভর্তা ।

আলু ভর্তা ব্যাপারটা বেলু বুঝলো না । তবে এমন হাসি দিলো সব বুঝে গেছে ।
যাওয়ার পথে লেবু বটতলায় বেশ ভিড় দেখতে পেল । ভিড়ের উপলক্ষ জানার কৌতূহলে বটতলার দিকে গেলো ।
বেলু বেশ ভয় পাওয়া গলায় বলল , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি এখনও বেছে আছে ?
লেবু গম্ভীর গলায় বলল , আমি যত দূর জানি ১৯৭১ সালে তিনি জীবন দেয় দেশের জন্য । তাকে মনে হয় একটা বড় পুরষ্কার দেওয়া হয় । বীর উত্তম সম্ভবত ।
বেলু এ কথা শুনে আত্মহত্যা করতে মন চাইলো । রেগে যেয়ে বলল , গাধা রবীন্দ্রনাথ লেখক ছিল ।
– হ্যাঁ । তিনি যুদ্ধের ফাকে ফাকে অবসরে কবিতা লিখত । বুজিস না অনেক প্রতিভাবান ।
লেবুর সাথে এই বিষয়ে তর্কে জড়ানোর মত বৃথা চেষ্টা বেলু করলো না । কারণ সে জানে লেবু কোন ভাবেই রবীন্দ্রনাথ কে লেখক বলবে না ।
– তোর কি মনে হয় লোকটা রবীন্দ্রনাথ। ধুর বোকা রবীন্দ্রনাথ এর কি আর কাজ নেই। সে দেখ ৩য় বিশ্ব যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ হল লালন। দেখছিস না কেমন বড় বড় দাড়ি। রবীন্দ্রনাথের দাড়ি নেই। সে যুদ্ধের মাঝে মাঝে সময় পেলেই শেভ করতো ।
বেলু লেবুর কোথায় বেশ বিরক্ত হল ।
কিছুক্ষণের মধ্যে লেবু-বেলুর কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেলো । এটা রবিন্দ্রনাথ-লালন কেউই নয়। এই লোক হল সাধু। তিনি দেশ বিদেশ পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ায় আর হাত গননা করে, তার মাথার উপর একটা সাইনবোর্ড । লেখা ,
“এখানে কম খরচে নীখুঁত হাত গননা করা হয়
গননায় ভুল হলে দবল টাকা ফেরত। গিরান্টি”
লেবু খুশি খুশি গলায় বলল, কাল না পরীক্ষার খাতা দিবে। কত নম্বর পাবো দেখে আসি চল।
বেলু বলল , সাইনবোর্ড দেখেছিস ? কত বানান ভুল ।
– বানান থিক দিয়ে কি হবে ? কত মানুষ হাত দেখাচ্ছে দেখিস না । আর সাধু লেখা পড়া জানে নাকি ?
– তা ঠিক বলেছিস ।
– চল চল হাত দেখায় আসি ।

সুবিশাল সুদীর্ঘ সুপ্রশস্থ লাইন পার করে অবশেষে লেবু-বেলু সাধুর সামনে। সাধুবাবার নিয়ম হল প্রথমে তার সামনে রাখা বাক্সে টাকা দিতে হবে তারপর আসন নিতে হবে । টিফিনের টাকা থেকে জমানো তাকার পুরোটাই ধেলে দিলো বক্সে আজ কাল সাধুদের ফিস একটু  বেশিই।
লেবু বেলু কদমবুসি করে সাধু বাবার সামনে রাখা চটে বসলো । একই সাথে ২ জন হাত বারিয়ে দিলো । সাধু লেবুর দিকে তাকাতেই লেবু বলল , আমাদের কালকে পরীক্ষার রেসাল্ট দিবে। আপনি কি একটু  বলবেন পাস হবে নাকি। সাধু লেবুর হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, পাস ।
লেবুর সব গুলো দাঁত তখন ঝিলমিল করছে। যে কোন টুথপেস্ট এর বিজ্ঞাপনে চোখ বুজে তার জায়গা হবে।
সাধু বেলুর হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, ভবিষ্যৎ অন্ধকার, ফেল ।
বেলু সাথে সাথে হাত টান দিয়ে নিয়ে নিলো। সাধু রেগে যেয়ে বলল এত বড় বেয়াদবি? তোর কোন দিন ভাল হবে না। দূর হ আমার সামনে থেকে। লেবু-বেলু বেশ ভয় পেয়ে সাধুর সামনে থেকে চলে গেলো।
লেবুর দাঁত এখনো ঝিলমিল করছে । আর বেলুর মন খারাপ । বেলু চুপচাপ বাড়ি চলে গেলো। অস্ট্রেলিয়ান ক্যাঙ্গারুদের মত লাফাতে লাফাতে গেলো বরকত ভাই এর মিষ্টির দোকানে।
– ভাই সব থেকে দামি মিষ্টিটা দাও । পরিক্ষায় পাস করেছি তো সবাইকে মিষ্টি খাওয়াতে হবে। আর টাকা নিয়ে ভেব না। আমি পরে দিয়ে যাবো।
সে দিন লেবু মাকে মিষ্টি খাওয়ালো। প্রতিবেশীদের ঘরে ঘরে মিষ্টি পাঠালো।
পরদিন স্কুলে লেবুর মন ভীষণ খারাপ। সে ৪ সাবজেক্ট এ ফেল করেছে । তাকে রজব স্যার ক্লাস এর বাহিরে মুরগি বানিয়ে রেখেছে ।
বেলু পাস করায় তার মন ভাল । লেবুর জন্য তার দুঃখ হচ্ছে । কারণ লেবুর মিষ্টি খাওয়ানোর বিষয় টা বেশি বারাবারি ছিল।
ক্লাস শেষে লেবু বলছে, ব্যাটা ভন্ড  সাধু। আমার টাকা মেরেছে। ওর কাছ  থেকে আজ ডবল টাকা ফেরত নিবো । আমার মিষ্টির বাকির টাকা উশুল করতে হবে ।
আমার টাকা ও নিতে হবে । সাধুকে ভাবছি ওই টাকার মিষ্টি খাওয়াবো । তার আবার ডায়াবেটিস নাই তো ?
সাধু সেখানে নেই । তবে আরেকটা সাইনবোর্ড দেখা গেলো । সেখানে লেখা ,
মোট ৩০৪১ টাকা
৩০৪১ x ২ = ০
[প্রমাণিত]

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।