প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » সার্থক স্বার্থপরের সন্ধানে

সার্থক স্বার্থপরের সন্ধানে

স্বার্থপরের প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী যাদের মারাত্মক স্বার্থপর মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়,তাদের অনেককেই দেখবেন ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিতে ‘দুনিয়াটা এতো স্বার্থপর কেন?’
আমরা বোধ হয় বুঝি না স্বার্থপর বড্ড আপেক্ষিক শব্দ; হয়তো আমাদের দায়িত্বশীল সমাজ এর সংজ্ঞাকে নিম্নগামী করে রেখেছে।
আমাদের বিকৃত মানসিকতায় ভর করা স্বার্থপরতার বিকৃত সংজ্ঞা আমরা জেনেছি মাঠে-ঘাটে, হাটে, স্কুলে।
প্রতিনিয়ত নিজেদের সাথে নিজেরাই প্রতারণা করে নিজের অজান্তেই হয়ে যাচ্ছি আত্মহননকারী।
আমার মতে একটা সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠায় অনেক বেশী স্বার্থ আছে শুধুমাত্র নিজের জন্য বা নিজের পরিবারের জন্য ভাবার চেয়ে,
স্বার্থ আছে কোমল শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণায়।
নিজের আত্মাকে শান্তি দেয়ার স্বার্থ আছে বিপদগ্রস্থের পাশে দাঁড়ানোয়।
খেলার মাঠে নিজে নিজে সারাদিন ব্যাটিং করার চেয়ে অনেক বেশী সুখ আছে দলবেঁধে খেলা উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে ফিল্ডিং করে চোখ জুড়ানোয়।
শুধু নিজে পড়ে নিজে ভালো করার চেয়ে বেশী স্বার্থপরের কাজ বন্ধুদের নিয়ে একটা কঠিন বিষয়কে চমৎকার শিক্ষণীয় বিষয়ে পরিনত করায়।
ঘরে বসে কুনোব্যাঙ হওয়ার চেয়ে অনেকবেশী স্বার্থ লুকিয়ে আছে শীতার্ত, অসহায়, সুবিধাবঞ্চিতদের ঘরে ঘরে ছুটে চলায়।
নিজেকে জান্নাতে পাওয়ার জন্য নিভৃতে কপালে কালো দাগ ফেলার চেয়ে অনেক বেশী সুখের কাজ একজন ওমরের একজন আলীর একজন মোহাম্মদ(সঃ) এর প্রকৃত অনুসারী হওয়ায় যে নিজের গোটা সমাজকে ইনসাফ দেয়ার জন্য সব ত্যাগ করতে পারে।
কথায় কথায় আমি তো শেষ বলার চেয়ে অনেক বেশী স্বার্থ আছে আমার যেসকল নেয়ামত(মা-বাবা/সন্তান/পরিবার/বন্ধু/আত্মীয়) আছে তাদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে আজকের এই রঙ্গিন দিনটিকে সর্বাঙ্গীণভাবে উপভোগ করায়।
কবিতার শক্তি উপলব্ধিতে স্বার্থ আছে,
সেলুলয়েডের পর্দায় হারিয়ে যাওয়ায় সে কি মজা!!
সংগীতের ঝলকানি যে বুঝেই না সে স্বার্থের আবার কি বুঝবে?
বসন্তের আকাশের সৌন্দর্য বুঝায় স্বার্থ আছে, টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ অনুভবে সে কি স্বার্থ?
স্বার্থ আছে মাটির রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটায়।
এতো মিডিয়ার ভিড়ে প্রিয়জনের চিঠির অপেক্ষায়, আহা! সে কি স্বার্থপর সুখ ! খাওয়ার টেবিলে মায়ের বকুনি উপেক্ষা করে বইয়ের ক্লাইমেক্সে হারানোর তুলনা হয়?
গ্লামার আর রঙের ভিড়ে কয়লার স্তুপে পাওয়া হীরার টুকরা বন্ধুকে সেই চিনতে পারে যে নিজেকে বড্ড ভালোবাসে।
মেকি তারকাদের এই ব্রহ্মাণ্ডে নিজের সত্যিকারের হিরোকে চিনতে হলে একজনকে হতে হবে নিপাট স্বার্থবাজ;
নিজে নিজে হাজার মানুষের জননেতা সাজার চেয়ে অনেক বেশী আত্মতৃপ্তির কাজ সত্যিকার অর্থেই একজন মানুষের মননেতা হওয়ায়।
অর্থের নেশায় মত্ত হয়ে জীবনের সুবর্ণ সময় জলাঞ্জলি দেয়ার চেয়ে অনেক বেশী বুদ্ধির কাজ আপনজনের ভিড়ে জীবনের আর্থিক তাগিদ পুরনে লড়াই করায়;
সো কলড হায়ার সোসাইটির ফাইভ স্টারের মেকি সেলফি হাসির চেয়ে অনেক বেশী স্বার্থের অকৃত্তিম বন্ধুদের সাথে সস্তা হোটেলের টেবিলে গড়াগড়ি খাওয়া অট্টহাসিতে।
এই ক্ষুদ্র জীবনের তুচ্ছ সমস্যায় খণ্ডিত হওয়ার চেয়ে অনেক বেশী স্বার্থপরতার কাজ মিলে মিশে দলবদ্ধভাবে সকল প্রতিকুলতার মোকাবেলা করায়;

আসলে, ভালো কাজের ত্যাগী মোড়কে জড়ানো প্রত্যেকটি কাজই অনেক বেশী স্বার্থে ভরা।
তাই একজন মানুষ যতটা ভালো কাজ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে নিজের অজান্তে ঠিক ততটাই সুখ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
একগাদা টাকা ব্যাঙ্কে জমানোর চেয়ে অনেক বেশী স্বার্থপরের কাজ অর্জিত টাকায় প্রিয়জনদের নিয়ে দুনিয়া দেখে চক্ষু শীতল করায়। অমূল্য হাসি দেখতে অর্থকে অনর্থে পরিনত করায়।
একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখবেন ভালো মানুষ হিসেবে চিহ্নিত মানুষগুলো বড্ড বেশী স্বার্থপর।

বড় সাহেব সেজে কথায় কথায় তো অনেকেই বি প্রাকটিক্যাল টাইপ বুলি কপচায়।
সত্যিকার অর্থে অন্তরের আলোয় আলোকিত মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশী প্রাকটিক্যাল কারন তারা জানেন নিয়তির কাছে মানুষ কতো অসহায়,
অনুভব করেন জীবনটা কতো ছোট; প্রতিনিয়ত প্রদক্ষিণ করেন মানবসভ্যতার নির্মম ইতিহাসে; স্মরণীয়দের কর্মে তারা খুজতে চান অনুপ্রেরনা;
অন্ধ স্বার্থবাজের ক্ষণস্থায়ী জীবনের মায়া ত্যাগ করে তারা মরিয়া হয়ে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকতে চান জন্ম জন্মান্তরে।
অমর হয়ে থাকতে চান গান, কবিতা, নৃত্য হয়ে।
কোমলমতি শিশুর নতুন জামা হয়ে, অভাবগ্রস্থ কিশোরদের খেলার সরঞ্জাম হয়ে; শীতার্তের বস্ত্র হয়ে, মুমুর্ষের রক্ত হয়ে।

প্রকৃত স্বার্থপররা কখনো রবি ঠাকুরে খোঁজেন সমস্যার সমাধান, কখনো মেহেদী হাসানের সুরে হন তন্দ্রাচ্ছন্ন, কখনো শশাঙ্ক রিডেম্পশানে খোঁজেন জীবনের মানে; ভিভিএস লাক্সমানের ব্যাটিং ইন্টেলিজেন্স তাদের মুগ্ধ করে; রোনালদোকে ভালোবাসলেও মেসির শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করার মতো দলকানা হয়ে যান না।
এপার বাংলা ওপার বাংলা অগ্রাহ্য করে তাদের হৃদয়ে ঘুরপাক খায় সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল, জহির রায়হান।
অন্ধ জাতীয়তাবাদের দেয়াল ভেঙ্গে একই কামরায় বসত করে ইস্টউড আর নায়ক রাজ রাজ্জাক।

আফসোস নিজের তৈরি মেকি স্বার্থের বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়া কিছু লোক কখনোই ভালো থাকে না কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার হলো এরা প্রতি আগামি’দিনই গতদিন অনেক সুন্দর ছিলো বলে হতাশা ব্যাক্ত করে।

সমাজ পরিবর্তনের প্রথম ধাপ স্বার্থপরতার প্রকৃত সংজ্ঞায়ন। ব্যাক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত কলঙ্কিত হওয়া কখনোই স্বার্থপরতা হতে পারেনা। নতুন প্রজন্মের কাছে এই সংজ্ঞা পৌঁছে দিতে সবচেয়ে বেশী ভুমিকা রাখতে হবে শিক্ষক সমাজকে। একবার ভেবে দেখুন এই সুন্দর দিনগুলো আরও কতই না চমৎকার হবে যদি সবাই প্রকৃত স্বার্থপর হয়ে সত্যিকার অর্থেই স্বার্থপরতার সার্থকতা উপলব্ধি করতে পারে।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।