নিতুর ডাইরী

-চা চা চা চা।  গাধা উটে চা খা।  চা চা চা চা।

আমি বুঝলাম প্রতিদিন সকালে ৫০ কি.মি. বেগে যে ঘুর্ণিঝড় আমার মাথার উপর দিয়ে সাই সাই করে যায় তা আজও ঠিক সময় আঘাত হেনেছে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হিসেবে শুধু আমার মহামুল্যবান ঘুম ভাঙা বলা যেতে পারে। চোখ কচলাতে কচলাতে কন্ঠে যথেষ্ট বিরক্তি ভাব এনে বললাম
-এত চিল্লাস ক্যান?
–  কেমনে সম্ভব?  তোর জন্য চা নিয়ে এলাম আর তুই….
-খুব কাজ করেছেন।  এবার দয়া করে যাবেন?
-যাবোইতো,  তোর রুমে থাকতে এসেছি নাকি। হুহ।  আমার রুম নাই?
-জ্বি সেখানেই যান আপাতত।
-ধুর… তোর জন্য চা আনাটাই ভুল হইছে।

বিড়বিড় করে কি বলতে বলতে  নিতু রাগের চোটে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো। এখন সে মার কাছে গিয়ে অনেক চিল্লাচিল্লি করবে আর আমাকে দুনিয়ার সব খারাপ বিশেষণে বিশেষায়িত করবে।

আজ ২৩ তারিখ নিতুর জন্মদিন। আমি সারাদিন বাইরেই ছিলাম। নিতু ভেবেছে আমি ভুলে গেছি তাই কয়েকবার ফোন করেছে।  ফোন করেই শুধু বলেছে
-ভাইয়া তুই কই?
-কেনো,  কি দরকার?
– না কিছুনা,  এমনিতেই।  রাখি।

নিতু মুখটা গোল করে বসে আছে বিকেল থেকে।  তার মন ভীষন খারাপ।আমি ছাদে গিয়ে তাকে ফোন করলাম “নিতু উপরে আয়তো “বলেই ফোনটা কেটে দিলাম। আমি একটা কেক এর পাশে চারটা মোমবাতি জ্বালিয়ে দাড়িয়ে আছি।  নিতু এসেই তো অবাক হয়ে গেলো। আমি বলতে লাগলাম
“Happy Birthday To U, Happy Birthday To U,  Happy Birthday To U Dear Gadiiii “

নিতু দৌড়ে এসেই জড়িয়ে ধরলো আমাকে।
-এতো রাগ করলে চলে রে পাগলী।  একদিন ঠিকই চলে যাবি আমাদের ছেড়ে।
-কখনও যাবনা ভাইয়া।
-আমরা তোকে বিদেয় করে দেবো।  হা হা হা।
-ভাইয়াআআআআআ।

বিকেল বেলা। নিতু বেলকনিতে দাড়িয়ে আছে। আমিও গেলাম।
-ছেলেটা কে রে নিতু?
-কোন ছেলেটা ভাইয়া।
-ঐ যে রোজ আমাদের বাসার সামনে দাড়িয়ে থাকে?
-আমি কি জানি,  সে কেনো দাড়িয়ে থাকে।
-ঐ সময় তোকে ও তো বেলকনিতে দেখা যায়।
– অদ্ভুত! আমি বেলকুনিতে  আসবোনা?
-ওহ!  তাহলে দেই হাড়গুড় ভেঙে।
-ভাইয়া মাস্তানের মতো কথা বলছিস ক্যান।
-মাস্তান ক্যান হতে যাবো,  এটা সব ভাইদের দায়িত্ব। মার খাওয়ার পর দেখা যাবে ব্যাটা কত বড় রোমিও।
-তুই আসলেই একটা. ….

নিতু বলতে গিয়েও বললোনা, উঠে চলে গেলো।

আজ নিতুর বিয়ে। সেই ছেলেটার সাথেই।  খোজ-খবর নেওয়া হয়েছিলো। ছেলেটা ভালো পরিবারের। ষ্টাডি কমপ্লিট। কয়েকদিনের ভিতর ই জব জয়েন করবে।
আমি বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসেছি। কনে বিদেয় করার সময় এসেছে। নিতু খুব কান্নাকাটি করবে। দেখতে ভালো লাগবেনা। সহ্য করতে পারবোনা।

সন্ধে হয়ে এসেছে।  বাসার অবস্থা ঠান্ডা। মা তার রুমে কাঁদছেন। বাবা ইজি চেয়ারে বসে কি ভাবছেন।
আমি নিতুর রুমে ঢুকেছি।ছিমছাম সুন্দর রুম। মেয়ে জাতিকে আল্লাহপাক এই একটা জিনিষ দিয়ে দিয়েছেন। সব কিছুর যত্ন নিতে পারে। টেবিলের উপর একটা ডাইরি দেখলাম। নিতুর ডাইরি। ডাইরিটা খুল্লাম।

সুন্দর গোটা গোটা অক্ষরে লিখা।

০৭/০৭
আজ বাবা ভাইয়াকে অনেক বকেছে কারণ ভাইয়া দেড়ি করে ঘুম থেকে উঠে  আমার খারাপ লেগেছে। ভাইয়াটাও একটা গাধা। ডাকতে ডাকতেও তাকে ঘুম থেকে তুলা যায়না। মনচায় মুখে পানি ঢেলে দেই হি হি হি হি।

২৩/০৮
ভাইয়া আজ আমার জন্মদিনে কি সুন্দর সারপ্রাইজ দিলো। আমি জানি সে টাকা ধার করে এনে কেক কিনে এনেছে কারন তার কাছে কোনো টাকা নেই। মাঝে মাঝে সে আমার কাছে থেকেও টাকা নেয় ফেরত দেয়না। তবুও আমার ভাইয়া শ্রেষ্ট ভাইয়া।

১২/০৯
ভাইয়া রাহুলের কথা জেনে গেছে।  কি লজ্জার কথা।  সে বলেছে রাহুলের হাড়গুড় ভেঙে দেবে। সত্যি সত্যি কি দেবে?  ইয়াল্লাহ!

পড়তে পড়তে ক ফোটা অশ্রু ডাইরির পাতায় পরলো। আমি চোখ মুছলাম।
রুমে এসে বিচানায় বসলাম। ঘুমিয়ে পড়বো। কাল থেকে আর কেউ চা চা চা চা বলে ঘুম ভাঙাবেনা। অদ্ভুত পৃথিবীর সব নিষ্ঠুর নিয়ম।  শুধু আপন মানুষ কেড়ে নিতে জানে।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।