প্রচ্ছদ » আমাদের সাহিত্য » চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহাসিক স্থান সমূহ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহাসিক স্থান সমূহ

আমাদের অর্ধ বার্ষিক পরিক্ষার শেষ দিনে আমারা ঠিক করলাম আমাদের জেলার ঐতিহাসিক নিদর্শন সমূহ পরিদর্শনে যাব। সেই মোতাবেক দুইটি গাড়ি ঠিক করা হলো এবং পরিক্ষার পর আমারা গাড়ি তে চেপে বসলাম।  রাস্তার দুই ধারে সবুজ এর সমারোহ, আলো আধারের খেলা, আর মাইলের পর মাইল আমের বাগান দেখেতে দেখতে কখন যে ১ ঘন্টা মত পার হয়ে গেছে তার খেয়াল নাই। চারদিকে যেন আমের রাজ্য, চাপাইনবাবগগঞ্জে বেশ কিছু দেখার জায়গা আছে, আমরা আজ মুলত খানাইয়া দিঘি মসজিদ, ছোট সোনা মসজিদ আর কানসাট বাজার দেখব।
রাস্তায় চা পানের বিরতি আর দুপুরের খাওয়ার পর আমরা চল্লাম খানাইয়া দিঘি মসজিদের দিকে। যে তিনটি জায়গার নাম বললাম, এইটিই সবচেয়ে দূরে।
খানাইয়া দিঘি মসজিদ
 IMG_8897
চাপাই শহর থেকে খানাইয়া দিঘি মসজিদ দুরত্ব আনুমানিক ১ ঘন্টা ২০ মিনিট। যানবাহনের ধরনের উপর নির্ভর করবে সময় কম বা বেশী লাগে।
খানাইয়া দিঘি মসজিদ, ইন্ডিয়া সিমান্তের খুব কাছাকাছি। খানাইয়া দিঘি মসজিদ বিশাল এক দিঘির পাড়ে যা খানাইয়া দিঘি নামে পরিচিত। ১৪শ সালের দিকে এই মসজিদ নির্মিত। লোকাল অনেকে এই মসজিদকে “চামচিকা” মসজিদ ও বলে আবার রাজবিবি মসজিদ নামেও এর পরিচিতি আছে। অত্যান্ত রুচিশীল কারুকার্জ বিদ্যমান মসজিদের দেয়াল ঘিরে। বিভিন্ন ধরনের নকশা মুলত এই মসজিদের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহূগুন। বর্গাকার আকৃতির মসজিদটি মুলত ইট দিয়ে তৈরি।
IMG_8892
মসজিদের চারপাশ ঘিরে আমবাগান, আর এখন মুলত আমের মৌসুম । গাছ থেকে ঝুলছে বিশাল বিশাল সাইজের আম। এই গুলোই কিছুদিন পর কানসাট হাট পার হয়ে ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন যায়গায় রওনা দিবে।
 IMG_8900
মসজিদের সামনেই খানাইয়া দিঘি। অনেক ধরনের পাখি দেখলাম মুক্ত মনে বিচরন করছে সেখানে।  যেহুতু পাখি বিশারদ নই তাই এই গুলার নাম আমার কাছ থেকে জানতে চাওয়া আমার লজ্জার কারন হবে আরকি।
ঘন্টা দুইয়েক খানাইয়া মসজিদ আর এর আশে পাশে দর্শন শেষে আমরা চল্লাম ছোট সোনামসজি এর দিকে।
ছোট সোনামসজিদ
IMG_8913
চাপাই জেলার পশ্চিম সীমান্তে শিবগঞ্জ থানার ফিরোজপুর মৌজাস্থিত এই ছোট সোনামসজিদটি সুলতানী আমলের স্থাপত্য কীর্তিগুলোর মধ্যে শিল্প ভাস্কর্যের অন্যতম নিদর্শন। গঠনভঙ্গি বৈচিত্রময় এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই মসজিদের গম্বুজগুলির মধ্যস্থলে কেন্দ্রীয় গম্বুজ হিসিবে বাংলাদেশে প্রচলিত চৌচালা বাড়ির চালের মতো পরস্পর তিনটি গম্বুজ সংযোজিত রয়েছে। এছাড়া দুই সারিতে ৩টি করে দুই পার্শ্বে আরো ১২টি গোলাকৃতি গম্বুজ – মোট ১৪টি গম্বুজ মসজিদের অপরূপ শোভা ধারণ করেছে। এই মসজিদের অভ্যন্তর গৌড়ের আদিনা মসজিদের করে অনুরূপ। মসজিদের ভেতরে উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি স্বতন্ত্র ছাদ বা মঞ্চ প্রস্তর স্তম্ভের উপর স্থাপিত রয়েছে এবং সেখানে গমনাগমনের জন্য উত্তর দেওয়ালে একটি সিঁড়ি রয়েছে। সিঁড়ি সংলগ্ন একটি মিনারও রয়েছে আজান দেওয়ার জন্য। ভেতরের ওই ছাদটির একটি প্রস্তরখণ্ড স্থানান্তরিত হয়ে নিকটস্থ হযরত শাহ্ নেয়ামত উল্লাহর সমাধি প্রাঙ্গণে নীত হয়েছে। মসজিদে কারুকার্য খচিত একটি মেহরাব রয়েছে।
 IMG_8908
এই মসজিদটি দৈর্ঘ ৮২ ও প্রস্থ ৫২ ফুট, উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট ।মসজিদটি মূলত ইটের ইমারত হলেও দেওয়ালের বাইরের অংশ পাথর আবৃত। ভিতরের দিকেও দেওয়ালের বেশ অংশ জুড়ে পাথর আবৃত। সামনের দেওয়ালে সমমাপের ৫টি দরজা রয়েছে। এছাড়া মসজিদের গায়ে নানা প্রকার লতাপাতার কারুকার্য তো আছেই। মধ্যবর্তি দরজার চারপাশের কারুকাজ অধিকাংশই পাথরে খোদিত। স্থানীয় লোকেরা গৌড়ের বড় সোনামসজিদের সংগে তুলনা করে একে ‘ছোট সোনামসজিদ’ বলে অভিহিত করে থাকেন। ঐতিহাসিক জেনারেল ক্যানিংহামের মতে, কিছ সংখ্যক স্বর্ণশিল্পী এই মসজিদের সাজ-সজ্জার পরিকল্পনা বা নকশা প্রস্তুত করেছিলেন। পরে এ গম্বুজগুলিতে সোনালী করা হলে এটি সোনা মসজিদ নামে অভিহিত হয়।
 IMG_8895
বঙ্গের গৌরবময় রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান আলা-উদ-দীন হোসেন শাহের রাজস্তকালে (১৪৯৩-১৫১৯ খৃস্টাব্দ) ৮৯৯ হতে ৯২৫ হিজরীর মধ্যে জনৈক আলীর পুত্র ওয়ালী মুহম্মদ কর্তৃক রজব মাসের ১৪ তারিখে ছোট সোনামসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। মসজিদের সম্মুখবর্তী কারুকার্য খচিত দরজার উপরের অংশের একটি পাথরের আরবী শিলালিপি থেকে একথা অবগত হওয়া যায়। মসজিদের অভ্যন্তরের আয়তন ৭১ ফুট ৯ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য এবং ৪০ ফুট ৬ ইঞ্চি প্রস্থ। ৩ সারিতে বিভক্ত। প্রত্যেক সারিতে ৫টি করে পাথরে স্তম্ভ রয়েছে। কতটা গোলাকৃতি অথচ একটু লম্বা ৫টি মেহরাব আছে। কিন্তু মেহরাবের কারুকার্য খচিত শ্বেত পাথরগুলো বর্তমানে নেই। স্থানীয় জনশ্রুতি ও কয়েকটি বিবরণীতে জানা যায় যে, ১৮৯৭ খৃস্টাব্দে ভূমিকম্পে মসজিদের পশ্চিম দেওয়ালের বহুলাংশ ভেঙ্গে পড়ে। ১৯০০ সালে তা কেবলমাত্র ইট দ্বারা মেরামত করা হয়। এসময় মেহরাবের উপরে স্বতন্ত্র শ্বেত পাথরের একখণ্ড উজ্জ্বল বস্তু ও আরো কয়েক টুকরো পাথর খণ্ড ইংরেজরা বিদেশে নিয়ে যায়। এমনি পশ্চিম দেওয়ালের কারুকার্যপূর্ণ কতগুলো দুপ্রাপ্য ও বহু মূল্যবান শিল্প নিদর্শনও স্থানান্তরিত হয়ে বিলের চলে যায়।
জনশ্রুতি আছে, মসজিদের সামনের প্রবেশ পথে যে একটি বিরাট ইট নির্মিত তোরণের অবশিষ্টাংশ রয়েছে, ভূমিকম্পের আগে তার সর্বাঙ্গে বিবিধ রং-এর পাথরখণ্ডে অলংকৃত ছিল। বেনারস থেকে আগত শিল্পীদের দ্বারা এই মসজিদের কারুকার্য সম্পাদিত হয়েছিল। মসজিদের পূর্ব উত্তর কোণে মঞ্চাবস্থায় পরস্পর সন্নিহিত যে দুটি পাথর নির্মিত অজ্ঞাত সমাধি রয়েছে তা একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠাতা ও আরেকটি নাকি তার আত্মীয়ের সমাধি। মতান্তরে এই দু’টি কাল্পনিক কবর বরং মসজিদ প্রতিষ্ঠাতার কিছু গুপ্তধন রয়েছে। এক প্রহর বেলা পর্যন্ত সোনা বর্ষিত হয়েছিল মতান্তরে প্রচুর সোনা পাওয়া গেছে সেজন্য স্বর্ণপ্রাপ্ত ব্যক্তি কর্তৃক এখানে দীঘি খনন ও মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়ে ‘সোনামসজিদ নামকরণ হয়েছে।
এই সোনামসজিদ এর আঙ্গিনায় শুয়ে আছে বাংলার ৭ বীরের এক বীর, বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর। পিতলে খোদাই করা তার জীবনী আছে তার সমাধি পাশে।
 IMG_8911
এবার আমারা চললাম কানসাট বাজারের দিকে।

কানসাট আমের বাজার

IMG_8954
বাংলাদেশে যে পরিমান আম হয় তার বেশীর ভাগ হয় চাপাই তে। আর চাপাইতে যত আমের বাজার আছে, সবথেকে বড় বাজার হল এই কানসাট আমের বাজার। এক কথায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমার বাজার এই কানসাট আমের বাজার।
 IMG_8637
সুতারং বুঝতেই পারছেন আপনি যখন এই বাজারে দাড়াবেন তখন আপনার মনে হবে লাখ লাখ আমের মাঝ খানে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন। বিভিন্ন প্রজাতির আম। দামেও অনেক সস্তা। সারা দেশ থেকে শত শত আমের ব্যপারী এই সময় পাইকারী দরে আম কিনে ট্রাকে ভর্তি দেশের বিভিন্ন যায়গায় নিয়ে যাই। তার কিছু অংশ হয়ত দেশের সীমা পার করে বিদেশেও পাড়ি জমায়। সত্যি গর্ব করার মতো একটা ব্যপার। কানসাট বাজার থেকে ১০ কেজি আম কিনলাম।  এক মুঠো অভিজ্ঞতা আর আম নিয়ে এবার বাড়ি ফিরলাম।
>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।