প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » সম্পাদকীয় » শিক্ষাকেন্দ্রে বুলিইং- সমস্যা ও প্রতিকার

শিক্ষাকেন্দ্রে বুলিইং- সমস্যা ও প্রতিকার

কাজী মোয়াজ্জমা তাসনিম | বাংলা ইনিশিয়েটর

হাসিখুশি মেয়ে অনিতা। পড়ালেখায় বেশ ভালো। একটা স্বনামধন্য স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। কিন্তু ইদানিং মেয়েটা একদমই স্কুলে যেতে চায় না। স্কুলের কথা শুনলেই নানা অযুহাত দেখায়। তার অভিযোগ, ক্লাসের মেয়েরা তাকে কাকের বাচ্চা বলে ক্ষেপায়। কারণ তার গায়ের রঙ কালো। অনিতার মা মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করেন স্কুলের ফ্রেন্ডরা ওরকম একটু আধটু দুষ্টামি করেই থাকে। কিন্তু মেয়ে অবুঝ। সে কিছুতেই স্কুলে যাবে না। মা অসহায় বোধ করেন।

বুলিইং শব্দটা সাধারণত শারীরিক বা মানসিক হয়রানি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। বুলিইং অনেক ভাবেই হতে পারে। আজকে আমরা কথা বলব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া বুলিইং নিয়ে। অনেক বাচ্চার ভেতরই বুলিইংয়ের প্রবণতা দেখা যায়। কিছু বাচ্চা খেলার মাঠে খুব আক্রমণাত্মক আচরণ করে। সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে খেলার সঙ্গীকে আক্রমণ করে। ক্লাসে একটু দুর্বল কিংবা চুপচাপ বাচ্চাকে অনেকেই বিভিন্ন কথাবার্তা বলে ক্ষেপায়। বাচ্চারা গায়ের রঙ, আকৃতি, উচ্চতা কিংবা শারীরিক কোন ত্রুটি নিয়ে ঠাট্টা তামাশার শিকার হয় প্রায়শই। বুলিয়িংকে হালকাভাবে নেওয়ার কোন সু্যোগ নেই। ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী প্রতি তিনজন শিশুর একজন বুলিইং এর শিকার হয়ে থাকে। এবং সারা বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১৬০০০০ শিশু বুলিংইয়ের শিকার হওয়ার ভয়ে স্কুলে যায় না। আমাদের দেশে এই নিয়ে তেমন সচেতনতামূলক কার্যক্রম না হলেও উন্নত বিশ্বে বুলিইং প্রতিরোধে অসংখ্য ক্যাম্পেইন হয়ে থাকে। যেসব শিশুরা বুলিইং এর শিকার হয়ে থাকে তাদের মধ্যে মাথাব্যাথা, ডিপ্রেশন, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। এর প্রভাব কিন্তু দীর্ঘদিন থাকে। ছাত্রজীবনে যারা বুলিইংয়ের শিকার হয় তাদের মধ্যে প্রভাবগুলো ছাত্রজীবনের পরেও লক্ষ্য করা যায়।

যেভাবে বুঝবেন বাচ্চা বুলিইংয়ের শিকার হচ্ছে-

  • বাচ্চা স্কুলে যেতে চায় না।
  • সবাইকে এড়িয়ে চলে।
  • একা একা থাকতে পছন্দ করে।
  • হতাশায় ভুগছে। নিজের প্রতি খুব বিতৃষ্ণা বা রাগ প্রকাশ করছে।
  • বাচ্চার কোন জিনিস (পেনসিল বক্স, টিফিন বক্স, পানির ফ্লাস্ক ইত্যাদি) খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
  • হটাৎই আচরণের অস্বাভাবিক পরিবর্তন।
  • ঘুমে সমস্যা, দুঃস্বপ্ন, ঘুমের ভেতর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদা
  • খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন
  • হটাৎ পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হতে থাকা।
  • হটাৎ আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে উঠা এমনকি ঝোঁকের মাথায় আত্মহত্যা করেও ফেলতে পারে।

এতক্ষণ তো সমস্যা নিয়েই কথা বললাম। এবার নাহয় সমাধানের কথা বলি। বুলিং প্রতিরোধে এই পদক্ষেপগুলো বেশ কার্যকরী-

  • শিশুদের বন্ধুত্বপুর্ণ আচরণে উৎসাহিত করা।
  • ছোটবেলা থেকেই সামাজিক মেলামেশায় অভ্যস্ত করা
  • শিশুদের আক্রমণাত্মক আচরণে নিরুৎসাহিত করা।
  • শিশু বুলিইংএর শিকার হচ্ছে জানতে পারলে উত্তেজিত হবেন না। শান্ত থাকুন। মনে রাখবেন, অভিযোগটা যার প্রতি সেও কিন্তু শিশু। শিশুরা ভুল করতেই পারে।
  • শিশুকে বলতে দিন। প্রয়োজন হলে প্রশ্ন করুন। কারা কারা এর সাথে সম্পৃক্ত তা জেনে নিন।
  • শিশু যদি স্কুলে বুলিইংএর শিকার হয় তাহলে স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানান। তবে অবশ্যই শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ বজায় রেখে।
  • শিশুর সাথে খারাপ ব্যবহার করবেন না। তাকে দোষারোপ করা বন্ধ করুন। সে বুলিইংয়ের শিকার হচ্ছে এটা মোটেও তার দোষ নয়।
  • শিশুর অভিযোগকে গুরুত্ব দিন। হেসে উড়িয়ে দেবেন না। আপনার অবহেলা তাকে আরো বেশি যন্ত্রণা দেয়।
  • তুমি যদি বুলিইংএর শিকার হও তাহলে মোটেও ঘাবড়ে যেও না। যারা তোমার সাথে এমন ব্যবহার করছে তাদের সাথে কথা বল। তাদের বুঝিয়ে বল তাদের আচরণ তোমার পছন্দ হচ্ছে না। তবে কখনই কাউকে পাল্টা আক্রমণ করা যাবে না।
  • এর পরও যদি তোমাকে হয়রানি করা হয় তাহলে বড় কাউকে বল। হতে পারে সেটা কোন শিক্ষক, হতে পারে সিনিয়র বড় ভাই বা বোন কিংবা তোমার মা-বাবা।
  • কাউকে কিছু বলার আগে দুইবার ভাবো। তোমার কাছে যেটা স্রেফ মজা অন্যদের কাছে সেটাই হয়ত যন্ত্রণাদায়ক।
  • মনে রাখবে প্রতিটা মানুষ একজন আরেকজন থেকে আলাদা। সবাই স্বতন্ত্র। সবার স্বকীয়তাকে সম্মান করতে শিখো।

শিক্ষাঙ্গন হোক আনন্দপূর্ণ। শিক্ষা হোক বাধাহীন। আমাদের শিশুরা যেন হেসে খেলে বেড়ে উঠতে পারে সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কিন্তু আমাদেরই।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ক্ষুদে সাংবাদিক  এবং সামাজিক কর্মী

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ইনিশিয়েটর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ইনিশিয়েটর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।