প্রচ্ছদ » উড়াল » জীবনী » একজন দুঃসাহসিক মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানুর গল্প

একজন দুঃসাহসিক মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানুর গল্প

‘তোমাদের কি মানুষ করেছি ঘরে থেকে অসহায়ভাবে মরার জন্য? মরতে হলে যুদ্ধ করতে করতে মরো৷” ঠিক এমন ভাবেই নিজের দুই ছেলেকে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন তৎকতকালী পাবনা মহিলা পরিষদের আহ্বায়ক কমিটির সভানেত্রী রাকিবা বেগম৷ মায়ের নির্দেশে যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয় জিন্দান ও জিঞ্জির। চাচাতো ভাইদের যুদ্ধে যেতে দেখে বসে থাকতে পারেনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী শিরিন । ছেলেদের শার্ট প্যান্ট পরে কিশোরযোদ্ধা সেজে যুদ্ধে অংশ নেয় সে।

ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পাবনায় প্রাথমিক প্রতিরোধ পর্ব হয় একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকেই ৷ চলে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ৷ ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা পাবনা শহরে ঢোকে৷ জারি হয় সান্ধ্য আইন ৷ ২৬ মার্চ তারা রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার শুরু করে৷ সাধারণ মানুষের ওপরও নেমে আসে অত্যাচার ৷ জেলা প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয় পাল্টা আঘাত হানার ৷ ২৭ মার্চ রাতে পুলিশ লাইনের যুদ্ধ শুরু হয় ৷ সেই যুদ্ধ রূপ নেয় জনযুদ্ধে৷ ঘরে ঘরে মেয়েরাও যুদ্ধে নামার কথা ভাবতে শুরু করে৷ তাদের অস্ত্র ছিল গরম পানি, অ্যাসিড বাল্ব, বটি আর দা৷ শিরিন বানু মিতিলের মতো সংগ্রামী মেয়েদের মানসিকতা ছিল ‘মেরে মরো’


শিরিন বানু মিতিলের  অনন্য সাধারণ মা সেলিনা বানু বলেছিলেন ‘ঘরে বসে মরার জন্য জন্ম দেইনি তোদের। ঘরের বের হয়ে একটা কিছু কর দেশের জন্য।’ বড় খালা এবং ফুফু বলেছিলেন ‘যুদ্ধে যাচ্ছ যাও তবে তোমাদের পিঠে যেন গুলি না লাগে।’ মামাত ভাই জিদান বলেছিলেন, ‘তুমি প্রীতিলতার মতো শার্ট-প্যান্ট পরে যুদ্ধে যেতে পারো।’ এই সব কথা মিতিলের চেতনায় অমিয়বাণীর মতো ধ্বনিত হয়।

২৮ মার্চ শহরের জেল রোডে টেলিফোন ভবনে দখলদার ৩৬ জন পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে যুদ্ধ হয়৷ যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের সবাই মারা পড়ে৷ দু’জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন৷ এভাবে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলতেই থাকে৷ তখন যুদ্ধ চলছিল নগরবাড়ী ঘাট, আতাইকুলা ও কাশীনাথপুরে৷ পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ শুরু হয় আকাশপথে৷ পাশের জেলা কুষ্টিয়ার প্রতিরোধ ভেঙে পড়ছে৷ তাদের বিভিন্ন দল পিছিয়ে যাচ্ছে চুয়াডাঙ্গার দিকে৷ পাবনার ছাত্রনেতা ইকবালের দল একটি গাড়িতে করে কুষ্টিয়া হয়ে চুয়াডাঙ্গার দিকে রওনা হয়৷ গাড়িতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় মিতিল ও তাঁর এক ভাই থেকে যায় কুষ্টিয়ায়৷ পরে কুষ্টিয়া থেকে চুয়াডাঙ্গা যাওয়ার সময় ভারতীয় সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাৎ হয়৷ এরপর ভারতের স্টেটসম্যান পত্রিকার সাংবাদিক মানস ঘোষ মিতিলের ছবিসহ সাক্ষাৎকার ছাপেন৷ ফলে ছেলে সেজে যুদ্ধ করার আর সুযোগ পাননি মিতিল৷

gfjfj (1 of 1)একদিনের ঘটনা এখনও প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয় মিতিলের মন৷ তিনি জানান, ‘‘আমি যখন কুষ্টিয়া থেকে চুয়াডাঙ্গার দিকে যাচ্ছিলাম৷ তখন একদিন গভীর রাতে আমাদের দলটিকে পথের মাঝে আটকানো হয়৷ মূলত ঐ অঞ্চলে পাক সেনাদের প্রতিরোধ করতেই সতর্কতামূলক পাহারায় যারা ছিল তারা আমাদের পরিচয় জানতে চায়৷ আমরা পরিচয় দিলেও তারা প্রথমে সেটা বিশ্বাস করতে চাচ্ছিল না৷ কারণ আমাদের সাথে যিনি আরআই ছিলেন তিনি ছিলেন পশ্চিম বঙ্গের৷ ফলে তাঁর ভাষার টান টা ছিল বিহারিদের মতো৷ তাই আমরা যে সত্যি মুক্তিযোদ্ধা তার প্রমাণ চাইল৷ তখন পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমাদের একজন বলতে বাধ্য হলো যে, ‘আপনারা কি আকাশবাণীতে শিরিন বানুর কথা শুনেছেন?’ তারা বলল যে, ‘হ্যাঁ, আমরা তাঁর কথা শুনেছি৷’ তখন বলা হলো যে, আমাদের সাথে সেই শিরিন বানু আছে৷ সেই সময় আমি খুব সন্দিগ্ধ ছিলাম যে, এতো বড় দলের ভেতরে ছদ্মবেশে একজন মেয়ে আছে, এটাকে তারা হয়তো অন্যভাবে দেখবে৷ কিন্তু আমার পরিচয় জানার পরেই দেখা গেল যে, তারা সবাই আমাকে ঘিরে ধরল৷ তাদের মধ্যে এক বৃদ্ধ পিতা আমার কাছে এগিয়ে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘মা আমরা আর ভয় করি না৷ আমাদের মেয়েরা যখন আমাদের সাথে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে তখন বিজয় আমাদের হবেই৷’  তাঁর এই কথা শুনে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম এবং তখন মনে হয়েছিল যে, সারাদেশের মানুষ কীভাবে স্বাধীনতার জন্য উদ্দীপনা ও উৎসাহ নিয়ে পরস্পরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে৷”

২০শে এপ্রিল সীমান্ত অতিক্রম আরো প্রশিক্ষণের জন্য ভারত চলে যান মিতিল৷ নাচোল বিদ্রোহের নেত্রী ইলা মিত্রের বাসায় কাটাতে হয়েছে তাঁকে কিছুদিন৷ প্রথমে কয়েকজন নারী বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে ঘুরে ঘুরে মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দল গঠন শুরু করেন৷ তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন তিনি৷ অবশেষে ৩৬ জন নারী নিয়ে বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত একমাত্র নারীদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গোবরা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শুরু হয়৷ ধীরে ধীরে  সদস্য সংখ্যা বেড়ে যায়৷ এক পর্যায়ে সদস্য ছিল ২৪০ এর ওপরে৷ সেখানে প্রশিক্ষণ নেন তিনি৷ পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কলকাতায় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিতে থাকেন৷ অস্ত্রের অভাব থাকায় মহিলা গ্রুপের হাতে অস্ত্র সরবরাহ করা সম্ভব ছিল না৷ তাই প্রথম দলের একটি অংশ আগরতলায় যায় মেডিক্যাল কোরের সদস্য হিসেবে৷ বাকিরা বিভিন্ন এলাকায় ভাগ হয়ে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেন৷  তিনি মেজর জলিলের নেতৃত্বে পরিচালিত ৯নং সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধের অংশ নেন।

এছাড়াও ১৯৭০-১৯৭৩ সাল পর্যন্ত পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভানেত্রী এবং কিছু সময়ের জন্য পাবনা জেলা মহিলা পরিষদের যুগ্ম সম্পাদিকা ছিলেন।

১৯৭২ সালে ফেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি মস্কো, রাশিয়া থেকে ইতিহাসে এমএ ডিগ্রী সম্পন্ন করে ১৯৮০ সালে দেশে ফিরে আসেন। বাবা-মা দু’জনই বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। মাতমহ খান বাহাদুর ওয়াসিম উদ্দিন আহমেদের রাজনৈতিক আদর্শ মিতিলকে প্রভাবিত করে। জেলা ছাত্র ইউনিয়নে সভাপতি পদের কারণে শিরিন বানুকে বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।

পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি, বামপন্থী নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল ১৯৫১ সালের ২ সেপ্টেম্বর পাবনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা খোন্দকার শাহজাহান মোহাম্মদ ও মা সেলিনা বানু। বাবা ছাত্রজীবনে ও ১৯৫২ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন। মা পাবনা জেলার ন্যাপ সভানেত্রী এবং ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের এমপি ছিলেন। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হবার ফলে নিজেও ছিলেন রাজনীতি সচেতন। ছোটবেলা থেকেই ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যোগ দেন তিনি।

পুরুষের পোষাক পরে যিনি মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল। গত বুধবার ২০ জুলাই ২০১৬ মধ্যরাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এর আগে রাত সাড়ে ১১টায় তিনি হঠাৎ করে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর বয়স ছিল ৬৫ বছর।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।