প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » সম্পাদকীয় » এলো শোকের আগষ্ট

এলো শোকের আগষ্ট

আগস্ট মাস। ইংরেজি বছরের অষ্টম মাস। পৃথিবীর অন্যান্য জাতির কাছে হয়ত এই মাসের আলাদা কোন রং নেই। তবে বাঙালির চোখে আগস্টের রং অবশ্যই কালো। আগস্ট মানেই অন্ধকার। আগস্ট মানেই পিতার রক্তে রঞ্জিত সন্তানের হাত।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। নামটা শুনলেই চোখে ভাসে চোখে চশমা, ঠোঁটের উপর গোঁফ আর হাতে ধরা পাইপ সমেত একটা মুখ। পিতার মুখ। কানে বাজে স্বাধীনতার ডাক। যে ডাকে সাড়া দিয়ে সাড়ে সাত কোটি জনতা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যুদ্ধে। এই বাঙালির জন্য, এই বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য ৫৫ বছরের ক্ষুদ্র জীবনের ৮ টা বছর কাটিয়েছেন অন্ধ কারাকারে। নিজের পরিবার, পরিজন, পুত্র, কন্যাকে অনিশ্চয়তায় ভাসিয়ে জাতির মুক্তির জন্য প্রাণ বাজি রেখেছেন। নতুন একটি দেশ জন্ম দিয়ে হয়েছেন জাতির পিতা। প্রতিদানে বাঙালি তাকে মৃত্যু দিয়েছে। বিশ্বাসঘাতক সন্তান বুলেটে ক্ষতবিক্ষত করেছে পিতার বুক।

১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫। ভোর হবে হবে করছে। তবে ধানমন্ডি ৩২ এ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে তখন আঁধার নামছে। কতিপয় বিপথগামী সেনা অফিসার সেই বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। তারা একে একে হত্যা করে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুননেছা, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, কর্ণেল জামিল, সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক, প্রায় একই সময়ে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণির বাসায় হামলা চালিয়ে শেখ ফজলুল হক মণি, তাঁর অন্ত:সত্তা স্ত্রী আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াতের বাসায় হামলা করে সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা বেবী, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত এবং এক আত্মীয় বেন্টু খান। দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

মূলত সেদিন থেকেই দেশ উল্টো রথে চড়ে যাত্রা শুরু করে। সেনা শাসক ক্ষমতায় আসে। মুক্তিযুদ্ধের জয় বাংলা শ্লোগান বদলে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ করা হয়, বঙ্গবন্ধু খুনিদের দেশ ত্যাগে সহায়তা করা হয়, যুদ্ধপরাধীদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়। পিতার তত্বাবধায়নে যে দেশটা এক পা- দু’ পা করে এগুচ্ছিল সেটা যেন এক ধাক্কায় পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু কখনো নিজের বাড়িতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বলয় রাখেন নি। বাঙালি জাতির প্রতি তার ছিল অগাধ বিশ্বাস। এই বাঙালি তার ক্ষতি করতে পারে এটা তিনি বিশ্বাসই করতেন না। সরল মনের মানুষ বোধহয় একেই বলে। অন্যকে সহজেই আপন করে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার। তিনি কি আর জানতেন, এই ক্ষমতাই একদিন কালসাপ হয়ে তার বুকেই ছোবল দেবে?

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নোবেল বিজয়ী উইলিবান্ট বলেছিলেন, “মুজিব হত্যার পর বাঙালীদের আর বিশ্বাস করা যায় না, যারা মুজিবকে হত্যা করেছে তারা যেকোন জঘন্য কাজ করতে পারে”।

এই হত্যাকান্ডে স্তব্ধ হয়ে যায় সারা বিশ্ব। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের বন্ধু। বন্ধুর মৃত্যুতে তিনি বলেন, ” “শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে,আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে”।

বঙ্গবন্ধুর শরীরটাকে ওরা মুছে দিতে পেরেছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধুদের কখনো মুছে ফেলা যায় না। বঙ্গবন্ধুরা থেকে যায় পৃথিবীর সকল মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে। তাই তো অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছেন, “যতকাল রবে পদ্মা মেঘনা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান। দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা রক্তগঙ্গা বহমান তবু নাই ভয় হবে হবে জয় জয় মুজিবুর রহমান।”

 

বাংলা ইনিশিয়েটর/০১/০৮/২০১৬/এস এস কে/ তাসনিম

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।