তবু ভালোবাসো

বইয়ের নামঃ তবু ভালোবেসো

লেখকঃ দীপু মাহমুদ

প্রকাশনীঃ সূচীপত্র

মূল্যঃ ২৫০টাকা

পরিবারকেন্দ্রিক গল্পের বুনটে উপন্যাসটি খুবই জীবন্ত। সাইকিয়াট্রিক ডাক্তার, মুফাজ্জল করিম উপন্যাসটির কেন্দ্রিয় চরিত্র। তাঁর স্ত্রী রাবেয়া একমাত্র কন্যাসন্তানের অকালমৃত্যুর পর থেকে মানসিক ভাবে অপ্রকৃতিস্থ। ডাক্তারের বাড়িতে যাতায়াত থাকলেও আলাদা থাকেন। তাঁর অপ্রকৃতিস্থতার মধ্যেও ডাক্তারের প্রতি ভালবাসা আর মমত্ববোধ, সঙ্গে স্ত্রীসুলভ কিছুটা অধিকারবোধ চরিত্রটাকে খুব আকর্ষণীয় করে তুলেছে। রাবেয়ার অস্বাভাবিক আচরণের দৃশ্যগুলো এত স্বাভাবিক যে, কোথাও এতটুকু অতিরঞ্জন মনে হয় না। প্রেমিকা ও স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও ডাক্তারের একটা একাকীত্ব যে তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছে, তার ক্রমবিকাশ পাঠকের মনে গভীর দাগ কাটে। গোপনে বিয়ে করা প্রেমিকা ও শ্বশুরের চাপে ডিভোর্স করা নাদিয়ার গর্ভে জন্মানো নিজের সন্তান আজ মানুষ হচ্ছে নাদিয়ার বর্তমান স্বামী জাফরের পিতৃপরিচয়ে। সন্তানহারা পিতা করিম সাহেব পরিচয় দিতে না পারা কন্যা নিতুনকে বার বার দেখতে যান অপরিসীম পিতৃত্বের টানে। নিতুন ডাক্তার আঙ্কেলের সত্য পরিচয় না জানার জন্যে অস্বস্তি পায়, কখনো বিরক্ত হয়। কিন্তু অদৃশ্য এক কৌতূহলে আকৃষ্টও হয়।

নাদিয়া, জাফর আর নিতুন – পরিবারের মানুষ তিনটির মানসিক জটিলতার উত্থান পতনের চিত্রটি লেখক এঁকেছেন পরম মমতায়। নিতুনের প্রতি গভীর অপত্যস্নেহ আর নাদিয়ার প্রতি ভালবাসা থাকা সত্ত্বেও জাফর কোন এক হীনমন্যতায় নিজেকে তাদের কাছ থেকে সরিয়ে রাখত। অলীক কিছুর প্রতি প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজেকে ক্ষত বিক্ষত করত প্রতি মুহূর্তে। কিন্তু যেদিন নিতুন প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে নিজের দেহের রক্তপাত ঘটিয়ে প্রমাণ করতে চাইল যে সে জাফরের সন্তান, সেদিন তার সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে গেল। তার ভিতরে বাস করা পিতা অপত্যস্নেহকে অবজ্ঞা করতে পারল না।

ডাক্তারের গ্রাম সম্পর্কিত ভাগ্নে নাটা শহরে এসে মামার আশ্রয়ে আছে। জীবনে তেমন কোন লক্ষ্য স্থির করে সে আসেনি। তার মত গৌণ একটা চরিত্রও ধীরে ধীরে কেমন বিকশিত হচ্ছে, গড়ে উঠছে কুমুর হাত ধরে, তা লক্ষ্য করার মত। পাঠক বুঝতেই পারে না নিজের অজান্তে সে কখন এই চরিত্রগুলোর একান্ত আত্মীয় হয়ে পড়ে। ঔপন্যাসিকের লেখার গুণেই তা সম্ভব হয়েছে।

গল্পের প্রথম থেকে তৈরি করা সমান্তরাল একটি পরিবারের কাহিনী দেখতে পাই সুরাইয়া আর তার স্বামী ইমামুর রহমানের মধ্যে দিয়ে। সিরাজগঞ্জের আঞ্চলিক টানে কথা বলা, ইঞ্জিনীয়ার, সুপথ ও কুপথে আসা বহু টাকার মালিক ইমামুর, অসামান্যা সুন্দরী স্ত্রীর মনের খোঁজ রাখার প্রয়োজন বোধ করেন না। নিজের উপার্জনের হিসাব নিকাশ করতেই তাঁর সময় চলে যায়। স্বামীর সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক দূরত্ব সুরাইয়ার মধ্যে তৈরি করে এক শুন্যতা আর একাকীত্ব। সেই ফাঁক দিয়ে তার মনে ঢুকে পড়ে কিছু অশরীরীর অস্তিত্ব। রোজ রাত্রে ফাঁকা ঘরে চেয়ার টানার শব্দ শুনে ভয়ে সিঁটিয়ে যায় সে। শেষ পর্যন্ত তার গর্ভের অনাগত সন্তানকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্রও কানে আসে তার। ডাক্তার মুফাজ্জল করিম অতি অনায়াসে এই সমস্যার সমাধান করে কাছে আসতে সাহায্য করেন দুই নরনারীকে। যারা দীর্ঘদিন এক ছাতের তলায় বাস করেও থেকে গিয়েছিল বহু যোজন দূরে। দাম্পত্য ভালবাসার নবজন্মে সুরাইয়ার গর্ভে সন্তান আসে। বর্তমান সমাজের দাম্পত্য দূরত্বটি অতি বাস্তবোচিত চরিত্রচিত্রণে নিপুণ ভাবে ফুটে উঠেছে লেখকের কলমে।

কুমুর দিদি জামাইবাবু, ‘বড় আপা’ও ও সি সাহেবের পরিবারের চিত্রটাও খুব সুন্দর ও স্বাভাবিক ভাবে চিত্রিত। শুধু কুমুর হঠাৎ নাটার কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়াটা একটু অযৌক্তিক মনে হয়েছে। এখানে লেখকের সামান্য ব্যাখ্যা মন ভরাতে পারেনি।

ডাক্তার করিমের পার্কে যাওয়া ও সেখানকার শিশুরা একটা আবহ তৈরি করে। শেষের দিকে ওই আবহ রাবেয়াকেও স্বাভাবিক হতে সাহায্য করে। এই শিশুদের মধ্যে প্রধান চরিত্রটি শাহীনের। তার নেতৃত্বে ডাক্তারের বস্তিতে যাওয়া, বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়া, বস্তিবাসী বিভিন্ন নারী পুরুষের চারিত্রিক বৈশিষ্টের সঙ্গে পরিচিত হওয়া কাহিনীতে একটা অন্য মাত্রা যোগ করে। পরবর্তীকালে শাহীনের ডাক্তার করিমের বাড়িতে এসে সন্তানস্নেহে পালিত হওয়াটা রাবেয়াকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে সাহায্য করে। শাহীনের এ বাড়িতে এসে খুশি থাকা ও সন্তানসুলভ আচরণ করাটা পাঠকের মনকে আনন্দিত করেছে। তার আগমনে রাবেয়ার সুস্থতা বেড়েছে। কাহিনীতে শাহীনের প্রয়োজন ফুরোতে তাকে তার মায়ের কাছে ফেরৎ পাঠানোটাও লেখকের একটা সুচারু কৌশল। অত্যন্ত দক্ষতায় তিনি কাহিনীর বোঝা হালকা করেছেন।

ছোট ছোট বহু চরিত্র এই উপন্যাসে মুহূর্তের জন্যে এসেও মনে দাগ কেটে রেখে যায়। বাবুর্চি, শাহীনের মা, গাজি, গাজির বউ, প্রতিটা চরিত্রচিত্রণে রয়েছে লেখকের মৌলিকতার পরিচয়।
সবশেষে বলি, সামাজিক, এই উপন্যাসটিতে লেখক যে বার্তা দিতে চেয়েছেন, বর্তমান যুগের প্রেক্ষিতে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটা সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হচ্ছে জটিলতা। আর তাকে প্রাধান্য দিয়ে মানুষ ক্রমশ একজন অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ভালবাসতে ভুলে যাচ্ছে। ভালবাসা অনেক জটিলতাকে সরল করে মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে আসতে পারে। তাই তিনি বলতে চেয়েছেন অসংখ্য জটিলতা, মলিনতা, সমস্যা থাকা সত্ত্বেও ভালবাসতে ভুলো না। তাই তো উপন্যাসটির নাম দিয়েছেন ‘তবু ভালোবেসো’।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।