প্রচ্ছদ » আমাদের সাহিত্য » বই পরিচয় » নিতুর ডায়েরী ১৯৭১

নিতুর ডায়েরী ১৯৭১

বইয়ের নামঃ নিতুর ডায়েরি ১৯৭১

লেখকঃ দীপু মাহমুদ

প্রকাশনীঃ সূচীপত্র

প্রকাশকালঃ জুলাই, ২০১৫

মূল্যঃ ২৫০ টাকা।

নিতু নামের আধা-গ্রাম-আধা-শহরের একটা বাচ্চা মেয়ের জবানিতে লেখা, ১ জানুয়ারী থেকে ১৫ ডিসেম্বর, এই একটা বছরের প্রতিটা ঘটনা- প্রতিটি বাক্য, টেনে ধরা হয়েছে বইটিতে খুবই সুন্দরভাবে। আর ভাষাটা? একেবারে একটা বাচ্চা মেয়ে, ক্লাস সেভেনে পড়া, বার-তের বয়সের একটা মেয়ের কথা, মনেই হয় না একজন পরিণত লেখকের রচনা। যেমন,
“আমবেল ভাই বলল, ‘তাঁর মা মরে গেছে। এটা কাফনের কাপড়।‘
আমি জানলাম আব্বার দোকানে কাফনের কাপড়ও বিক্রি হয়। আমার ভীষণ ইচ্ছে করছিল আমবেল ভাইকে জিগ্যেস করি, ইতু বুর কাপড় কি আমাদের দোকান থেকে নেওয়া হয়েছিল?” কী কিশোরীসুলভ চিন্তা, সেই সাথে সদ্য প্রয়াত বড় বোন সম্পর্কে এক কিশোরীর বেদনাবহ ভাবনা।

বইটিতে নিতুর অকপট বর্ণনায় উঠে এসেছে ওর বাবার কথা, মায়ের কথা, শান্ত অথচ দৃঢ়চেতা বোন মিতুর কথা, সদা উচ্ছল প্রিয় ভাইয়ের কথা, তাঁর প্রয়াত বোনের স্বামীর কথা, যে স্ত্রী বিয়োগের পরও তাঁর শ্বশুরবাড়ীর সাথে যোগাযোগ রেখেছে, তাদের ভালোমন্দ ভাগ করে নিচ্ছে, এসেছে কট্টর পাকিস্তানপন্থী লতিফ মামুর কথা, একজন রাজাকার, বিলাতের কথা, এই সংসারটির জন্য নিবেতিতপ্রাণ কর্মচারী আমবেল ভাই। এতো আবেগময় উপন্যাসটির বর্ণনা যে পাঠকে চোখ মাঝে মাঝে আবেগে অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠবে।

“ইতু বুর সাথে আমি ছোলার শাক তুলতে যেতাম মাঠে। শাড়ির কোচড় ভরে ইতু বু ছোলার শাক তুলল। ইতু বু মরে গেল। আমার আর ছোলার শাক খেতে ইচ্ছে করে না। ইতু বু কেন মরে গেল? কেউ কাউকে ভালবাসলে সে বুঝি মরে যায়!”
এটা একটা মুক্তিযুদ্ধের গল্প, কিন্তু সেই কথার ওপরও এটা একটা জীবনধর্মী সুখে-দুঃখে ভরা একটা আবেগময় চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে, মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, যেন পথের পাচালী পড়ছি। আর এতো নিরাসক্ত আর আবেগহীনভাবে নিতুর মৃত্যুকে চিত্রায়িত করা হয়েছে, পড়লে বিস্মিত হতে হয়। কোন মেলোড্রামা নেই, কোন বাংলা বা হিন্দী সিনেমার ডায়ালগ, কিচ্ছু নেই-
“ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এলো। সন্ধ্যার পর নিতু মারা গেল।”

লেখক এতো আবেগময় উপন্যাস লিখে, শেষটা একেবারে নিরাসক্ত রেখেছেন। মনে হয়, তিনি পাঠকদের ‘অতি শোকে পাথর’ করে দিতে চেয়েছেন। এখানেই তাঁর সাহিত্যিক উৎকর্ষতা।
মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপঞ্জি মানেই রাজাকার আল-বদরের অত্যাচার আর নৃসংসতার কথা, যুবতী মেয়েদের ওপর লোলুপদৃষ্টি দেওয়া পাকিস্তান সেনার আচরণ, বাড়ি থেকে ধনসম্পদ, মুরগী-ছাগল-গরু লুট করে নেওয়ার ঘটনা, দরদী মওলানার যোগসাজসে কোন ভালো মানুষের জীবনরক্ষা, মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রম – সব কিছুই আছে এ বইটাতে- কিন্তু কেন জানি না, একবারও মনে হয় না, এমন ঘটনা তো আগেও পড়েছি, অমুক বইয়ে এমন ধরনের ঘটনার বিবরণ আছে। এ সব ঘটনার বিবরণ উপস্থাপনের আঙ্গিকে একেবারে অন্যরকম বলে মনে হয়।

সবার ওপরে বইটা একটা কিশোর উপন্যাস হলেও সবার হৃদয়ে গভীর দাগ ফেলার মতো একটা প্রকৃত সাহিত্য হয়ে উঠেছে। একজন সাহিত্যিক নিজেকে, নিজের ভাবনা-চিন্তাকে কতোটা কিশোরসুলভ করতে পারেন, বইটা না পড়লে আমি বোঝা যাবে না। সবাই কিশোর হয়ে যেতে পারে না। আর এটা একটা খুব বড় আর্ট।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।