প্রচ্ছদ » উড়াল » সংগঠন » রোড টু কুড়িগ্রাম

রোড টু কুড়িগ্রাম

বর্তমান সময়ে সামাজিক কর্মকান্ডে তরুনদের অংশগ্রহন চোখে পড়ার মত। প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট যে কোন বিপর্যয়েই এরা ঝাপিয়ে পড়ে মানবতার দ্বায়ে। চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে দেশের অনেক অঞ্চলের মানুষ যখন অমানবিক জীবন যাপন করছে ঠিক তখনি মানবতার মশাল নিয়ে বিভিন্ন তরুণ সেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের পাশে দাড়িয়েছে। এমনি এক সংগঠনের নাম প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশন যারা এবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষদের সাহায্যার্থে ত্রান নিয়ে ছুটছে বিভিন্ন জেলায়।  সম্প্রতি তারা কুড়িগ্রামে প্রায় ৪৫০ টি পরিবারকে ত্রান সামগ্রী বিতরন করে ফিরেছে।  কুড়িগ্রামে ত্রান বিতরনের সামগ্রিক অভিজ্ঞতার বর্ননা দিচ্ছে প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশনের সেচ্ছাসেবী রায়হান।

tranউত্তরবঙ্গের ১০ লাখ মানুষ যখন প্রায় পানিতে প্লাবিত এমন কি তাদের কান্নার জলও বন্যায় ভেসে যাচ্ছে তখন বন্যার্তদের নিয়ে প্রচেষ্টার ইভেন্টে ত্রান নিয়ে রওনা হই আমরা ১১ জন প্রচেষ্টিয়ান! কল্যাণপুর বাস স্ট্যান্ড হতে রওনা হই কুড়িগ্রাম। বাসে বেশ ভালই রাতটা কাটিয়েছি।  হাইওয়ে রোড দিয়ে এক একটা বাস- ট্রাক যাচ্ছ হু হু করে। মাঝরাতের বৃষ্টি আর বন্যার্তদের কাছে পৌছানোর উদ্দীপনা নিয়ে ঘুম দেই।

প্রায় সকাল ৮ টা বাজে কুড়িগ্রাম পৌছলাম।  ত্রাণের ট্রাক আসার খবর পাওয়ার পরপরই চলে আসলাম সবাই ধরলা নদীর ব্রিজের গোড়ায় নদীর কিনারায়। ট্রাক থেকে ত্রান নিয়ে রাখা হলো ২ টি বড় ট্রলারে। ট্রাকের পাশে স্যালাইন আর ফিটকিরির প্যাকেটিং  চলছে। স্থানীয় আরো ১০ জন স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত হলে কাজ এগিয়ে চলে খুব দ্রুত। ১২ টার দিকে ২ টি ট্রলারে প্রায় ৪৫০ টি পরিবারের জন্য ত্রাণ নিয়ে দুর্গম চরের উদ্দেশ্যে রওনা হই আমরা ২১ জন।

বিস্তর এলাকা পানিতে ভাসছে, দূরে একটা অর্ধ ভাসমান স্কুল, কুঁড়েঘরটাও ডুবে গেছে, টিনের চালে মাছরাঙার মাছ শিকারে ব্যস্ততা, পানি ছুঁই ছুঁই ব্রিজের উপর গবাদি পশু, গলা সমান পানিতে বাবার কাধে উলঙ্গ শিশু, ভাসন্ত কলা গাছের ভেলায় উপোষ বানভাসি….

দেখতে দেখতে ট্রলার ভিড়লো যাত্রাপুর ইউনিয়নের গরুহারা চরে। প্রায় ৩০০ এর মতো মহিলা -পুরুষ -বাচ্চা জমে আছে ত্রানের অপেক্ষায়। শরিফ ভাইয়ের নেতৃত্বে প্যাকেটিং চলছে, সোলাইমান ভাই মানুষ সামাল দিচ্ছে, হাউকাউ করা মানুষগুলোকে শান্ত করলো আবির ভাইয়ের নির্লিপ্ত কিছু আবেগী কথা! মহসিন ভাইয়ের গলা ফাটিয়ে লিস্টের নাম ধরে চিৎকার।

শুরু হয়ে গেল ত্রান বিতরণ। অত্যন্ত কপাল কুঁচকে থাকা মানুষটা ত্রান পেয়ে যে সুখের হাসি হাসছে তা ক্যামেরা বন্দী করলো নিয়ন ভাইয়ের অত্যাধুনিক লেন্স লাগানো মোবাইল ক্যামেরা। এই চরে প্রায় ২১০ জনকে ত্রান দিয়ে বাকিদের কাছে ক্ষমা চেয়ে অন্য চরের উদ্দেশ্যে রওনা করি।

ছোট্ট ১ টা ঘটনা বলি!tran

আমি নিজ চোখে আমার নানুর বয়সী এক বৃদ্ধা মহিলাকে কাঁদতে দেখেছি। কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে ভিতরে কিন্তু ভলান্টিয়ারি শৃঙ্খলা মানিয়ে রাখার জন্যে দাঁতে দাঁত চেপে পেশী শক্তি দিয়ে বারবার অশ্রু আটকে রেখেছি। অন্যান্য পার্বতীপুর, বলদীপাড়া, খাসের চরে ত্রাণ দেই আমরা। সেখানকার চিত্র ও একই ভয়াবহ, বিশ্বাস করুন, খুবই ভয়াবহ। ছোট ছোট দ্বীপের মত চরের মাঝে অসংখ্য বাড়ি। এত মানুষের ভিড়ে ত্রাণ খুবই সামান্য,  অতি নগণ্য।  ত্রাণ দিয়ে আগালাম সামনে আরেকটা চরে।

আরেকটা ঘটনা বলি,

চরের মাঝে এক বাচ্চা ৭-৮ বছরের। চিড়া ধুয়ে খাচ্ছে শুধু। একটু চিনির পানিও ছিল না। বিশ্বাস করুন ওই পানিটাও বিশুদ্ধ ছিল না। বাচ্চার মায়ের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম বাচ্চার  বাবা অসুস্থ, অপারেশন হয়েছে।  কোন উপার্জন নেই।  রাত থেকে কিছুই খায় নি বাচ্চাটা।

ট্রলারে মাথায় বসে আছি চুপটি করে, দূরে আরেকটা চর, চলছে প্যাকেটিং, পাশের ট্রলারে কেউ কেউ একটু বিশ্রাম নিচ্ছে, এর পাশেই ত্রানের সারি সারি বস্তা, ইঞ্জিনের পাশেই মাঝির তীক্ষ্ণ চোখ দুটো সামনের চরের দিকে। শুকনো কোন যায়গা নেই পানির ভিতরেই চলছে ত্রাণ বিতরণ। বানভাসিরা কেউ নৌকা আবার কেউ ভেলায় চড়ে এসেছে খাবারের আশায়।

দুপুরের খাবারে হয় মুড়ি, চিড়া গুড়ের মধুর স্বাদের শুকনো খাবার! চিবোতে চিবোতে আগাই ভারতের বর্ডারের পাশের হাটের বাঁধের কাছে। ত্রাণ দেয়া শেষ হলে এক ট্রলার ছেড়ে সবাই আরেক ট্রলারে চলে আসি। শেষ বিকেলের দিকে বাকি ত্রান সদরের দিকে পাকা রাস্তার উপর ভাসমান বানভাসীদের বাড়িতে দিয়ে সোজা চলে যাই কুড়িগ্রাম সদরের বাজারে।

সন্ধ্যা নেমে গেছে, দূরে কুড়িগ্রাম সদর,  ট্রলার থেকে নেমে গেছি,  রাস্তায় সারি সারি অসংখ্য ভাসমান বাড়ি ও গবাদি পশু, অন্ধকার নেমেছে চলছে অটো, গন্তব্য কুড়িগ্রাম বাজার।

রাত সাতটার দিকে পৌঁছাই বাজারে। রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে আবার তুষার ভাইয়ের হোস্টেলে। গোসল করে বের হওয়ার সাথে সাথে খবর বাসের টিকেট কাটা শেষ। নয়টা ত্রিশেই বাস। হুটহাট ব্যাগ গুছিয়ে বাসস্ট্যান্ড। তারপর কুড়িগ্রাম থেকে রংপুর। তারপর রংপুর থেকে ঢাকার বাসে উঠলাম রাত ১১ টার দিকে।

যতটা হাসি মুখ নিয়া সবাইকে কুড়িগ্রাম যােতে দেখেছি। আসার সময় ঠিক তার বিপরীত। অনেকটা আবেগঘন! কেউ হাসলেও বুঝা যাচ্ছে ফ্যাকাশে হাসি! মুখের বুলি গুলোও চুপসে গেছে। তবুও শেষ হয়েছে আমাদের কুড়িগ্রাম অভিযান।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।