প্রচ্ছদ » অনিয়ম » টাকা দিতে পারি না, তাই আমার গ্যাজেটও হয় না

টাকা দিতে পারি না, তাই আমার গ্যাজেটও হয় না

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০১৬২:৩৩:৪২ অপরাহ্ন

মো. আলী আকবর শেখ।  মিরপুর ১৩ নম্বরে আখের রস বিক্রি করেই সংসার চালান।  তবে ওনার আরও একটি পরিচয় আছে। তিনি এই দেশের একজন সূর্যসন্তান। ।  ১৯৭১ সালে রাত কাটিয়ে  ভোর এনেছিল যারা, তাদের মধ্যে একজন তিনি। হ্যা তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।   ৮ নং সেক্টরে যুদ্ধ করা মানুষটার বয়স এখন ৬৮ বছর।  বঙ্গবন্ধু তার জীবনের আদর্শ। চোখে জল আসে এখনও বঙ্গবন্ধুর নাম শুনলে। গত ১৭ আগষ্ট আখের রস খেতে গিয়ে  বাংলা ইনিশিয়েটর টিমের সাথে  তার পরিচয়। এর পর তার অস্থায়ী ভ্যানের কাছে গিয়ে তার সাক্ষারতকার নেয় বাংলা ইনিশিয়েটরের খাতুনে জান্নাত

আপনি কীভাবে বুঝলেন যে যুদ্ধে যাবার সময় এসে গেছে?

সেই সময় যারাই একটু নিরিবিলি ছিল, তাগোরেই মুক্তিযোদ্ধারা ঘর থেইকা ধইরা নিয়া গেছিল যুদ্ধ করার লেইগা। কারণ তখন মুক্তিবাহিনীতে লোকসংখ্যা কম ছিল। যাদেরকে মনে করত অস্ত্র চালাইতে পারব, তাদেরকেই ধইরা নিয়া যাইত।কিন্তু আমি নিজের ইচ্ছায়ই গেছিলাম একসময়।

কোন সময়ে গিয়েছিলেন যুদ্ধে?
সেটা তো ঠিক খেয়াল নাই।তবে মনেহয় বৈশাখের শেষের দিকে মনে হয়।

আপনার বয়স তখন কত ছিল?
১৮/১৯ বছরের মত হবে।

আপনার ট্রেনিং কোথায় হয়েছিল?
জোহরেরকান্দিতে

যুদ্ধে আপনার লিডার কে ছিল?
হেমায়েত বাহিনীর প্রধান,বীর বিক্রম,হেমায়েত উদ্দীন।

হেমায়েত উদ্দীনের সাথে কখন/কীভাবে পরিচয় হয়?
উনি যে সময় দেশে(গ্রামে) গিয়ে ঢোকেন,সে সময় মুক্তিবাহিনীর লোক কম ছিল। তাই উনি অনেককেই নিজে নিয়া যাইত ট্রেনিং দেয়ার জন্য। তো আমার এক কাকা ওনার পরিচিত ছিল, নাম গোলাম আলী। সে যুদ্ধে গুলি খাইয়া মারা গেছে। আমার এক ভাইও তার পরিচিত ছিল। নাম ফজলু। ও এখনও জীবিত আছে। তো ওদের মাধ্যমেই ওনার সাথে পরিচয়। অনেকেই সেসময় ভারতে গেছিল। আমি যাই নাই। আমি যোগ দিলাম মুক্তিবাহিনীতে।

হেমায়েত উদ্দীন মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন?
উনি খুবই ভালো মানুষ। আমাকে খুবই ভালোবাসতেন। এখনও বাসেন। দেশকেও খুব ভালোবাসতেন। তার পরিবারের লোক মারা গেছিল তখন। তবুও তিনি যুদ্ধ করতে গেছিলেন। তিনি একবার আহতও হইছিলেন। গালের ভিতর দিয়ে গুলি ঢুকে মুখের মধ্য গিয়ে বের হয়ে আসছিল।এই কারণে তার মুখের একপাশে দাঁত নাই। জিহ্বায়ও ব্যাথা পাইছিল।

ঐ সময় ওনার চিকিৎসা কোথায় হয়েছিল? জোহরকান্দির ভিতরেই একটা মেডিকেল ছিল ওইহানেই ওনার চিকিৎসা হইছিল।ওনার জীবন তো এখনও মানুষের দোয়ায়ই আছে।

পাকিস্তানীদের অত্যাচারের ধরণ কেমন ছিল?
তারা তো আমাগো অত্যাচার করতই। তারা প্রথম যেদিন আসছিল,ঐ দিনই তারাকান্দন নামে এক হিন্দু এলাকায় এক দিনেই প্রায় ৫০০ লোক মারছিল। তারাকান্দনের শতকরা ৮৫ ভাগই ছিল হিন্দু। তারা প্রায় সবাই-ই ভারতে চইলা গেছিল।

আপনাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা কেমন ছিল?
খুবই কষ্ট ছিল। দুইজনে ভাগ করে একটা রুটি খাইতাম। এর ওর বাড়ি থেইকা খাওয়া দিত। গোপনে দিত। তা না হইলে তো যে দিত তারে মাইরা ফেলতো।

আপনাদের যুদ্ধের কৌশল কী ছিল?
কৌশল বলতে আমরা সাধারণত যেই জায়গায় থাকতম,একদিন হয়তো হঠাৎ সেই জায়গা বদল করে যুদ্ধ শুরু করতাম।তারা গুলি করলে আমরা শুয়ে পড়তাম।তাদের সামনা-সামনি পড়তাম না কখনো।আমরা ১ টা গুলি খরচ করলে তারা করত ৫০ টা।কারণ,তাদের তো অস্ত্র বেশি ছিল,আর আমাদের ছিল কম।এই কারণে হিসাব কইরা খরচ করতাম।তারা ১০ টা গুলি করলে আমরা করতাম ১ টা।তবে যাই হোক,আল্লাহর রহমত ছিল।এদেশের জনগণেরও সহযোগিতা ছিল।যে যেভাবে পারছে সহযোগিতা করছে।

যুদ্ধে আমাদের কিছু কৌশল ছিল বলে শুনেছি।যেমন সাঁতার না জানলে পাকিস্তানীদের পানিতে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলা হতো।এরকম কৌশল করেছেন কখনো?

না, আমরা এইসব কৌশল করিনাই। তবে অনেকে তাগো খেয়া নৌকায় তুইলা নদীর মাঝখানে নিয়া নৌকা ডুবাইয়া দিত। এসব কৌশলের কারণেই তারা আমাগো লগে পারেনাই

সম্মুখ যুদ্ধ করেছিলেন কোন?
হা  ৩ টা।  মেরাটখোলায়, সিটীরবাজার আর কুর্পালাতে।

রাজাকাররা কী উৎপাত করত আপনাদের এলাকায়?
তারা তো উৎপাত করতই। তাদের জন্য ঐ সময় আমরা বাড়ি-ঘরে যাইতে পারতাম না। লুকায়ে থাকতে হইত।

কোন রাজাকারের নাম মনে পড়ে?
হ্যাঁ। আমাদের এলাকায় ছিল জয়নাল। সে মারা গেছে। আরও ছিল আবু বকর, শামসুদ্দীন।

আপনার গ্রাম কোথায়?
গোপালগঞ্জের কুর্পলা গ্রামে।

বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিল কখনো?
একবার হইছিল। টুঙ্গিপাড়ায়।

কী মনে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে দেখে?
এই প্রশ্ন করার পর উনি কেঁদে দেন। প্রায় ২/৩ মিনিট চুপ করে থাকার পর চোখ মোছেন।) সেইটা বলতে পারুম না। তবে যার জন্য জীবন দিতে গেলাম, দেশ স্বাধীন করতে গেলাম, সেই আজ নাই! এটাই আমার সবচেয়ে বড় দুঃখ। এই নেতা তো আর আসব না!

৭ই মার্চের ভাষণ শুনে কী মনে হয়েছিল ?
মনে হইছিল বঙ্গবন্ধুর কথা সত্যি।তারা আমাগোরে দাবায়া রাখতে চায়।পড়াশোন্ শিখতে দিতে চায় না।ছয় আনার এক দিস্তা কাগজ ১২ আনায় বেচত আমাগো কাছে।চাকরি দিত না।১০০ জনে ৫ জন বাঙালি চাকরি পাইত।তাই মনে হইছিল যুদ্ধ করা দরকার।

মুক্তিযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় পাওয়া কী?
পাওয়া তো কতই আছে। একটা বড় পাওয়া হইলো আমাগো যুদ্ধের বিভিন্ন তথ্য-ছবি নিয়া কান্দিতে একটা যাদুঘর করছে হেমায়েত তার নামে।

আপনি যেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন,তেমন বাংলাদেশ কী পেয়েছেন?
পাইছি স্বাধীনতা, যেটা তখন ছিল না। আপনাদের জন্য রাইখা যাইতে পারতেছি একটা স্বাধীন দেশ, এটাই পাওয়া।

কোন আফসোসই কী নেই?
আফসোস হইল সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাটা ঠিকমতো করতে পারতেছে না। কেউ সম্মান পায়, কেউ পায় না। আমি আমার কাগজ-পত্র, প্রমাণ জমা দিছি। সরকারি লোকেরা তা ঠিকঠাক করতেছে না। টাকা দিলে তারা করবে। আমি গরিব মানুষ, টাকা দিতে পারি না। তাই আমার গ্যাজেটও হয় না। পয়সা দিতে পারে না,তাই সরকার থেইকা সাহায্য পায় না এমন অনেক মুক্তিযোদ্ধা আইজ রিক্সা তালায়, তরকারি বেইচা খায়। এটাই আফসোস। তবে  আমি ভালোই আছি। আল্লাহ আমারে ভালো রাখছে। কর্ম করি, খাই। স্বাধীনতা পাইছি। আমি খুশি। আর আমি গর্বিত যে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা।

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।