প্রচ্ছদ » উড়াল » সংগঠন » স্বপ্ন পূরনের দেয়ালকোঠা

স্বপ্ন পূরনের দেয়ালকোঠা

 মাহমুদুর রহমান মুগ্ধ, বাংলা ইনিশিয়েটর, ঢাকা

কবি বলেছিলেন ‘আমাদের স্কুল এক রঙিন ফুল!’ কিন্তু শিশুদের জন্য স্কুলকে রঙ্গিনফুল হিসেবে সাজাতে বরাবরই আমরা ব্যর্থ। সকল শিশুদের প্রথমিক শিক্ষা  এখনো নিশ্চিত হয়নি। শিক্ষা শিশুর মৌলিক হলেও আমরা সব শিশুর কাছে এই মৌলিক অধিকার পৌছে দিতে আমরা ব্যর্থ। এই ব্যর্থতা বর্তমান প্রজন্ম প্রতিক্ষণ অনুভব করে। এমনি একদল তরুন মিলে গড়ে তুলেছে দেয়ালকোঠা।

দেয়াল কোঠা এক উন্মুক্ত দ্বার। এ দ্বার আহ্বান করে সেসব শিশুদের যারা মৌলিক অধিকার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। সাধারনত দেয়াল মানুষের পথ আটকে দেয়, তবে এ দেয়াল শিশুদের জন্য খুলে দিচ্ছে এক নতুন সম্ভাবনার পথ।

হ্যা বলছি রাজধানীর তেজগাঁও – বিজয় স্মরণী ফ্লাইওভারের তেজগাঁও প্রান্তে ফ্লাইওভারের নিচে মূল অবকাঠামো ভিত্তিক একটি দেয়ালকে ঘিরে গড়ে ওঠা দেয়াল কোঠার কথা। বিশাল আকৃতির এ দেয়ালটির বাম পাশে ঠিক উপর দিকটাতে রয়েছে ১১ লাইনের জাতীয় সঙ্গীত। একই পর্যায়ে ডান দিকটাতে রয়েছে লাল সবুজের পতাকা। পতাকার ঠিক নিচে হলুদ রঙয়ের বৃহাদাকার একটি বাংলাদেশের মানচিত্র। ক্রমান্বয়ে বামে আসলেই দৃষ্টিগোচর হয় বৃহাদার একটি বৃক্ষ, যার প্রতিটি ডালে পাতার বদলে স্থান পেয়েছে বর্ণমালা। অ-আ-ক-খ তে পরিপূর্ণ বৃক্ষটির বাম দিকেই একটি ব্ল্যাক বোর্ড আর তার ঠিক সামনে দেয়াল ঘেষে গড়ে তোলা সুদর্শন একটি বাঁশের মাচা।  এখানের তাদের মূল কার্যক্রম চালায় দেয়াল কোঠা।

দেয়াল কোঠার কার্যক্রম দেখতে ভিড় করেছে মানুষ

দেয়াল কোঠার পথচলার গল্পটা শুনি দেয়াল কোঠার সেক্রেটারি শাওন হাসনাত ও প্রোজেক্ট কো-অরডিনেটর মোনালিসা জাহানের নিকট। স্থপতি সাহজাবিন কবিরের নেতৃত্বে শুরু হয় দেয়াল কোঠার যাত্রা। অসহায় ভাস্যমান মানুষদের বিনোদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা থেকেই জায়গাটা দেখতে আসা। ফ্লাইওভারের নিচে অস্থায়ীভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে একটি বিনোদন কেন্দ্র তৈরী করে দেয়াই ছিলো তাদের লক্ষ্য, তবে বস্তির ছোট্ট শিশুরা যখন পড়ালেখা করার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করে তাদের আবদার ফেলতে না পারায় আর একই সাথে পরিবার গুলো সম্মতি প্রকাশ করায় দেয়াল কোঠা গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে সম্পূর্ণ রুপে বাস্তবায়ন সম্পন্ন করা হয়। যেহেতু দেয়ালকে ঘিরেই কার্যক্রম সেহেতু প্রকৌশলী সৃজন বড়ুয়া এর নাম করণ করেন দেয়াল কোঠা। শিক্ষাদানের পাশাপাশি পরিবারগুলোর বিনোদনের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পথনাটক, চলচিত্র প্রদর্শনী ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানানোর ব্যবস্থা করে থাকে দেয়ালকোঠা। পাশাপাশি নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও পরিচ্ছন্ন বাসস্থান।

দেয়াল কোঠার একদল শিক্ষার্থী

দেয়াল কোঠা শিশুদের দুই ধরনের শিক্ষা প্রদান করে থাকে। প্রথম ভাগ প্রাক-প্রাথমিক, দ্বিতীয় ভাগ সৃজনশীল। ১০ বছরের নিচের শিশুরা প্রথমভাগে শিক্ষা পেয়ে থাকে আর ১০ বছরের ঊর্ধ্বের শিশুরা দ্বিতীয় ভাগে। প্রাক-প্রাথমিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের দেয়া হয় হাতেখড়ি। বর্ণমালা, সংখ্যা শিক্ষাসহ ভিত্তিমূলক শিক্ষা প্রদানের দ্বারা প্রতিটি শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি উপযোগী করে গড়ে তুলে। দেয়াল কোঠা থেকে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করে বর্তমানে ১০/১২ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে যাদের সম্পূর্ণ খরচ দেয়াল কোঠা বহন করে।

গত শনিবার সন্ধ্যায় কথা হয় দেয়াল কোঠার সেচ্ছাসেবী ওয়ালিদ হোসাইন এর সাথে। তিনি জানান বর্তমানে তার ক্লাসে প্রায় ২৫ জন শিক্ষার্থী আছে এবং তিনি তাদের সাফল্য নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী

স্কুলের শিক্ষার্থী আট বছর বয়সী মিতু বলল, ‘এইখান থেইকা অনেক কিছু  শিখছি, জানুয়ারিতে বিজি প্রেস স্কুল নাইলে মনু মিঞা স্কুলে ভর্তি হমু’

অন্যদিকে, সৃজনশীল বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংকন সহ বিভিন্ন হস্তশিল্পের কাজ শেখানো হয়। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের অনেকে ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় উল্লেখযোগ্য স্থান পেয়ে পুরস্কৃত হয়েছে। শিশুদের পাশাপাশি তাদের মায়েদের স্বাবলম্বী করে তুলতে দেয়াল কোঠা তাদের ব্লক ও বাটিকের কাজের প্রশিক্ষণ দেয়। শিক্ষার্থীদের মগ, টি-শার্ট, ব্যাগ সহ বিভিন্ন পন্যে মুদ্রণ উপযোগী ভিত্তিক অংকন শেখানো হয় যাতে তারা দক্ষতাটিকে উপার্জনক্ষম করে তুলতে পারে।

এভাবেই চলে দেয়াল কোঠার মূল কার্যক্রম

 

শাওন হাসনাত বাংলা ইনিশিয়েটরকে জানায়,  স্থাপনে্র সময়  বিভিন্ন বাধা আসলেও সকল বাধা অতিক্রম করে তারা স্থাপন করেন স্বপ্নের দেয়াল কোঠা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নিকট পাঁচ বছরের অনুমোদন নিয়ে শুরু  এবং ভবিষ্যৎ এ তার পরিমাণ আরো বাড়ানো হবে বলে  আশাবাদী তিনি। তিনি আরো জানান ইতোমধ্যে দেয়াল কোঠা ভ্রমণ করে গেছেন মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী,  ইউ এস এম্বাসির কর্মকর্তা সহ বেশ কিছু  বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

সংগঠন্টির জন্য  প্রথম অর্থ তহবিল আসে ইএমকে সেন্টারের পক্ষ থেকে। বর্তমানে এ ভার বহন করছে ‘ডেসকো’ সহ ব্যক্তি পর্যায়ে কয়েকজন। এছাড়া দেয়াল কোঠার স্বাস্থ্য বিষয়ক সহযোগী সংস্থা কিউরাস ফাউন্ডেশন। তবে, তাদের শিক্ষার্থীরা একদিন স্বাবলম্বী হয়ে এ সংগঠনটির ভার বহন করবে এটাই তাদের আকাঙ্ক্ষা ।

 

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।