প্রচ্ছদ » উড়াল » জীবনী » স্বপ্নযাত্রার স্বপ্নদ্রষ্টা মাকসুদুল আলম

স্বপ্নযাত্রার স্বপ্নদ্রষ্টা মাকসুদুল আলম

 খাতুনে জান্নাত, বাংলা ইনিশিয়েটর, ঢাকা

২০১০ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। বিজ্ঞানীরা উন্মোচন করেন তোষা পাটের জীবনরহস্য। এর ঠিক দুই বছর পর, ২০১২ সালে উন্মচিত হয় পাটের জন্য ক্ষতিকর একধরণের ছত্রাকের জিননকশা। আর পরেরবছর, ২০১৩ সালে উন্মোচিত হয় সাদা পাটের জিননকশা।

পরপর এই তিনটি আবিষ্কারের কারণেই বলা যায় নতুন জাতের পাট উৎপাদনের ভিত্তির কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশের পাটের সে সোনালী দিন ফিরিয়ে আনতে এই আবিষ্কারগুলো অনেকাংশেই ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হয়। আর এই তিনটি আবিষ্কারেই নেতৃত্ব দেন বাঙালী বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম।

কেন পাটের জিনোম আবিষ্কার আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণঃ পাটকে বলা হয় বাংলাদেশের সোনালী আঁশ। এর সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিহ্য। পাট পৃথিবীর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ তন্তু। পাট থেকে পাওয়া যায় প্রাকৃতিক, পুন্যব্যবহার্য এবং পচনশীল সেলুলোজ। যার কারণে পলিথিনের পরিবর্তে ব্যবহার করা যায় একে। পাটের ৭৫ শতাংশ সেলুলোজ, ১১-১৪ শতাংশ লিগনিন ও ১২ শতাংশ জাইলিন। পাট থেকে তৈরি করা যায় কাগজ ও জৈব জ্বালানি। পাটের পাতা আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ঔষধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া পাটের পাতায় আছে ভিটামিন। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রায় এক কোটি ২০ লাখ লোকের জীবন-জীবিকা পাটের উপর নির্ভরশীল। যেই পাটের ওপর এত কিছু নির্ভরশীল,সেই পাটের জেনোম বা জিননকশা উৎপাদন হয়ে ওঠে আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ, জেনোম আবিষ্কার করতে পারলে পাওয়া তৈরি করা যাবে নতুন প্রজাতির পাট। পাটে একটি জাতের গুণ অন্যটিতে ঢুকিয়ে নতুন জাত তৈরি করা সম্ভব ছিল না, কারণ এর জাতই কম। তাই পাটের জেনোম আবিষ্কার নিঃসন্দেহে এক্ষেত্রে গুরিত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

স্বপ্নযাত্রার যাত্রা শুরুঃ ২০০৮ সালে বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম রাবারের জিননকশা আবিষ্কারের কাজ শেষ করে পাটের জিননকশা উন্মোচনের কাজ শুরু করেন যার নাম ছিল “স্বপ্নযাত্রা”।  ২০১০ এবং ২০১৩ সালে এ কাজে তিনি সফল হন।

স্বপ্নযাত্রার স্বপ্নদ্রষ্টাঃ বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম বাঙালী সাধারণ পরিবারের সন্তান। ১৯৫৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর ফরিদপুরে তার জন্ম হয়। তার বাবা দলিলউদ্দিন আহমেদ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের কর্মকর্তা ছিলেন। মা লিরিয়ান আহমেদ ছিলের সমাজকর্মী ও শিক্ষক। মাকসুদুল আলম যখন লয়ালপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরতি হন,তখন দেশজুড়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। সেই যুদ্ধে তার বাবা শহীদ হন। তখন থেকেই তাদের আট ভাইবোনের বিরাট সংসার মা লিরিয়ান আহমেদ শিক্ষকতা করে চালান। তাই মা-ই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

মাকসুদুল আলম মস্কো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুপ্রাণবিজ্ঞানে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তারপর আবার জার্মানির বিখ্যাত ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট থেকে প্রাণরসায়নে পিএইচডি করেন। মস্কোয় এসে ড. মাকসুদুল আলম ভ্লাদিমি পেট্রোভিচ মুলাভেচের সংস্পর্শে আসেন। তার কাছ থেকেই মাকসুদুল আলম শিখেছেন স্বপ্ন দেখতে, শিখেছেন প্রকৃতির অজানা রহস্য নিয়ে ভাবতে। বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম তৈরিতে তাই তার অনেক অবদান। পাট ছাড়াও তিনি ২০০৮ সালে পেঁপের এবং এরপর রাবারের জিননকশা উন্মোচন করেন।

মৃত্যুঃ  ২০১৩ সালে মাকসুদুল আলমের দলের মাধ্যমে উন্মোচিত হয় সাদা পাটেরেডি জেনোম। পাটের জেনোম আবিষ্কারের পর তিনি নতুন জাতের পাট উৎপাদনের কাজে হাত দেন। তিনি এমন পাট উৎপাদন করা শুরু করেছিলেন, যা কম পানিতে জাগ দেওয়া যাবে এবং তন্তু হবে অনেকটা উলের মতো মিহি। কিংবা পাটখড়ি দিয়েই বানানো যাবে আসবাব। তবে তিনি তার কাজ শেষ করতে পারেননি। তখন যকৃতের জটিলতায় ভুগছিলেন। তাই চিকিৎসাধীন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ে কুইন্স মেডিকেল সেন্টারে। সেখানেই ২০১৪ সালের ২০ ডিসেম্বর অর্থাৎ আজকের দিনে মাত্র ৬০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। এত তাড়াতাড়ি তিনি মারা না গেলে হয়তো আরও অনেক অজানা রহস্যই আমরা জানতে পারতাম। চলতি বছরই বাংলাদেশ সরকার তাকে স্বাধীনতা পদক প্রদান করেন।

“স্বপ্ন দেখো,তুমি পারবে” : স্বপ্নের পেছনেই ছুটে ছুটেই এতদূর এসেছিলেন তিনি। তরুণদেরও তাই প্রকৃতির অজানা রহস্যের সন্ধান জানার মন্ত্র বলে গেছেন। তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন, “স্বপ্ন দেখো, তুমি পারবে।”

আমরা সত্যিই স্বপ্ন দেখি। আমরা স্বপ্ন দেখি আরও হাজার হাজার মাকসুদুল আলমের, যারা এভাবেই এগিয়ে নিয়ে যাবে বাংলাদেশকে। মাকসুদুল আলমের মৃত্যুতে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে আমাদের,তা পূরণ করবে তারা। সেদিন হয়তো বাংলাদেশকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।