প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » অতিথি কলাম » সামিহা ও একটি বৈষম্যের উপাক্ষান

সামিহা ও একটি বৈষম্যের উপাক্ষান

মার্জিউর আর চৌধুরী

সামিহারা তিন বোন। তাদের কোনো ভাই নেই। সামিহা দশম শ্রেণিতে পড়ে। তার ছোট বোনের যে দিন জন্ম হলো সে দিন তার বড় চাচা আবেগে কেঁদে উঠলেন। নতুন শিশু জন্ম হওয়ার খুশিতে নয়। কন্যা সন্তান জন্ম হওয়ার দুঃখে। তিনি এমন দুঃখ পেলেন, তার ফলে নতুন শিশুরর অগমনের জন্য একটা মিষ্টিও বিতরণ করলেন না। তার কয়েক মাস পর সামিহার আরেক চাচার স্ত্রী পুত্র সন্তান জন্ম দেন।

সেদিন পুরো বাড়িতে পরে যায় আনন্দের হিরিক। সামিহার বড় চাচা তিন-চারটা বড় গরু জবাই করে ছেলে শিশুর আকীকা দিলেন। আর সামিহাদের জন্য রাখলেন অপমান আর লাঞ্চনা। এই ভাবে দিন কেটে যায়। সামিহা পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পায়। এই খবর সে খুশি মনে তার বড় চাচাকে জানায়। কিন্তু তার বড় চাচা তাকে আদর আর উপহার দেওয়ার বদলে দেয় অপমান। তিনি বলেন, মেয়ে মানুষ বেশি পড়াশুনা করে কি করবি? অপর দিকে তার চাচাতো ভাই কোনো রকমে পরিক্ষায় পাশ করে। তার জন্য এই ফলাফলের পরও থাকে হাজারো উপহার। আর সামিহাদের কপালে জোটে বৈষম্য আর উপহাস।

প্রাচীন কাল থেকে বাঙালী নারীরা নিজ পরিবার থেকেই বৈষম্য আর লাঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। প্রতিদিন এভাবে মেয়ে হওয়ার কারণে বঞ্চনার চাকার পিষে যাছে হাজারো সামিহা। সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায়, সমাজের মূল স্থম্ভ হলো পরিবার। পরিবার হলো প্রত্যেকটি মানুষের আপন ও নিরাপদ জায়গা। যেখানে সে মন খুলে সবকিছু বলতে পারে। সেখানে অপমান আর লাঞ্চনার ভয় নেই। কিন্তু আমাদের সমাজে নারীরা তার পরিবার থেকেই বৈষম্য লাঞ্চনার বোঝা নিয়ে জীবনের পথে এগোতে থাকে। নিজ পরিবার থেকেই যখন একজন নারী বৈষম্যের শিকার হতে থাকে, তখন চোখ বন্ধ করে বলা যায় অন্য জায়গায় কি হবে। তাই নারীর প্রতি বৈষম্য রোধ করতে আমাদের পরিবার থেকে প্রথমে এই সমস্যাটি রোধ করতে হবে।

পরিবারে ছেলে হোক মেয়ে হোক তাকে সমান চোখে দেখতে হবে। একজন ছেলে যেমন পড়াশুনা করে চাকরী নিয়ে পরিবারের হাল ধরতে পারে তেমনি একজন মেয়েও পরিবারের হাল ধরতে পারে। একটা ছেলের চাইতে একটা মেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। ছেলেরা যেমন পরিক্ষায় ভাল ফলাফল করে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জল করতে পারে তেমনি মেয়েরাও পড়াশুনায় ভাল ফলাফল করে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জল করতে পারে। আমরা যখনই নারী বৈষম্যের মতো জঘন্য ব্যাপার কে পরিবারের মতো জায়গা থেকে উৎঘাত করতে পারবো তখনি অন্যান্য জায়াগায় একটু একটু করে এই জঘন্য জিনিসটা কমে যাবে।

আমি কাউকে নারীবাদী হতে বলছি না। বলছি না সবাই নারী অধিকার আর বৈষম্য দুর করার জন্য আন্দোলন আর রাস্তায় নেমে শ্লোগান দিন। শুধু বলছি, নারী অধিকারের জন্য নিজের জায়গা থেকে চার পাশে যতটুক পারা যায় করুন। পরিবারে এই সব ঘটনা ঘটলে সেগুলো রোধ করার চেষ্টা করুন। দরকার হলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে আলোচনায় বসুন। আমরা যদি প্রতিদিন নিজ জায়গা থেকে একটা করে সামিহার গল্প তৈরী হওয়া বন্ধ করতে পারেন তাহলে একদিন হয়তো আর কখনো সামিহাকে নিয়ে এই রকম বৈষম্যের গল্প লিখতে হবে না।

আবার সামিহার গল্পে ফিরে আসি। সামিহার বড় বোনের লিভারের অশুখ। তার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। অন্য দিকে তার বাবা-চাচারা দাদার সম্পত্তিরর ভাগ বাটোয়ারা করতে বসলেন। হটাৎ তার এক চাচা বলে উঠলেন, সামিহার বাবার তিন মেয়ে তাকে সম্পত্তি দিয়ে লাভ নেই। তাদের প্রত্যেকের ছেলে আছে তাই ঐ সম্পত্তি তাদের পাওয়া উচিৎ। এদিকে সামিহার বোনের চিকিৎসার খরচ চালানোর জন্য হলেও জমিজমা প্রয়োজন। এই সব দেখে সামিহা প্রতিবাদী হয়ে উঠে। সে এই ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানায়। কিন্তু সে ছোট বলে সবাই তাকে, ছোট মানুষ চুপ করে থাক। কিন্তু সে দমে যায় নি। নিজের জায়গা থেকে নিজের অধিকার আর প্রাপ্য টুকুর কথা বলে যায়।

আমি আবারো বলছি নারীদের সব জায়গায় সমান অধিকার দেওয়ার চেষ্টা করুন। এই ব্যাপারে আর কথা বাড়ালাম না। এইবার নারীদের উদ্দেশ্যে বলি। কোনো ব্যাপারে চুপ করে থাকা যাবে না। নিজের ক্ষতি হয় কিংবা অধিকার ক্ষুন্য হয় এমন ব্যাপারে চুপ করে বসে থাকলে চলবে না। নিজের অধিকারের কথা গলা উচু করে বলে যেতে হবে। চুপ করে সহ্য করলে কোনো দিনও সমস্যার সমাধান আসবে না। “না” বলা আর প্রতিবাদ করার ক্ষমতা অর্জন করে হবে। আর কিছু দায়িত্বেরর কথাও বলে দিচ্ছি আপনার সন্তান,ভাই কিংবা পরিবারের যে সদস্যই হোক আপনি তাকে নারী বৈষম্য বিরোধী শিক্ষা দিন। এই কু-ব্যাপারটি প্রভাব সম্পর্কে জানান। এই ভাবেই হয়তো একদিন শুরু হবে নতুন পথের যাত্রা।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, বর্ণমালা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ইনিশিয়েটর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ইনিশিয়েটর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।