প্রচ্ছদ » উড়াল » ফিচার » ইতিহাসের গহ্বরে একদিন

ইতিহাসের গহ্বরে একদিন

খাতুনে জান্নাত, বাংলা ইনিশিয়েটর, ঢাকা

ডিসেম্বরের ২১ তারিখ। হঠাৎ করেই সবুজ ভাই জিজ্ঞেস করল, “জল্লাদখানা বধ্যভূমি যাবি?” আমি চিন্তা করলাম এটা আবার কোন বধ্যভূমি! বধ্যভূমি বললেই আমার মনে শুধু রায়েরবাজার বধ্যভূমির কথা আসে। জল্লাদখানা বধ্যভূমির নাম এর আগে শুনিনি কখনো। ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায় এটা?” ভাইয়া বলল, “এইতো কাছেই।” কাছেই শুনে কোনরকম চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই যেতে রাজি হয়ে গেলাম।

বদ্ধভুমির ইনচার্জ নাসির সাহেব আমাদের জল্লাদখানার ইতিহাস শোনাচ্ছেন

আমি , সবুজ ভাইয়া আর আসিফ ভাই  রওনা হলাম বিকাল ৪ টার দিকে। মিরপুর ১৩ থেকে কিছুক্ষণ হাঁটতেই পৌঁছে গেলাম জায়গাটাতে। দেখলাম গেটের সামনে বধ্যভূমির নাম লেখা। ডানপাশে একটু ওপরে জল্লাদখানা বধ্যভূমি সম্পর্কে কিছু তথ্য দেয়া। তথ্যগুলো পড়ে ভেতরে ঢুকলাম।

বধ্যভূমির ভেতরে ঢোকার সময় কতগুলো সিঁড়ি পার হয়ে তারপর নিচে নামতে হয়। ঢোকার পর প্রথমেই চোখে পড়ে একটি মাঠ। মাঠের একপাশে নির্দেশনা দেয়া কোথা থেকে দেখা শুরু করতে হবে। নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা দেখতে শুরু করলাম।

প্রথমেই দেখলাম পাথরের বেদীর মতো একটা স্থানে লাল অক্ষরে লেখা, “সাক্ষী বাংলার রক্তভেজা মাটি সাক্ষী আকাশের চন্দ্রতারা ভুলিনাই শহীদদের কোন স্মৃতি ভুলব না কিছুই আমরা।” এর পাশেই এরকম আরো অনেকগুলো পাথরের বেদীতে বিভিন্ন বধ্যভূমির নাম লেখা। ঢাকার ২৩ টা বধ্যভূমিসহ সেখানে প্রায় চার শতাধিক বধ্যভূমির নাম এবং বধ্যভূমিটি কোথায় অবস্থিত তা দেয়া আছে। দেখতে দেখতে আমরা এর পূ্র্বপাশে চলে যাই। চোখে পড়ে একটি ভাস্কর্য। পাশেই ভাস্কর্যের নাম লেখা – জীবন অবিনশ্বর। এর শিল্পী রফিকুন নবী ও মুনিরুজ্জামান।

ভাস্কর্যটির মানে বোঝার জন্য কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে হয়। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। একটু পরে বুঝতে পারলাম। স্থাপনাটির ওপরে একটি সূর্য। আর নিচে ছয়টি মৃত মানুষের দেহাবশেষ। যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে। তাদের শোকে সূর্যটাও হয়ে উঠেছে কালো। ভাস্কর্যটির মানে বোঝার পর এক অজানা কারণেই মনটা বিষণ্ন হয়ে উঠল।

জীবন অবিনশ্বর ভাষ্কর্য । ছবিঃ ইফতেখার তাসনিম

আরও একটু সামনে এগিয়ে গেলাম। বিভিন্ন বধ্যভূমির নাম সহ সেখানে রাখা আছে ছয়টি বধ্যভূমির মাটি। যার মধ্যে জয়পুরহাটের পাগলাদেওয়ান বধ্যভূমি, খুলনার চুকনগর বধ্যভূমি, চট্টগ্রামের ফয়েস লেক বধ্যভূমি উল্লেখযোগ্য।

এসব দেখার পর এবার দেখতে গেলাম সেই স্থান,যেখান থেকে মৃতদের দেহ খুঁজে বের করা হয়েছে। সাদা কাঁচের ওপর সেখানে রক্তের লাল অক্ষরে লেখা, “মাথা নত করে শ্রদ্ধা জানাই সকল শহীদদের প্রতি।”

এরপর একটা কক্ষে ঢুকি। এখান থেকেও মৃতদের দেহ তোলা হয়েছে। খেয়াল করলাম ঢোকার সময় ওপরে একটি ঘন্টা। তবে ঠিক সাধারণ ঘন্টার মতো না। ঘন্টার নিচে ঝুনঝুনি লাগানো। ব্যাপারটা বুঝলাম না। তাই ঘন্টাটাও স্পর্শ করলাম না। সরাসরি ভেতরে ঢুকে গেলাম।

আরও পড়ূনঃ ইতিহাসের এক নির্মমতার সাক্ষী জল্লাদখানা বধ্যভূমি

ভেতরে আলো জ্বালানো। তবুও কেন যেন একটা গুমোট ভাব আছে। এই ঘরটাতে আসলে কেন যেন মনেহয় ৪৫ বছর পিছিয়ে গেছি আমি। কল্পনা করার চেষ্টা করি সেই সময়টা,যখন হাজার হাজার মানুষ মারার পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর আল সামস।

ঘরের ভেতর বিভিন্ন তথ্য ও ছবি দেয়া। ছবিগুলো মধ্য যখন এই বধ্যভূমি থেকে মৃতদের হাড় ও কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়, সে’সময়ের ছবি রয়েছে। এছাড়া স্বচ্ছ সাদা কাঁচের ভেতরে দেখা যায় জুতা, টুপি,তসবি, গেঞ্জির মতো কিছু ব্যবহার্য জিনিস যা মৃতদের দেহ থেকে পাওয়া যায়। দেয়ালে জল্লাদখানা বধ্যভূমি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দেয়া যা থেকে জানা যায় এ বধ্যভূমি থেকে ৭০ টি মাথার খুলি,৫৩৯২ টি অস্থিখন্ড,শাড়ি, ফ্রক, ওড়না, অলংকার, জুতা,তসবিহসহ শহীদদের নানা ব্যবহার্য জিনিস উদ্ধার করা হয়েছিল। এই বধ্যভূমিতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে হত্যা করা ফেলা হয়,যার মাত্র ৩৯ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। এর মধ্যে আছেন খন্দকার আবু তালেব, রমিজ মিয়া, শেখ মহিউদ্দীন আহমেদ, আক্কাস আলী ইত্যাদি।

বদ্ধভুমি থেকে উদ্ধারকৃত বিভিন্ন বস্তু । ছবিঃ ইফতেখার তাসনিম

পরিচয় পাওয়া শহীদের তালিকা। ছবিঃ ইফতেখার তাসনিম

কক্ষটির সামনের অংশে কালো কালো টাইলস লাগানো, যার অর্থ এখানে পা রাখা যাবে না। এখানে আছে শহীদদের কবর।

সবকিছু দেখা শেষ করে কথা হলো জল্লাদখানা বধ্যভূমির ইনচার্জ কে এম নাসিরউদ্দীনের সঙ্গে। তার কাছ থেকে পাওয়া গেল নানা অজানা তথ্য। তিনি সামনের মাঠটি দেখিয়ে আমাদের বললেন, “তোমরা কী জানো কেন এই মাঠে কোন গাছ লাগানো হয়নি? এই মাঠ কেন খাঁ খাঁ করছে? এই মাঠটা হলো একটা শূন্য হৃদয়। যেসব মায়ের সন্তান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে,তাদের বুক যেমন শূন্য হয়ে গেছে,তাদের হৃদয় যেমন খাঁ খাঁ করে সন্তানের জন্য তীব্র বেদনায়,এই মাঠটাও তেমনি শহীদ সন্তানদের মায়ের মতো খাঁ খাঁ করছে।”

জল্লাদখানা বদ্ধভুমির ইনচার্জ জনাব নাসির সাহেব আমাদের জল্লাদখানার ইতিহাস শোনাচ্ছেন

কথা বলতে বলতে একসময় আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ওই ঘরের ওপর ঘন্টা কেন। তিনি বললেন, “ঘন্টাটা ওখানে রাখা হয়েছে যেন কেউ ওই ঘরে প্রবেশের সময় ঘন্টা বাজিয়ে প্রবেশ করে। ঘন্টা বাজালে শহীদদের আত্মা জেগে উঠবে। তাদের অন্তর-আত্মার সঙ্গে আমাদের অন্তর-আত্মার কথোপকথন হবে। আমাদের অন্তর-আত্মা তখন তাদের অন্তর-আত্মাকে প্রশ্ন করবে, “তুমি কেন এখানে শুয়ে আছো? কেন তোমাকে শহীদ হতে হয়েছে?”  তখন তাদের অন্তর-আত্মা জবাব দেবে, “আমি তোমার জন্য শহীদ হয়েছি। শুধু তোমার জন্য। শুধু তোমাকে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দেয়ার জন্য আমাকে শহীদ হতে হয়েছে। আজ তুমি পেয়েছ স্বাধীন দেশ, হয়েছ স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। কিন্তু আমি পাইনি কিছুই। তবুও তোমরা এই দেশকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করলেই আমার পাওয়া হয়ে যাবে অনেককিছু।”

মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম ওনার কথা। এত সুন্দর মানে যে কোন কিছুর থাকতে পারে তা আমার ধারণার মধ্যেই ছিল না। উনি তখন আবারও শুরু করলেন, “তোমরা কী খেয়াল করেছ যে তোমরা সাতটা সিঁড়ি পার হয়ে এসেছ?” সিঁড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলাম সিঁড়ি পার হয়ে এসেছি তা জানি,তবে সাতটি কিনা তা তো গুনিনি! নাসিরুদ্দীন সাহেব তখন বললেন, “তোমরা হয়তো গুনে গুনে নামনি। ওখানে আছে সাতটা সিঁড়ি,যার মাধ্যমে তোমরা নেমে এলে মূল রাস্তা থেকে তিন ফুট নিচে। সাতটি সিঁড়ি দিয়ে তোমরা অতিক্রম করলে কালের সাতটি ধাপ। এই সাতটি সিঁড়ি দিয়ে স্মরণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠকে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে।” বলতে বলতে একটু থামেন তিনি। তারপর আবারও শুরু করেন, “আচ্ছা,এখানকার দেয়ালগুলোর মানে কী তোমরা জানো?” আমরা ভীষণ অবাক হলাম।

ভাইয়া তো জিজ্ঞেস করেই ফেলল, “দেয়ালেরও মানে আছে?” তিনি তখন জোরকন্ঠে বললেন, “হ্যাঁ,এখানকার প্রতি বিন্দু জমির একটি মানে আছে,একটি অর্থ আছে।” আমরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলাম দেয়ালগুলোকে। অনুজ্জ্বল কতগুলো ইট একসঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা দেয়াল। বুঝতে পারলাম না এগুলোর মানে কী। জানার জন্য নাসিরুদ্দীন সাহেবের দিকে তাকালাম। উনি তখন আবারও বলতে শুরু করলেন, “এই দেয়ালগুলোর মানে হলো শহীদেরা কাঁধে কাঁধ রেখে দাঁড়িয়ে নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করে চলেছে। তাদের আর কোন রক্ষীর প্রয়োজন নেই, তারা নিজেরাই সম্মিলিতভাবে রক্ষা করবে নিজেদেরকে।” দেয়ালের এমন সুন্দর অর্থ শুনে চমৎকৃত হলাম আমরা সবাই। আবারও তাকালাম দেয়ালের দিকে। এবার আরও অবাক হলাম। এতক্ষণ যে দেয়ালগুলোকে মনে হচ্ছিল শুধুই কতগুলো অনুজ্জ্বল প্রতিরক্ষা বুহ্য, সেগুলোকে দেখে এখন সত্যিই মনে হচ্ছে শহীদেরা কাঁধে কাঁধ রেখে দাঁড়িয়ে আছে। যারা অবিরামভাবে রক্ষা করে চলেছে নিজেদের।

জল্লাদখানার দেয়াল । ছবিঃ ইফতেখার তাসনিম

আরও একটি স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে জল্লাদখানা বর্ধভূমিতে। যার অর্থ এখনও জানা বাকী। নাসিরুদ্দীন সাহেব সে সম্পর্কে বললেন, “এখানে সকল কিছুই তৈরি করা হয়েছে সাধারণ বাংলা ইট দিয়ে। শুধুমাত্র এই স্তম্ভটাই তৈরি করা হয়েছে তূলনামূলক দামি আর নতুন ধরণের ইট দিয়ে। এর মানে এই স্তম্ভটাকে বোঝানো হয়েছে নতুন প্রজন্ম হিসেবে। এই স্তম্ভটার উপরে একটা পতাকাও আছে। আমাদের নতুন প্রজন্ম এই স্তম্ভের মতোই উজ্জ্বল এবং দৃঢ়। দৃঢ় বললাম কারণ এর উপরে আছে চল্লিশ ফুট এবং মাটির নিচেও আছে চল্লিশ ফুট। আমাদের নতুন প্রজন্ম এমনই;বাঙালিকে কেউ চাইলেই উপড়ে ফেলতে পারবে না।”

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার আরও অনেক কথা বললেন জনাব কে এম নাসিরুদ্দীন। তার কথা শুনে কখনো পাক হানাদার বাহিনীর প্রতি ক্রোধে মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে ওঠেছিল হাত, কখনো বেদনায় অশ্রুসিক্ত হয়েছিল চোখ। অদ্ভুত এক অনুভূতির সাথে পরিচিত হয়েছিলাম সেদিন, যা আগে কখনো হয়নি। কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা হয়ে গেলে তিনি আমাদেরকে জানান যে এখন বদ্ধভূমি বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা তখন যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হই। তবে যাওয়ার আগে প্রচন্ডভাবে আরেকবার ঘন্টা বাজিয়ে ওই ঘরটাতে প্রবেশ করতে ইচ্ছা করে। আগে তো জানতাম না কেন ঘন্টাটা রাখা,তাই ঘন্টাটা বাজাইনি। কিন্তু জানার পর প্রচন্ড ইচ্ছাটাকে দমন করতে পারছিলাম না। খুব ইচ্ছা হচ্ছিল ঘন্টা বাজিয়ে শহীদদের অন্তর-আত্মাকে জাগিয়ে তুলতে। খুব ইচ্ছা হচ্ছিল তাদের অন্তর-আত্মার সাথে কথা বলতে। খুব ইচ্ছা হচ্ছিল শুনতে, “তোমার জন্য,শুধুমাত্র তোমার জন্য আজ আমি এখানে শুয়ে।” আমি তখন ওই ঘরটাতে যেতে চাইলে নাসিরুদ্দীন সাহেব জানালেন সন্ধ্যা হওয়ার কারণে ঘন্টাটা নামিয়ে ফেলা হয়েছে। আমি যেন আরও একদিন আসি। শুনে ভীষণ মন খারাপ হলো। তবে কী আর করা! রওনা হলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। তবে বাড়ি ফেরার সময় সাথে ছিল নতুনভাবে দেশ গড়ার স্বপ্ন আর শহীদদের জন্য এক অজানা বেদনা। ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি,তা রক্ষা করতে হবে আমাদেরই। নিজের মনের অজান্তেই বারবার বলে উঠছিলাম, “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমরা তোমাদের ভুলব না।”

শ্রদ্ধাভরে বদ্ধভূমির যে ড্রেন থেকে শহীদের দেহাবশেষ তোলা হয়েছিল তা দেখছে দুই শিশু

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।