প্রচ্ছদ » বাংলাদেশ » ইতিহাসের এক নির্মমতার সাক্ষী জল্লাদখানা বধ্যভূমি

ইতিহাসের এক নির্মমতার সাক্ষী জল্লাদখানা বধ্যভূমি

 খাতুনে জান্নাত, বাংলা ইনিশিয়েটর, ঢাকা

” জীবন অবিনশ্বর” । ছবিঃ ইফতেখার তাসনিম

বধ্যভূমি মানে হলো নির্জন স্থান। তবে আমাদের কাছে বধ্যভূমির আরও একটি মানে আছে। পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশী দোসররা স্বাধীনতাকামী বাঙালীদের মেরে যেসব নির্জন স্থানে পুঁতে দিয়েছিলেন,সেসব স্থানকেও আমরা বধ্যভূমি বলি। ঢাকার রায়েরবাজার এরকম একটি পরিচিত বধ্যভূমি,যেখানে অসংখ্য মানুষকে মারা হয়েছে। তবে অনেক বধ্যভূমিই আছে,যেসবের কথা মানুষ তেমন করে না জানলেও সেগুলো বাঙালীদের সাথে ‘৭১-এ হওয়া চরম নির্মমতার সাক্ষী দেয়। রাজধানীর জল্লাদখানা বধ্যভূমি সেরকমই একটি বধ্যভূমি।

রাজধানী মিরপুরের ১০ নং সেকশনের ডি ব্লকে অবস্থিত বধ্যভূমিটি। একাত্তরে মিরপুর খালের ধারের এ নির্জন এলাকায় দুটি পয়ঃনিষ্কাশন ট্যাঙ্কের উপর ছিল একটি পরিত্যাক্ত পাম্প হাউজ। নির্জন বলে এ জায়গাটিকে ঘাতকেরা বেছে নিয়েছিল। পুরো নয়মাস জুড়ে প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে এ জায়গায় হত্যা করা হয়। যার মাত্র ৩৯ জনের পরিচয় পাওয়া সম্ভব হয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই এ বধ্যভূমিটির সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। সেসময় এখানে যেসব কঙ্কাল পড়ে থাকতে দেখা যায়,স্থানীয় মানুষেরা সেসব জল্লাদখানার পাশে দাফন করে।

আরও পড়ুনঃ  ইতিহাসের গহ্বরে একদিন

 

প্রাথমিকভাবে সেসময় এখানকার পাম্প হাউজের নিচে অবস্থিত প্রায় ৩০ ফুট গভীর ট্যাঙ্ক দুটির ভিতর থেকে উদ্ধার করা হয় মানুষের কঙ্কাল। এ বধ্যভূমি থেকে ৭০ টি মাথার খুলি,৫৩৯২ টি অস্থিখন্ড,শাড়ি,ফ্রক,ওড়না, অলংকার,জুতা,তসবিসহ শহীদদের ব্যবহার্য নানা জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়েছিল। এ পাম্প হাউজের ভেতরেই একটি উঁচু বেদীতে উর্দুতে লেখা ছিল ‘জল্লাদখানা’। প্রায় প্রতিটি বধ্যভূমিতে মানুষকে গুলি করে মাটিচাপা দিলেও এখানে তা করা হয়নি। এখানে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে জবাই করে। তাই এটি ‘জল্লাদখানা’ নামে পরিচিত হয়েছিল।

জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে প্রবেশ করতে হয় সাতটি সিঁড়ি পার হয়ে। যার দ্বারা সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের কথা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা বোঝানো হয়। এমন করে এখানকার প্রতিটি স্থাপনারই কোন না কোন অর্থ আছে। রাস্তা থেকে তিনফুট নিচের এই বধ্যভূমিতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে একটি মাঠ। যার ওপর কোন গাছ নেই। বৃক্ষহীন এই মাঠ দ্বারা মুক্তিযুদ্ধে সন্তানহারা মায়ের বুকের হাহাকারকে বোঝানো হয়েছে। ঢোকার পর হাতের বামপাশে একটি বেদীতে লাল অক্ষরে লেখা রয়েছে,

সাক্ষী বাংলার রক্তভেজা মাটি

সাক্ষী আকাশের চন্দ্রতারা

ভুলিনাই শহীদদের কোন স্মৃতি

ভুলব না কিছুই আমরা।”

এছাড়া সেখানে আরও চোখে পড়বে ঢাকার ২৩ টি বধ্যভূমিসহ পুরো বাংলাদেশের চার শতাধিক বধ্যভূমির নাম এবং যেখানে অবস্থিত সেই স্থানের নাম। আরও রাখা আছে ছয়টি বধ্যভূমির মাটি। যেই ছয়টি বধ্যভূমির মাটি রাখা আছে সেগুলো হলো –

ছবিঃ হাসান কবির

১। জয়পুরহাটের পাগলা দেওয়ান বধ্যভূমি

২। রাজশাহীর বাবলা বন বধ্যভূমি

৩।বড়ইতলা বধ্যভূমি

৪। চট্টগ্রামের ফয়েস লেক বধ্যভূমি

৫। খুলনার চুকনগর বধ্যভূমি

৬। সিলেটের আদিত্যপুর

জল্লাদখানা বধ্যভূমির পূর্বপাশে রয়েছে টেরাকোটা ইট ও লোহার সমন্বয়ে তৈরি একটি ভাস্কর্য,যার নাম ‘জীবন অবিনশ্বর’। এর শিল্পী রফিকুন নবী ও মুনিরুজ্জামান। ২০০৭ সালের ২১ জুন এই স্থাপনাটির দ্বার উন্মোচন করা হয়। যে স্থান থেকে শহীদদের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, সে স্থানে একটি স্বচ্ছ কাঁচের ওপর লাল অক্ষরে লেখা রয়েছে,

“মাথা নত করে শ্রদ্ধা জানাই সকল শহীদদের প্রতি”

জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে একপাশে রয়েছে একটি কক্ষ, যেখান থেকে বহু মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কক্ষে প্রবেশের সময় চোখে পড়ে একটি ঘন্টা,যা শহীদদের অন্তরাত্মাকে জাগানোর জন্য বাজানো হয়। কক্ষের ভেতরে রয়েছে জল্লাদখানা বধ্যভূমি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য। এছাড়া জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে শহীদদের মৃতদেহের সাথে তাদের যেসব ব্যবহার্য জিনিস পাওয়া গেছে, তারও কিছু নিদর্শন আছে। এই বধ্যভূমিতে আছে আরও একটি স্থাপনা,যার ওপর রয়েছে বাংলাদেশের পতাকা। স্থাপনাটি উপরে ৪০ ফুট এবং মাটির নিচে ৪০ ফুট। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে নতুন প্রজন্মের বাঙালীকে, যাদের চাইলেই কেউ উপড়ে ফেলতে পারবে না, যাদের শিকড় অনেক গভীরে।

জল্লাদখানা বধ্যভূমি নিয়ে কথা হলো সেখানকার ইনচার্জ কে এম নাসিরুদ্দীনের সঙ্গে। তিনি জানালেন প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে বধ্যভূমিটি। স্কুল-কলেজ পর্যায়ের ছেলে-মেয়ের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ছড়িয়ে দিতে তারা কীভাবে কাজ করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আশেপাশের প্রতিটা স্কুলেই আমি চিঠি পাঠিয়েছি যাতে তারা তাদের স্কুলের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে এ বধ্যভূমিতে আসেন। প্রতি শনিবার বিকাল ৪ টা থেকে ৬ টা পর্যন্ত আমরা বিভিন্ন স্কুল-কলেজের থেকে এখানে আসার জন্য সময় নির্ধারণ করে রেখেছি। এখান থেকে বাসে করে আমরা শিক্ষার্থীদেরকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও রেখেছি। তবে বেশিরভাগ স্কুল-কলেজ আমাদের ডাকে সাড়া দেয়নি। তারা তাদের শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে এই বধ্যভূমিতে আসেনি”। জল্লাদখানা বধ্যভূমির রক্ষীর সঙ্গে কতজন প্রতিদিন এখানে আসে সে বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন, “প্রতিদিন প্রায় ১০০-১২০ জন তো আসেই।”

পুরো বাংলাদেশে প্রায় নয় শতাধিক এরকম বধ্যভূমি রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং পাকিস্থানী বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের নির্মমতা সম্পর্কে একটু হলেও জানা যায় এই বধ্যভূমিগুলোতে গেলে।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।