প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » পর্দার চেয়ে সম্মান প্রদর্শন বেশি জরুরী

পর্দার চেয়ে সম্মান প্রদর্শন বেশি জরুরী

প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৬৬:১৩:০১ অপরাহ্ন

সাদিয়া আখতার । বাংলা ইনিশিয়েটর, ঢাকা

“পর্দা প্রথা মানলেই কি নারী নির্যাতনের অবসান হবে?” যদি তাই হতো তাহলে “বোরকা পরা মেয়ে পাগল করেছে” এরকম কুরুচিপুর্ণ গানের সৃষ্টি হতো না। সৃষ্টি হতো না “তনু হত্যা”এর মতো জঘন্যতম অপরাধগুলো ।২৬শে ডিসেম্বর বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাবো বলে বেড়িয়েছিলাম। যাওয়ার সময় হঠাৎ গ্রামের একজন মুরুব্বি আমাকে দাঁড় করিয়ে বললো, “তোমার আব্বা না হুজুর? তুমি বুরকা পরো না কেন? বুরকা পরলে আপদ বিপদ থেইক্কা বাইচ্চা চলতে পারবা। নাইলে এহনকার সময়ে মাইয়া মাইনষের কত বিপদ ই না হয়! বুরকা পরলে নিরাপদ থাকবা।”

আমি এর উত্তরে কি বলতে হয় তা খুজে না পেয়ে কিছু না বলেই চলে এসেছিলাম।

আমাদের সমাজের স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে একজন হুজুরের মেয়ে হয়ে বোরকা পরা আমার জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে দাড়িয়েছে। তবে বোরকা পরলেই কি সব বিপদ এড়ানো যায়? সেদিনই বাড়ি ফেরার পথে সিএনজিটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সুহিলপুর অঞ্চলে এসে দাঁড়ালো। সামনে অনেক মানুষের ভিড়। আর যাওয়া যাচ্ছে না। কৌতুহলের বশে নেমে দেখতে গেলাম কি হচ্ছে সেখানে। গিয়ে দেখলাম একটা ডোবায় এক কিশোরীর লাশ। পরিচয় অজ্ঞাত রাখার নির্দেশ দিয়ে কিশোরীর এক প্রতিবেশী কথা বলতে রাজি হলো। তার সাথে কথা বলে জানা গেল কিশোরী মাদরাসায় পড়তো। কিন্তু মাদরাসার ছাত্রী হলেও গ্রামের কিছু বখাটে ছেলে তাকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করতো। বোরকা পরে, হাতে পায়ে মোজা পরেও কিশোরী তাদের চোখ এড়াতে পারে নি।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ২৫ শে ডিসেম্বর রাত থেকেই। সেদিন রাত থেকেই মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলনা। তার একদিন পর ২৬ শে ডিসেম্বর দুপুরে তাকে রাস্তার পাশের ডোবায় পাওয়া যায়। তবে কিশোরীর মৃত্যু কিভাবে হলো তা এখনো নিশ্চিত করে জানা যায়নি। তবে যদি এই কিশোরী বোরকা ছাড়া ঘরে বাইরে যাতায়াত করতো তখন সমাজের কিছু লোক তার বেপরোয়া চলাফেরার দিকে আঙুল তুলতো। আমার তখন মনে হচ্ছিল সেই মুরুব্বির কথাগুলো। “বোরকা পরলেই সব বিপদ আপদ থেকে মুক্তি।” আসলে সমস্যাটা আমাদের সমাজের গোড়ায়, কিছু মানুষের মন মানসিকতায়। যে পশু ৪ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করতে পারে তার কাছে বোরকা পড়া মেয়েও রেহাই পাবে এ কথা বিশ্বাস করার চেয়ে সিন্দাবাদের কাল্পনিক গল্পে বিশ্বাস করা অধিকতর সহজ।

সমাজে নারীদের উপর নির্যাতনের জন্য নারীদের দায়ী করা আমাদের এক প্রকার স্বভাবে পরিনত হয়ে গেছে কিন্তু আমরা কখনো এর পিছনের কারণগুলো ক্ষতিয়ে দেখি নি।বুঝতে চেষ্টা করি নি সেইসব মেয়েদের কষ্ট। মাছ দিয়ে শাক ঢাকা তো অনেক হলো। এবার বরং নারীর চলাফেরার স্বাধীনতায় বাধা না দিয়ে তার উপর সহিংসতা বন্ধের কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হোক। তাহলেই সমাজের এসব অরাজগতা বন্ধ হবে। ধ্বংস সেইসব পশু যারা মানুষের রুপ ধরে পশুর চেয়েও জঘন্য কাজে লিপ্ত থাকে। নারীদেরকে আর কতো সহ্য করতে হবে এসব? এর ফলে কি জাতি হিসেবে আমরা অনেক উন্নত হচ্ছি ? তাহলে কেন নেওয়া হচ্ছে না প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ? ধিক্কার আমাদের জন্য যে আমরা নারীদের এখনো মর্যাদা দিতে শিখি নি। আমরা কি রেখে যাচ্ছি ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে ? কিছুই না। তাই ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে আমাদের ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আর হাতে কোনো অস্ত্র নেই।

নারীদের মর্যাদা দিতে পারাটাও একটা সম্মানের ব্যাপার, যা আমাদের অধিকাংশের মাঝেই নেই। কথার মারপ্যাচে ঠিকই ক্রমাগত অপমান করে যাচ্ছি তাদের । নিজেদেরকে “মানুষ” হিসেবে পরিচয় দেওয়ার আগে তাই একবার ভাবা দরকার আপনি কি পারছেন নারীদের প্রাপ্ত সম্মান দিতে ?? এই গুন যার মাঝে নেই তিনি দয়া করে মানুষের কাতারে নিজেকে ঠাঁই দিবেন না ।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ইনিশিয়েটর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ইনিশিয়েটর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।