প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » সম্পাদকীয় » শিক্ষা নাকি অক্ষরজ্ঞান ! কোনটা জরুরী?

শিক্ষা নাকি অক্ষরজ্ঞান ! কোনটা জরুরী?

প্রকাশ : ৫ জানুয়ারী ২০১৭৯:৫৬:১৮ অপরাহ্ন

[pfai pfaic=”fa fa-user ” pfaicolr=”” ] সবুজ শাহরিয়ার খান
সম্পাদক | বাংলা ইনিশিয়েটর

আচ্ছা শিক্ষিত মানুষ বলতে কাদের বোঝায়? যারা অনর্গল বাংলা ইংরেজি লিখতে পড়তে পারে তারাই কি শিক্ষিত? যারা বড় বড় অফিসে বসে কোটি কোটি টাকার ফাইল সই করে তারাই কি শিক্ষিত? নাহ!  আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের কখনোই শিক্ষিত বলব না । বরং আমি তাদের বলব অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন ।

অক্ষরজ্ঞান আর শিক্ষা কি এক জিনিস? নাহ, কখনোই না ।   লিখতে-পড়তে পারলেই সে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন কিন্তু শিক্ষিত নয়। আমাদের দেশের অফিস- আদালতগুলোর চেয়ারে যারা বসেন, তারা সবাই অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন হলেও শিক্ষিত নন। যার ফলে কাজে ব্যর্থতা ও অনিয়ম দেখা যায়।

সৃষ্টির সূচনালগ্নে তো কোন স্কুল/কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়  ছিলো না বা  শিক্ষা দেয়ার জন্য কোনো শিক্ষাগুরুও  ছিলেন না এমনকি তখন যারা সৃষ্টিশীল বা সৃজনশীল কাজে অবদান রেখে গেছেন, তাদেরও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট ছিলো না। কিন্তু  তারাই শিখিয়ে গেছেন মানুষকে। যার পরবর্তী রূপ আমাদের এই তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। তাদের কথাবার্তা, চলাফেরা, চিন্তা-চেতনাই আমাদের শিক্ষা। আমরা তাদের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজেদেরকে শিক্ষিত দাবি করি। আর তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিলো না বলে, আমরাই মূর্খের মতো তাদেরকে অশিক্ষিত বলি।

আমাদের সমাজে  শিক্ষিত বলতে সে সব ব্যক্তিদেরকে বোঝায় , যারা প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি দ্বারা নিজেদেরকে পূর্ণ করেছেন। যাদের  প্রতিষ্ঠানিক অক্ষর জ্ঞান বা বড় বড় সার্টিফিকেট  নেই , সাধারনত  আমরা তাদের  শিক্ষিত বলি না । কিন্তু এমন হওয়ার কথা ছিলো কখনো?

একজন কাঠমিস্ত্রী যখন সুকৌশলে কোন আসবাব বানায়, তখন তিনি ঐ ক্ষেত্রে শিক্ষিত। প্রত্যেক শ্রমজীবী মানুষ অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন না হলেও যদি সে তার কর্মক্ষেত্রে নৈপূণ্য দেখাতে পারে, তবে সে তার ক্ষেত্রে শিক্ষিত। শিক্ষা হচ্ছে এমন একটা মাধ্যম যা মানুষকে কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তিজীবনে সফল করে তোলে।

মানুষ প্রকৃতি থেকে নিজেকে সামাজিক জীব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে যে শিক্ষা অর্জন করে তা স্বশিক্ষা। এ শিক্ষা অর্জনের জন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নিতে হয় না। নিজের মন নিজেকে সাহায্য করে। সবুজ প্রকৃতি, বিশাল আকাশ, সুউচ্চ পাহাড়, কুলহীন সাগর, বয়ে চলা নদী, বহমান বায়ু শিক্ষক হিসেবে কাজ করে। আর সুশিক্ষা হলো স্বশিক্ষারই আরেকটা রূপ। যে পৃথিবীর সকল প্রতিবন্ধকতার মাঝেও নিজেকে ব্যক্তিত্ববান হিসেবে অটুট রাখতে পারে, যার নৈতিকতা অক্ষুন্ন থেকে তিনিই সুশিক্ষিত। সুশিক্ষাই পারে আমাদের মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করতে। সকল প্রকার অনিয়ম দূর করতে। একজন অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন মানুষ কাম, ক্রোধ, লোভকে জয় করতে না পারলেও একজন সুশিক্ষিত মানুষ এসবকে সহজেই জয় করতে পারে। পৃথিবীর বিখ্যাত মনিষীরা সবাই ছিলেন শিক্ষিত এবং সুশিক্ষিত।

আমাদের  বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কোন স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন নি । কিন্তু তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত  যার ফলে ব্রিটিশ সরকারের অসহনীয় নির্যাতন তাঁর বিদ্রোহকে দমন করতে পারেনি। এখানে আরো বলা যেতে পারে  আত্মতাত্ত্বিক দীক্ষক লালন সাঁইজির শিক্ষা। যিনি আমাদের প্রচলিত শিক্ষাকে ছাড়িয়ে গান রচনা করেছেন। নিজে নিজের দেহ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন অমিয় বাণী। এভাবে যারা প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষর জ্ঞান না নিয়েও আমাদেরকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন, তাঁরা কি শিক্ষিত নয়?

আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষা দান করা হচ্ছে । হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে , মা-বাবা লাখ-লাখ টাকা খরচ করছেন ছেলে মেয়েদের শিক্ষিত বানাতে। আসলে তারা সবাই অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন হচ্ছে শিক্ষিত হচ্ছে খুব কম সংখ্যায় এর খবর কেউ রাখছে না ।  কিন্তু এমন অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন  হয়ে কি লাভ যদি সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে  একজন ভালো মানুষ না হতে পারি?

ছোটবেলা থেকেই পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ  আমাদের উৎসাহ দেয় ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট কিংবা পুলিশ হতে। কিন্তু কেউ বলে না “বাবা সব কিছুর আগে একজন ভালো মানষ হও”।  স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তুমুল প্রতিযোগিতা চলে ভালো ফলাফল করার জন্য যাতে একটি ভালো চাকরি পাওয়া যায়। সমাজের মুরব্বিরা উপদেশ দেয় ‘যেভাবেই হোক, তোমাকে প্রতিষ্ঠিত হতেই হবে’। আর বিয়ে সহ সব কিছুতেই দেখা হয় ছেলে বা মেয়ে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বা কোন কোম্পানীতে চাকরী করে বা তাদের কত সম্পত্তি আছে । ফলাফল বছর বছর দেশ সেরা প্রতিষ্ঠান থেকে অক্ষরজ্ঞান নিয়ে হাজার হাজার ছেলে মেয়ে বের হচ্ছে, বড় বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরী করছে কিন্তু প্রকৃত  শিক্ষিত বা মূল্যবোধ সম্পন্ন ছেলে মেয়ে খুজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন ।

অক্ষরজ্ঞান মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যেতে পারে কিন্তু শিক্ষা মুছে না। আর যেটা মুছে যায় সেটা শিক্ষা নয়। একজন মানুষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হয়েও শিক্ষিত হতে পারে, যদি তার মনে শিক্ষার তৃষ্ণা থাকে। কেননা শিক্ষা দেয়া হয় না,ব অর্জন করে নিতে হয়। প্রকৃত পক্ষে সে ব্যক্তি শিক্ষিত যে নিজের এবং সমাজের জন্য কল্যাণকর।

লেখকঃ সামাজিক কর্মী ও কলাম লেখক

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।