প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » সম্পাদকীয় » শিক্ষা হোক যথাযথ, শিক্ষা হোক আনন্দময়

শিক্ষা হোক যথাযথ, শিক্ষা হোক আনন্দময়

খাতুনে জান্নাত

“আমার মেয়েটা পড়াশোনা একদমই করতে চায় না। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ঠিকমতোই পড়াশোনা করত। ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠে হঠাৎ কী হলো কে জানে, পড়াশোনা একদমই ছেড়ে দিল। এই কারণে ফলাফলও বেশ খারাপ করছে। বাংলা পড়তে চায় না, বিজ্ঞান পড়তে চায় না, শারীরিক শিক্ষা তো ধরতেই চায় না,” এরকম অভিযোগ করতে শুনলাম এক অভিভাবককে।

প্রাথমিক পড়াশোনা অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার পর মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনায় শিশুদের কিছুটা অসুবিধা হয়। হঠাৎ করে সৃজনশীল পদ্ধতিটা অনেকেই ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা। তাই প্রথম প্রথম খারাপ ফলাফল হওয়া স্বাভাবিক। এ বিষয়ে তাদের প্রয়োজন শিক্ষকের সাহায্য। কারণ, শুধুমাত্র শিক্ষকই পারেন মাধ্যমিক পর্যায়ের সাদা-কালো বইকে তার শিক্ষার্থীদের সামনে রঙ্গিন করে তুলতে। শুধুমাত্র শিক্ষকের সাহায্যেই সদ্য প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা একটি শিশু মাধ্যমিক পর্যায়েও তার পড়াশোনার আগ্রহ ধরে রাখতে পারে।

তবে আমাদের দেশে এ ব্যাপারটাতে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় না। ষষ্ঠ শ্রেণি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়। প্রাথমিক ধাপ পার হয়ে এসে এই সময়ে অনেক শিক্ষার্থীরই মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়। বিজ্ঞানে, সমাজে, বাংলায় যোগ হয় নতুন ধরণের অধ্যায়। আবার বলা হয় সৃজনশীলে লিখতে হবে সবকিছু। চোখের সামনেই দেখেছি, অনেক শিক্ষার্থীই মনে করে বেশ বড় করে একটা রচনা লিখে দিলে বোধহয় সেটাতে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে। অর্থাৎ সৃজনশীল সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা খুব কম। যা আছে তা খুবই ঝাপসা ধারণা। তারা বুঝতেই পারেনা সৃজনশীল কীভাবে লিখতে হবে। আর সে’কারণেই তারা শরণাপন্ন হচ্ছে বিভিন্ন গাইড বইয়ের। খুব অবাক হয়ে আমি লক্ষ্য করেছি, রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই এসব গাইড বই থেকে প্রশ্ন তৈরি করে। তই ভালো নম্বর পাওয়ার আশায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সেইসব গাইড বইয়ের বিভিন্ন প্রশ্ন মুখস্ত করে।

যদি সেই কষ্টকর মুখস্ত পদ্ধতিতেই এখনো পড়াশোনা চলছে, তবে কী লাভ হলো হঠাৎ করে পুরো দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পাল্টে দিয়ে? এরকম হলে আমি বলব তখনই বরং ব্যাপারটা ভালো ছিল। শিক্ষকেরাও জানতো আমাদের পড়াশোনা মুখস্ত নির্ভর, আর শিক্ষার্থীরাও জানতো। কিন্তু এখনও একই ব্যাপার হওয়া সত্ত্বেও সবাই মুখে মুখে বলছে, ‘সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি’। আমাদের দেশের শিশু-কিশোরেরা ভাবছে এই সৃজনশীলটা বুঝি এতটাই ভয়ংকর। মুখস্তের মতো অমানবিক পীড়ার মধ্য দিয়ে তাদের এখনো যেতে হয়। অথচ তারা ঠিকমতো জানতেও পারছে না সৃজনশীল কত সুন্দর একটা পদ্ধতি। আমরা কী তাহলে তাদের ঠকাচ্ছি? কাদের ঠকাচ্ছি? ভবিষ্যতে যারা এদেশের নেতৃত্ব দেবে,তাদের?

ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে যুক্ত হওয়া শারীরিক শিক্ষা বইয়ে আছে অনেক খেলার বর্ণনা। অথচ সেটা শুধু বইয়েই সীমাবদ্ধ। অনেক শিক্ষার্থী, বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীদের শুধু মুখস্ত করানো হয় বিষয়গুলো। ব্যবহারিকভাবে তাদের দেখানো হয় না। ব্যাডমিন্টন,  ফুটবল, ক্রিকেট, হকি,বাস্কেটবল ইত্যাদি খেলার মাঠের দৈর্ঘ্য কত, বলের ওজন কত, কতজন খেলে সব তথ্য একদম ঝাড়া মুখস্ত করিয়ে ফেলানো হয় তাদের। অথচ তাদেরকে এই ঝাড়া মুখস্ত করা খেলাগুলোর একটির কোর্ট যদি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, এখানে কোন খেলা হয়, তাহলে সে বলতে পারছে না। কারণ, সে তো কোনদিন খেলেই নি খেলাটা!

এ কারণেই কী বইটা দেয়া হয়েছে? বইটা দেয়া হয়েছে বিভিন্ন খেলার সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য। সেই খেলাগুলোর সাথে শিক্ষার্থীরা পরিচিত তো হতেই পারছে না অথচ ঝাড়া মুখস্ত করে চলেছে। এই শিক্ষা তার জীবনে কোন ক্ষেত্রে কাজে লাগবে তার উত্তর কী কারো জানা আছে?

এভাবে না বুঝে মুখস্ত করার মতো কষ্ট পৃথিবীতে বোধহয় আর কোনকিছুতেই নেই। তারা এমন কোন অপরাধ করেনি যে না বুঝে মুখস্তের মতো একটা কঠিন শাস্তি তাদের দিতে হবে। শিশু-কিশোরদের রঙিন পৃথিবীটাকে এভাবে আমরা ধ্বংস করে দিতে পারিনা। সে অধিকার আমাদের নেই। শিক্ষা হোক যথাযথ;তারা সব পড়ুক, কিন্তু বুঝে বুঝে পড়ুক। ব্যবহারিকভাবে তাদের সকল কিছু দেখানো হোক। শারীরিক শিক্ষার প্রত্যেকটা খেলা তারা শিখুক মাঠে গিয়ে। বিজ্ঞানের প্রতিটা পরীক্ষা তারা করুক ল্যাবরেটরিতে। তাহলেই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সফল হবে। শিক্ষা শিক্ষার্থীদের কাছে হয়ে উঠবে আনন্দময়।

লেখকঃ ক্ষুদে সাংবাদিক, পরিবেশ কর্মী ও শিক্ষার্থী

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ইনিশিয়েটর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ইনিশিয়েটর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।