প্রচ্ছদ » আমাদের সাহিত্য » গল্প ও প্রবন্ধ » আমার ছেলেবেলা ও কিছু বৈষম্যের উপাখ্যান

আমার ছেলেবেলা ও কিছু বৈষম্যের উপাখ্যান

  নুহিয়াতুল ইসলাম লাবিব, বাংলা ইনিশিয়েটর, ঢাকা

ইব্রাহীম শেখ সমাজে ভীষণ সম্মানি একজন ব্যক্তি। গ্রামের সবাই তাকে খুব শ্রদ্ধা-ভক্তি করে। আমার বাবার কথা বলছিলাম, গ্রামের চেয়ারম্যানদের মতো গ্রামে উনার  প্রতাপটা একটু বেশিই বটে। কিন্তু দুজন কন্যা সন্তান নিয়ে বেশ মুশকিলেই ছিলেন।  ছেলে সন্তান না হলে যে একেবারেই সমাজে মুখ দেখানো যায় না। তাই বড় দু বোনের পর যখন আমি জন্ম নিলাম বাবা-মা আমাকে দেখে অসম্ভব খুশি হয়েছিলেন আর হবেই বা না কেন পুত্রসন্তান ছাড়া কে দেখবে বাবার এই অঢেল সম্পত্তি?  বাবার এই বিপুল আনন্দের বহিঃপ্রকাশ স্বরুপ তাই গ্রামের সবার জন্য দু দিন ব্যাপি বিশাল খাবারের আয়োজন করেছিলেন।

আমার জন্মের সপ্তম দিন আবার বিশাল দুটি গরু জবাই করে আকীকা করে আমার নাম রাখেন “জয় শেখ”। জন্মের পর থেকে বাবা  মায়ের ভালোবাসায় বেশ সিক্ত ছিলাম আমি। ছেলে হবার কারণে বাড়তি সুবিধা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিত আমি একজন “ছেলে”। তাই বড় দু বোনের যেসকল কাজ করবার জন্য হাজারো অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল আমার ক্ষেত্রে তা একেবারেই প্রযোজ্য ছিলনা। মীনা কার্টুনের মতো দিন শেষে তাই রাজুর মতো পুরো ডিমটাই যে বোনদের ভাগ্যে না যেয়ে আমার পাত্রে অবস্থান করতো তা আর আলাদা করে বলা কি দরকার।

ছোটবেলা থেকে খেলাধুলাও ভিন্ন ছিল আমার। বোনরা যখন পুতুল খেলা নিয়ে ব্যস্ত তখন আমার মাঠে ব্যাট-বল নিয়ে দৌড়াতে হতো। তবে মাঝে মাঝে ঠিকই ইচ্ছে করতো আপুদের সুন্দর সুন্দর পুতুলগুলো নিয়ে খেলা করি। কিন্তু আমি যে ছেলে। একটা ছেলে যে পুতুল দিয়ে কখনোই খেলতে পারে না তা আমার বাবা মা আমার মাঝে বেশ ভালো করেই পুড়ে দিয়েছিল। আস্তে আস্তে আমিও তা মানিয়ে নিতে শিখে নিয়েছিলাম।
আমার বয়স যখন সাত বছরে পূর্ণ হলো আমাকে বাবা গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিলেন। যে স্কুলে ভর্তি হলাম সেখানে ছেলে মেয়ে একসাথে পড়ালেখা করতো। আমাদের ক্লাসের মেয়েগুলো ছেলেদের থেকে অনেক বেশিই মেধাবী ছিল। তাই প্রতিবার বছর শেষে ফলাফলের দিন দেখা যেত পুষ্প নামের মেয়েটি আমার থেকে ১০০ নাম্বার বেশি পেয়ে ফার্স্ট হতো আর আমি হতাম সেকেন্ড। ফলাফল হাতে পেয়ে তাই প্রতি বছরই আমার বাসায় যাওয়াটা ঠিক হবে কি না তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হতো। সেকেন্ড হয়েছি শুনলে বাবা যে আমাকে কাচা খেয়ে ফেলবেন তা ভেবে নদীর পাড়ে প্রায়ই বসে সময় কাটিয়ে দিতে হতো। সেকেন্ড হয়েছি তা আমার ছিল প্রথম অপরাধ আর দ্বিতীয় অপরাধ ছিল আমি একটি মেয়ের কাছে হেরে গিয়েছি। এটা যে নিতান্তই লজ্জার ব্যাপার ছিল বাবা মায়ের কাছে। মেয়েদের কাছে এভাবে হেরে যাওয়া যে একেবারেই কাপুরুষের লক্ষণ। এ ভেবে মাঝে মধ্যে আমার নিজেরই নিজের প্রতি ক্ষোভ জন্ম নিত। তবে বেশিরভাগ সময় নিজে ব্যাপারগুলো বুঝতে না পারলেও পরিবার, সমাজ আমাকে চোখে আঙ্গুল দেখিয়ে তা বুঝিয়ে দিত।

অষ্টম শ্রেনিতে পড়া শেষ করে গ্রামের এক সরকারি স্কুলে বাবা আমাকে ভর্তি করে দিল। তবে সরকারি এই স্কুলে আর ছেলেমেয়েদের একসাথে পড়ালেখা হয় না । এ কথা যেদিন প্রথম জানতে পেরেছিলাম সেদিন বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত ভালো লাগা সৃষ্টি হয়েছিল। নবম শ্রেনীতে নতুন ভর্তি হওয়াতে একেবারে শেষ শাখায় ভর্তি হতে হয়েছিল আমাকে। নবম শ্রেনিতে ছেলেদের সংখ্যাই এখানে পনেরশো এর কাছাকাছি।  নবম শ্রেনি থেকে যখন দশম শ্রেনিতে উত্তীর্ণ হলাম আমার রোল হলো তিন। পনেরো শত ছেলের মাঝে তৃতীয় হয়ে মোটামোটি নিশ্চিত ছিলাম আজ বাড়িতে গেলে বাবা আর কোনোভাবেই রাগ হতে পারবে না। তাই বাড়িতে গিয়ে সবার আগে বাবাকেই ফলাফল দেখালাম। কিন্তু ফলাফল দেখে এবারো বাবা মা খুশি নন। তাদের খুশি না হবার কারণটা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না আমি । এখানে তো নিশ্চিতভাবে কোনো মেয়ে ফার্স্ট হয় নি। কিন্তু একটু পর বুঝতে পারলাম এখানে কোনো মেয়ে না থাকলে কি হবে যে ছেলে ফার্স্ট হয়েছে সে তো আমার বন্ধু সংকর আর দ্বিতীয় হয়েছে চয়ন দেবনাথ। দুজনই হিন্দু ধর্মালম্বী। দুটি হিন্দু ছেলেকে টেক্কা দিতে পারলাম না কেন তা দেখেই তারা ভীষন রাগান্বিত। হঠাৎ করে নিজের উপর ধীরে ধীরে রাগ হতে লাগলো। ছোটবেলা থেকে শিখে এসেছি লাল পিঁপড়া কামড় দেয় দেখে তারা হিন্দু পিঁপড়া। আর হিন্দুরা সবসময়ই খারাপ । আর এই খারাপদের কাছে আমি হেরে গেলাম???

আমার ছোটবেলা খেলাধুলায় মাতামাতি থাকার পাশাপাশি অনেক অদ্ভুত কিছু শিখতে শিখতে বড় হয়েছি। মেয়েরা যেন কোনোভাবেই আমার থেকে কোনোকিছুতে বড় হতে না পারে, অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রনে কিভাবে রাখা যায় তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে ছোটবেলা কেটে গেছে।

আমার বয়স এখন পঁয়ত্রিশে পৌঁছেছে। ইতিমধ্যেই দুটি কন্যাসন্তানের জন্মদাতা আমি। কিন্তু আমার বাবার মতো পুত্রসন্তানের আশা আমার মাঝে ভর করছে না। কাজ শেষে বাসায় আসার পর আমার দু মেয়ে যখন বাবা বলে আমাকে জড়িয়ে ধরে তখন মনে হয় পৃথীবীর সমস্ত সুখ আমার বুকে এসে জমা হয়। আমি ওদেরকে নিজেদের মতো করে বড় হতে দিতে চাচ্ছি। পুতুল খেলবে না মাঠে একের পর এক ছয় মারবে তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। কেন আমি ওদের মাঝে খেলা ভাগ করে দেব?

বাংলাদেশের ছেলেরা ফুটবল খেলায় যখন একের পর এক গোল খেয়ে মৃত প্রায় ঠিক একই সময়ে আমাদের মহিলা ফুটবল টিম যখন প্রতিপক্ষকে গোল বন্যায় ভাসিয়ে দিয়ে একের পর এক জয় ছিনিয়ে আনছে তখন আমার খেলা ভাগ করে দেওয়া নিতান্তই অযৌক্তিক। তাই ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে আমার মেয়েরা যখন মাঠে খেলতে যায় দেখে আমার বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। আমার ছেলেবেলা কেটেছে বৃথাই চিন্তা করতে করতে তাই শৈশব কৈশোরে নিজেকে উপভোগ করা আর শিখতে পারি নি। তাই ওদের কপালে আমার মতো দুশ্চিন্তার ভাজ ফেলতে চাই নে । ওদের ছেলেবেলা হোক ওদের মতো। তাহলে হয়তো আমার মতো আক্ষেপ নিয়ে ওদের আর কয়েক পাতা ছেলেবেলা নিয়ে লিখতে হবে না।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।