প্রচ্ছদ » বাংলাদেশ » মিরপুর মুক্ত দিবসে বাংলা ইনিশিয়েটরের ‘ইতিহাসের জলসা’

মিরপুর মুক্ত দিবসে বাংলা ইনিশিয়েটরের ‘ইতিহাসের জলসা’

 খাতুনে জান্নাত | বাংলা ইনিশিয়েটর | ঢাকা

জল্লাদখানায় মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালাচ্ছেন বাংলা ইনিশিয়েটরের সম্পাদক সবুজ শাহরিয়ার খান।

বিকাল থেকেই জল্লাদখানা বধ্যভুমিতে একে একে আসতে শুরু করেছে বাংলা ইনিশিয়েটরের শিশু-কিশর বন্ধুরা। বিকেল ৫ টার মধ্য জল্লাদখানা বধ্যভুমি ভরে উঠলো ইনিশিয়েটরদের পদচারনায়। হঠাৎ সবুজ ভাইয়ার একটি নির্দেশনা এবং মুহুর্তের মধ্যেই সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠলো । কেউ মোমবাতি এনে দিচ্ছে আর কেউ সেটা ভাইয়ার দেখানো মত জায়গায় লাগিয়ে রাখছে। কেউ জল্লাদখানার ছোট্ট মাঠে কার্পেট বিছানোর কাজ করছে। একেকজন একেকটা কাজে ব্যস্ত। কিন্তু কিসের এত কাজ? হ্যা ৩১ জানুয়ারী  মিরপুর মুক্ত দিবস উপলক্ষ্য বাংলা ইনিশিয়েটর আবারও আয়োজন করেছে ‘ইতিহাসের জলসা’র।

জলসা শুরু হয় সন্ধ্যা ৬ টায়। জলসায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জল্লাদখানা বদ্ধভূমির ইনচার্জ কে এম নাসিরুদ্দীন, শহীদ পরিবারের সদস্য আবদুল হালিম, ফরিদুজ্জামান, আনসার আলী এবং বাংলার  ইতিহাসের শেষ রণাঙ্গনের সর্বশেষ  মুক্তিযোদ্ধা মোখলেছুর রহমান।

প্রথমেই মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে শুরু হয় জলসার আনুষ্ঠানিকতা। বীর মুক্তিযোদ্ধা মোখলেছুর রহমান প্রথমেই একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে শুরু করেন এই পর্ব। তিনি মোমবাতি জ্বালানোর সাথে সাথেই আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে সবাই  বলে ওঠে, “জয় বাংলা”। এরপর একে একে প্রায় শতাধিক মোমবাতি জ্বালায় ইনিশিয়েটরের বন্ধুরা। যার আলোতে আলোকিত হয়ে উঠে পুরো জল্লাদখানা।

মোমবাতি প্রজ্জ্বলন পর্ব শেষ হলে সবাই মিলে শুরু করে জাতীয় সংগীত।

“আমার সোনার বাংলা

আমি তোমায় ভালোবাসি

চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস

আমার প্রানে বাজায় বাঁশী”

ধ্বনিতে মুখোরিত হয় পুরো জল্লাদখানা বদ্ধভূমির পরিবেশ। জাতীয় সংগীত শেষ হলে সকলে মিলে স্যালুট জানায় মুক্তিযোদ্ধা মোখলেসুর রহমানকে, বাংলাদেশ সৃষ্টির অন্যতম এক কারিগরকে।

এরপর শুরু হয় জলসার মূল পর্ব। জল্লাদখানা বধ্যভূমির ইনচার্জ কে এম নাসিরুদ্দীন প্রথমেই মুক্তিযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বলে এই পর্ব শুরু করেন। এরপর শহীদ পরিবারের সদস্য আবদুল হালিম বলেন তার বাবার শহীদ হওয়ার বিষাদময় স্মৃতি। তার বাবা শহীদ আবদুল হাকিমকে হত্যা করে এই জল্লাদখানা বধ্যভূমিতেই ফেলা হয়।

১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ এর সংক্ষিপ্ত বর্ননা করছেন জল্লাদখানা বধ্যভুমি’র ইনচার্জ জনাব কে এম নাসিরুদ্দীন। চেয়ারে বসে আছেন (বাঁ থেকে) বীর মুক্তিযোদ্ধা মোখলেছুর রহমান, শহীদ সন্তান আবদুল হালিম

এরপর শহীদ পরিবারের আরেক সদস্য ফরিদুজ্জামান বর্ণনা করেন তার বাবা আকতার আলীকে হত্যার নিষ্ঠুরতম স্মৃতি। যুদ্ধের সময় তার বাবার মৃত্যু হয়নি, তার বাবার মৃত্যু হয়েছে স্বাধীন দেশে, এই মিরপুরে। যা তখনও ছিল পরাধীন। তার মা-ও সেসময় আহত হয়েছিল।

সবশেষে কথা বলেন ৭৫ বছর  বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোখলেসুর রহমান। তিনি মুক্তিযুদ্ধের একদম শুরু থেকেই অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং যুদ্ধের ময়দানে ছিলেন সবার শেষ পর্যন্ত । সেই ২৩ শে মার্চ ১৯৭১ থেকে শুরু হয় তার যুদ্ধ যে যুদ্ধের শেষ হয় ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারী।  যুদ্ধের আগের এবং যুদ্ধের সময়কার-বিভিন্ন ঘটনা, স্মৃতি ইত্যাদি সকলকে বলেন তিনি। প্রত্যেকটি ঘটনার তারিখ উল্লেখ করে দেন তিনি। কিছু ঘটনা ছিল আনন্দের; আর কিছু ঘটনা ছিল বেদনার, যা শুনে ভারী হয়ে আসছিল পরিবেশ। সবশেষে তিনি বলেন মিরপুরের কথা। সারাদেশ যখন স্বাধীন, মিরপুর তখনও পরাধীন। এরমধ্যে অবস্থান করছিল কিছু পাঞ্জাবী সৈন্য এবং বিহারিরা। তারা প্রায় দেড়মাস ধরে চালায় আরেক নির্মম হত্যাকান্ড। যার সাক্ষী হয়ে আছে মুসলিম বাজার বধ্যভূমি, জল্লাদখানা বধ্যভূমির মতো মোট ২৩ টি বধ্যভুমি। মোখলেসুর রহমান বলেন, সারাদেশের সকল অস্ত্র সংগ্রহ শেষ হওয়ার পরও তারা ৩১ জানুয়ারী শুধুমাত্র মিরপুর থেকেই ১৭ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার করেন। যা থেকেই বোঝা যায় কী ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চলছিল মিরপুরে।

এরপর বাংলা ইনিশিয়েটরের কিশোর-তরুণেরা মোখলেসুর রহমানকে  প্রশ্ন করেন। সকল প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। সবশেষে বাংলা ইনিশিয়েটরের পক্ষ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ারেন্ট অফিসার (অব) মোখলেছুর রহমানকে ইনিশিয়েটর ব্যাজ পরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে  শেষ হয় বাংলা ইনিশিয়েটরের এবারের ইতিহাসের জলসা।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।