প্রচ্ছদ » অনিয়ম » ডাষ্টবিনগুলো গেল কোথায়?

ডাষ্টবিনগুলো গেল কোথায়?

খাতুনে জান্নাত | বাংলা ইনিশিয়েটর | ঢাকা

রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে চুরি হয়ে যাচ্ছে ডাস্টবিন। ছবিটি গতকাল রাজধানীর ফার্মগেট এবং মিরপুর থেকে তোলা।

গতবছরের মাঝামাঝি সময় পুরো রাজধানী জুড়ে শুরু হয়েছিল এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে পুরো নগরীতে প্রায় দশ হাজার ডাস্টবিন বসানোর কাজ শুরু হয়েছিল। এক মাসের মধ্যেই পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে ঢাকা শহরের প্রতিটি রাস্তায় খানিক দূরত্ব বজায় রেখেই বসানো হয়ে গেল ডাষ্টবিন।  রাস্তায় দাঁড়ালেই চোখে পড়ে সারি সারি ডাষ্টবিনের এই চিত্র। তখন মনে হয়েছিল আমরাও বুঝি এখন উন্নত দেশের মতো হয়ে যাব, আমাদের রাস্তাগুলোও থাকবে ঝকঝকে। “কোথায় ফেলব?” এমন অজুহাতে কেউ আর রাস্তায় কোন ময়লা ফেলবে না। কিন্তু বছর না ঘুরতেই এক বিচিত্র ঘটনা শুরু হলো এই ডাষ্টবিনগুলোকে ঘিরে। রাস্তার ডাষ্টবিনগুলো উধাও হয়ে যাওয়া শুরু করল। কিন্তু কোথায় যায় এই ডাষ্টবিন?

ডাষ্টবিনের তো আর হাত-পা নেই যে সে একা একা হেঁটে হেঁটে কোথাও লুকিয়ে পড়বে। তাই নিশ্চিতভাবেই বলে দেয়া যায় এটি কোন মানুষের কাজ। কিন্তু কোন মানুষ কেন এই ডাষ্টবিনগুলোকে সরাবে? কী লাভ তাদের এই ডাষ্টবিনগুলোকে নিয়ে?

এ ব্যাপারে রাজধানীর মিরপুর এবং ফার্মগেট এলাকার কয়েকজন অধিবাসীর সঙ্গে কথা হলো। তাদের মতে, ডাষ্টবিনগুলো চুরি হয়। “কে? আর কেনই বা এতকিছু থাকতে এই ডাষ্টবিন?” এমন প্রশ্নের জবাবে অনেকেই বলেছে মাদক গ্রহণকারীরা যখন মাদকদ্রব্য কেনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে পারেনা, তখন তারা মরিয়া হয়ে অর্থ সংগ্রহের উপায় খোঁজে। তাদের অনেকেই সেই উপায় হিসেবে বেছে নেয় চুরি, ছিনতাই। আবার অনেকেই এই ডাষ্টবিনগুলো তুলে নিয়ে বিক্রি করে দেয়।

রাজধানীর ভিনিন্ন স্থানে এমন পোড়ানো ডাস্টবিন দেখা যায়। ছবিটি গতকাল মিরপুর থেকে তোলা।

পাঠক একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, বাংলাদেশের যেকোন বড় সমস্যার পেছনের কারণগুলো প্রায় সময়ই একই হয়। যেমন এখানেও কারণ হিসেবে পাওয়া গেল মাদকদ্রব্যকে। অনেকের মতেই এর জন্যই হচ্ছে এ ধরণের চুরির ঘটনা।

শুধু যে ডাষ্টবিন চুরির ঘটনা ঘটছে তা নয়। যেসব ডাষ্টবিন আছে সেগুলোর অনেকগুলোরই প্রায় ভগ্নদশা। কিছু কিছু জায়গায় দেখা গেল পোড়ানো ডাস্তবিন। রাজধানীর কাফরুল থানার পাশেই অন্তত ৬ টি পোড়ানো ডাস্টবিন এর দেখা মিলল। কে বাঁ কারা এ কাজ করেছে এবং কেন করেছে তা জানেনা কেউ। কাফরুল থানার গেটের দারোয়ান নিজেও জানেনা কখন এ কাজ হয়েছে।

আবার অনেক জায়গায়ই দেখা যায় ডাষ্টবিনের ঠিক পাশের রাস্তাতেই প্রচুর ময়লা ফেলা, কিন্তু ডাষ্টবিন একদম খালি। যেন রাস্তাটাকে ডাষ্টবিন বানিয়ে ময়লা ফেলার কথা বলা হয়েছে, আর ডাষ্টবিনগুলোকে পরিষ্কার করে সাজিয়ে রাখার জন্য দেয়া হয়েছে।

ডাষ্টবিন থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন রাস্তায় ময়লা ফেলছি? রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশ করলে সত্যিই আর মনে হয়না যে বাংলাদেশে আছি। রাস্তায় একটা ময়লা খুঁজে পাওয়া যাবেনা সেখানে। শুধু না ময়লা ফেলার নিয়ম নয়, সেখানকার সকল নিয়মই মানুষ মেনে চলে। কিন্তু কেন? একই দেশের নাগরিক হয়ে একদল লোক নিয়ম মানবে আর অন্যদল মানবে না-তা কেমন করে হয়?  শুধুই কি ক্যান্টনমেন্ট এলাকার কড়া নিয়ম-কানুনই এর জন্য দায়ী?  তাই বলেই হয়তো দেখা যায় ক্যান্টনমেন্ট এলাকার লোকজন অন্য এলাকায় গিয়ে ইচ্ছামতো ময়লা ফেললেও নিজের এলাকায় কখনোই তা করেনা। তা অবশ্যই কড়া নিয়মের ভয়ে। যদি ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় এতো কড়া নিয়ম-কানুন না থাকতো, তাহলে এর অবস্থাও অন্যসব এলাকার মতো হয়ে যেত-এটা বোঝার জন্য বুদ্ধিজীবী হতে হয়না।

মানুষ রাস্তায় ময়লা ফেলেই চলেছে। চিপসের প্যাকেট, কাগজ, লিফলেট-কী ফেলছে না? এরকম চলতে থাকলে বাংলাদেশ একদিন বিশাল এক ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হবে। এই ময়লা ফেলার পেছনে বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই কিছু সাধারণ মনোভাব কাজ করে। যেমনঃ

১.”সবাই ফেলছে, আমি না ফেললে তো আর খুব বেশি কিছু হবে না!”

২.”এই ময়লাগুলো যায় কোথায়? নিশ্চয়ই কোথাও গিয়ে জমা করে ফেলবে। তো একই তো ব্যাপার হবে। আমি বরং এখানেই ফেলি।”

৩.আগামীকালকেই তো রাস্তা ঝাড়ু দেবে। আজকে একটু ময়লা ফেললে কিছুই হবেনা।”

আবার অনেকেই এরকম কিছু না ভেবেই রাস্তায় ময়লা ফেলে দেয়। যেন রাস্তাটাই ময়লা ফেলার জায়গা। ছোটবেলা থেকে আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েদের কখনো নৈতিক শিক্ষার সাথে শেখানো হয় না যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলার কথা। যার ফল এই প্রজন্ম। প্রতিদিন পুরো শহর ঝাড়ু দেয়া হয়-এত বিশাল কর্মযজ্ঞ এ পৃথিবীর আর কোথাও হয় বলে আমার জানা নেই শুধু বাংলাদেশে এত বিশাল কর্মযজ্ঞটি হয়। তাহলে তো বাংলাদেশের আরও বেশি পরিছন্ন থাকার কথা। তাও কেন থাকতে পারছে না? কারণ ঝাড়ু দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার ময়লা ফেলার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। আবার যদি কেউ ডাষ্টবিনে ময়লা ফেলে বসে, তবে তার দিকে লোকজন এমন চোখে তাকায় যেন সে একটা পাগল!

রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে এভাবেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে আবর্জনার স্তুপ। ছবিটি গতকাল মিরপুর ১৩ নাম্বার ওভার ব্রিজের নিচ থেকে তোলা।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাচ্ছে না। আমরা মনে করছি আমি একা বদলালেই তো আর হবেনা, সবাইকে বদলাতে হবে। এটা ভেবে আমরা কেউই বদলাচ্ছি না। আমরা সবাই মিলে যদি ভাবতাম আমি আগে নিজে বদলাই, পরে অন্যের চিন্তা করা যাবে-তাহলেই আর এ ধরণের সমস্যার সৃষ্টি হতো না। নিজের কাজটুকু আমাদের আগে করতে হবে। আমি আগে ডাষ্টবিনে ময়লা ফেললে আমার দেখাদেখি আরও দুজন ফেলবে। তাদের দেখাদেখি আরও চারজন। এভাবেই বদলাবে পুরো দেশ। শুধু একটু কষ্ট করে নিজেকে বদলাতে হবে

এত বদ্ধ কেন আমাদের চিন্তা-ভাবনা? একটু ছাড়ি না চিন্তাগুলোকে, আর কতদিন আটকে রাখব খাঁচায়? তারাও একটু উড়ুক স্বাধীন পায়রার মতো, বুঝতে শিখুক কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ। তবেই না একদিন আরও অনেক বেশি গর্ব নিয়ে বলতে পারব, “আমি বাঙালী। আমরা সব দিক থেকে এগিয়ে।”

দিনশেষে ‘ডাষ্টবিনগুলো কোথায় গেল’-এর সাথে আরেকটা বড় প্রশ্ন তো রয়েই গেল। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাবে কবে?

 

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।