প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » সম্পাদকীয় » দায়িত্বটা বাবা-মাকেই নিতে হবে

দায়িত্বটা বাবা-মাকেই নিতে হবে

প্রকাশ : ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৭১:১৪:১৩ অপরাহ্ন

সবুজ শাহরিয়ার খান
সম্পাদক, বাংলা ইনিশিয়েটর

সেদিন বিকেলে  মিরপুরের পুলিশ স্টাফ কলেজের সামনে দিয়ে আসছিলাম। মুখ পরিচিত এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে দেখলাম বন্ধুকে সাথে নিয়ে মিরপুর ১৩ নাম্বারের দিকে যাচ্ছে। পরের দিন বুঝলাম তাদের ওইদিকে যাওয়ার উদ্দেশ্য। বন্ধুরা মিলে  ফুটপাতের পাশের এক দোকান থেকে সিগারেট খেতেই সেখানে যায়। দৃশ্যটা এখন প্রতিদিন দেখি। ৬-৭ জন বাচ্চা ছেলে খোলা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে।  তাদের বাসা মিরপুর ১৪ তে । শুধুমাত্র পরিচিত কেউ যেন না দেখে তাই সিগারেট খেতে চলে আসে এইখানে।

মিরপুর মুক্ত দিবস উপলক্ষ্যে বাংলা ইনিশিয়েটর আয়োজিত ইতিহাসের জলসায় আসার কথা ছিলো দশম শ্রেনীর কয়েকটা ছেলের। তারা না আসার কারন জানতে চাইলে  উত্তরে যা বলল তা শুনে  আমি রীতিমত অবাক হয়ে গেলাম।পূর্ব শত্রুতার জেরে রাস্তায়  একা পেয়ে তাকে ধরে তার টাকা পয়সা সব রেখে দিয়েছে তার সমবয়সী কিছু ছেলে।

কী ভয়কর একটা খবর!!  মাত্র দশম শ্রেণিতে পড়া একটা ছেলের পূর্বশত্রুতা অন্য একটা দলের সাথে!! আবার একা পেলে এক দল আরেকদলের সদস্যদের আটকে ধরে মার দেয়ার পর তার সাথে যা থাকে তা রেখে দেয়। অবশ্য এর চেয়েও অনেক ভয়ংকর খবরও আমরা কিছুদিন আগে শুনেছি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের কোমলমতি কিশোর সমাজের এক অবক্ষয়ের প্রধান কারনটা আসলে কি?? কেন আমাদের ছেলে মেয়েরা ঝুকছে সিগারেট, গাজা, হেরোইন কিংবা ইয়াবার এর মত নেশার পেছনে? কেন প্রতিটা এলাকায় ষষ্ঠ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক প্রতিটা ক্লাসের ছেলেরা আলাদা আলাদা গ্যাং করে ঘুরে বেড়ায়, গ্যাঙয়ে গ্যাঙয়ে মারামারি করে এমনকি খুন পর্যন্ত হচ্ছে এদের দিয়ে ?? এসব ঘটনা আমাদের আবার ভাবতে বাধ্য করছে আমাদের কিশোর, তরুণদের বেড়ে ওঠা, তাদের সামাজিকীকরণ, তাদের প্রকৃত শিক্ষার বিষয়টি।

এই আলোচনায় প্রথমেই যে কথাটি উঠে আসে, সেটি হচ্ছে, পরিবারের দায়। পরিবার কতটুকু সচেতন তাদের সন্তানের ব্যাপারে? কতটা খোঁজ রাখেন বাবা-মা—তাদের সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে? সে  কোনও খারাপ সঙ্গের সাথে  জড়িয়ে পড়ছে কিনা।

এটা খুব স্বাভাবিক যে সন্তানের যেকোনও বিষয়ে প্রথমেই আলোচনায় আসবে মা-বাবার ভূমিকা নিয়ে।  একজন সন্তান যখন প্রথম জন্ম নেয়, তখন মা-বাবা থাকে তার দুনিয়া। মা-বাবার বাইরে সে আর কাউকেই চিনতে শেখে না। ধীরে ধীরে সে সন্তান স্কুলে যাওয়া শুরু করে। জীবনের প্রথম বাইরের বড় জগতের সঙ্গে পরিচিত হয়। সেখানে সে খুঁজে পায় তার মতো আরও কিছু শিশুকে, গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। সেইসব বন্ধুত্বের সূত্রে তাদের পরিবারের সঙ্গেও পরিচয় ঘটে। জীবনের পাঠশালায় সে পায় তার শিক্ষকদের, যাদের কাছে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদ গড়ে ওঠে। এভাবে প্রতিটা ধাপেই তারা নতুন নতুন মানুষ পায় যাদের দ্বারা সে কিছুটা হলেও  প্রভাবিত হয়। কথা হচ্ছে এই প্রভাব ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক তার খোজ বাবা-মায়ের রাখতে হবে।

এলাকায় কিছু বড় ভাই থাকে যারা কিশোরদের শিখিয়ে দেয় যত অনৈতিক কাজ। সিগারেট খাওয়া, প্রেম করা এমন কি মারা-মারি করার পেছনেও থাকে এই বড় ভাইদের প্রত্যক্ষ্য বা পরোক্ষ উষ্কানী।

“আরে, তোর বয়সে তো আমার চার চারটা গার্লফ্রেন্ড ছিলো , দিনে দুই প্যাক বেনসন ছাড়া আমার চলতই না এই বয়সে। কি বেটা , তুই মেয়েদের মত সারাদিন পড়ালেখা নিয়ে থাকিস, আমাকে দেখ এলাকায় সব পোলাপাইন আমার কথায় উঠে বসে। লাইফটা উপভোগ কর, নাহলে প্রতিবন্ধির মত ফার্মের মুরগী হয়ে থাকবি ।”

অথবা

“কিহ!!  তুই সিগারেট খাস না? আরে তুই তো মেয়ে রে। ছিঃ  ছিঃ । সিগারেট ছাড়া পুরুষ পুরুষ ভাব আসে না ।”

এই হলো আমাদের এলাকার বড় ভাইদের শিক্ষা । এভাবেই যখন এলাকার  বড় ভাইদের কাছ থেকে নষ্ট শিক্ষা গ্রহণ করে একটি ছেলে ঠিক তখন  তার মা টিভির সামনে স্টার জলসা নিয়ে ব্যস্ত আর  বাবা ব্যস্ত ঐ সন্তানের জন্য টাকা রোজগার করতে ।  সন্তান কি করে, কোথায় যায়, কার সাথে মিশে,  কিভাবে সময় কাটায় এসব তো অন্য মানুষ এসে তদারকি করবে না। বাবা-মায়েদেরই করতে হবে।

আজকাল অনেক শিশুকে দেখি, বলতে গেলে একটা বিশাল অংশ, যারা ছোট্টবেলা থেকেই স্মার্টফোনে আসক্ত। দেড় দুই বছরের বাচ্চা বাবা মায়ের ফোন নিয়ে গেইম ডাউনলোড করে খেলছে। বাবা-মা ভীষণ গর্বিত। সেই বাচ্চারা নিজের বাসায় সারাক্ষণ ফোনে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে। এমনকি আত্মীয় বন্ধুর বাড়িতে গিয়েও ফোনখানা নিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে খেলতে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তার বদলে বাবা মা কী পায়? পায় নিরবিচ্ছিন্ন আড্ডার সুযোগ। সন্তান তাদেরকে বিরক্ত করে না। তার বদলে ভবিষ্যতে বাবা মা আরও কী পায়? পায় এমন একটি ছেলে বা মেয়ে যে প্রযুক্তি ও পণ্য আসক্ত, কল্পনাশক্তিহীন এবং বইপাঠে অনিচ্ছুক। আজ যে স্মার্টফোনটা সে ব্যবহার করে, কাল নতুন ফোনের জন্য তার বায়না খুব স্বাভাবিক। আজ যে বাচ্চাটির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করার কোনও কারণ নেই, তারই একাধিক অ্যাকাউন্ট থাকে ফেসবুক টুইটারে। আর বাবা মা আনন্দে – আমার সন্তান প্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শী!

আসলে এসব বাবা মা একটা মরীচিকার পেছনে অন্ধভাবে দৌড়াচ্ছেন। মরীচিকার শেষে অন্ধকার পরিণতি ছাড়া আর কিছু নেই। এই সহজ সত্য তারা কখনোই উপলব্ধি করতে পারেন না। সারাদিন মোবাইল মোবাইল ফোনে ঝুঁকে থাকার দৃশ্য কখনই সুস্থ স্বাভাবিক হতে পারে না ।

ফ্লাটের বাবা মায়েরা অনেক বেশি ব্যস্ত। তারা সন্তানদের খোজ খবর রাখেন না। সন্তান একাকীত্বে ভোগে। তাদের অলস মস্তিকে বাসা বাধে অপরাধ প্রবণতা। সব কিছু থাকার পরও ফ্লাটে একা থাকা সন্তান গুলো বড় হয় মানুসিক যন্ত্রনা নিয়ে। সারাদিন  ইন্টারনেটে ন্যুড ছবি দেখে ও চ্যাট করেই তাদের সময় কাটে। বাবা সারাদিন ব্যস্ত থাকেন ব্যবসা আর মিটিং নিয়ে, মা ব্যস্ত থাকেন পার্টি কিংবা সিরিয়াল নিয়ে। সন্তানদের প্রতি কোন নজরদারী নেই। কী করছে কী ভাবে তাদের সময় কাটছে তারা তা জানার চেষ্টা করেন না। এই হতাশায় বন্ধু বান্ধবী নিয়ে আড্ডা দিতে গিয়ে এক সময়  বিপদগামী বন্ধুদের প্ররোচনায় পড়ে তারা কখন মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে তা তারাই বুঝতে পারে না । কারন ঐ বন্ধুটিকেই সে সব চাইতে আপন মনে করে, বিশ্বাস করে।  এই বিশ্বাসের পেছনে তাদের কারনও আছে । গতরাতে  পরিচিত এক ছেলের সাথে তার বন্ধু নিয়ে কথা বলতে গিয়েই বিষয়টা জানতে পারলাম। তার মতে

“আমি রাত ১ টায় ২ টায় বিপদে পড়লে অন্য কেউ আসবে না। এই বিড়ি খোড় বন্ধু টাই আসবে।”

এখানে লক্ষ্য করুন তার চিন্তায় একটি বারের জন্যও তারা বাবা-মা কিংবা ভাই-বোনের কথা আসে নি। এসেছে ওই বন্ধুটির কথা । এবং সে নিশ্চিন্তে বলে দিচ্ছে,  আর কেউ আসবে না, শুধু ওই বন্ধুই আসবে। তার উক্তিতেই বোঝা যাচ্ছে পৃথিবীর সবার চাইতে ওই বন্ধুটিই তার সব থেকে বড় শুভাকাঙ্খী । এভাবেই তারা ওই বিশ্বস্ত বন্ধুর হাত ধরেই তারা চলে যায় নষ্ট পথে ।  অথচ বাবা মা তা টেরও পাচ্ছে না। একটা নামী স্কুল আর দুই-চারটা কোচিং এ ভর্তি করিয়ে দিয়েই বাবা-মায়ের দ্বায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। তারা ভাবছে তাদের ছেলে মেয়েরা শিক্ষা নিচ্ছে । অবশ্য তারা শিক্ষা বলতে বোঝেন পরীক্ষা ও ডিগ্রি এবং জীবনে উন্নতি বলতে বোঝেন টাকা ও প্রতিপত্তি। ফলে শিক্ষার মধ্যে শিক্ষার্থীরা সমাজে খুঁজে পায় না মহত্তর কোনো জীবন-বোধ বা নৈতিক মূল্যবোধ। কিশোর সমাজকে নতুন চেতনায় উদ্দীপ্ত করার মতো পরিকল্পনা নেই, ফলে তারা প্রতিনিয়ত অবক্ষয়ের দিকে অগ্রসরমান।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, তাদের মা বাবা নিজেদের ব্যস্ততার কারণে সন্তানদের খোঁজ টুকুও নিতে পারেন না। যার ফলে বখে যাচ্ছে অনেক ভালো পরিবারের  সন্তান।

আমি জানি না। এই অস্থির, অশান্ত শহরে , স্বার্থপর দূষিত সমাজে কোন দুঃসাহসে সন্তানের প্রতি এত বেখেয়াল আর নির্লিপ্ত হতে পারেন বাবা মায়েরা? যে সমাজ থেকে উধাও হয়েছে নীতিবোধ, মূল্যবোধের শিক্ষা, সেই সমাজে তারা কোন আত্মবিশ্বাসে সন্তানকে মাত্র তেরো চৌদ্দ বছর বয়সে চোখের আড়াল, মনের আড়াল করে দেন?

বাবা মায়ের সাথে এই দুরত্ব বয়ঃসন্ধি থেকেই শুরু হয়। তাই বাবা মায়ের উচিৎ ওই সময় থেকেই সন্তানকে বন্ধু বানিয়ে নেয়া। তার সাথে সকল বিষয়ে খোলা মেলা আলোচনা করা। যে সহজ সরল জীবন যাপনের পথে একদিন  আমরা হেঁটেছি, আজ প্রয়োজন তাকে ফিরিয়ে আনা। সেই বইপড়া, খেলার মাঠ, সব বন্ধুরা মিলে চড়ুইভাতি, গোল্লাছুট আর দাড়িয়াবান্ধা। সেই মধুর শৈশব কৈশোর যা আমরা যাপন করে এসেছি, যেখানে ছিল কৈশোরের সরলতা আর বাবা মায়ের বন্ধন, তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে আজ সময়ের প্রয়োজনে। আর এই দায়িত্বটা নিতে হবে বাবা মাকেই ।

**সম্পাদকের কার্যালয় থেকে 

 

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।