প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » পাবলিক পরীক্ষা, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং লক্ষ লক্ষ জিপিএ-৫

পাবলিক পরীক্ষা, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং লক্ষ লক্ষ জিপিএ-৫

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৭১২:১৩:৪৩ অপরাহ্ন

খাতুনে জান্নাত | বাংলা ইনিশিয়েটর

বর্তমানে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা অনুযায়ী প্রতিবছর মোট চারটি বোর্ড পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেই চারটি হলো পঞ্চম শ্রেণির পিইসি, অষ্টম শ্রেণির জেএসসি, দশম শ্রেণির এসএসসি ও দ্বাদশ শ্রেণির এইচএসসি। প্রত্যেকটি পরীক্ষাতেই প্রতিবছর আমাদের দেশের গড়ে প্রায় ১৫ লক্ষের মতো শিক্ষার্থী পাস করছে। জিপিএ-৫ অর্জন করছে প্রায় ২ লাখের মতো শিক্ষার্থী। যদি তা সত্যি হয়,তবে ধরে নিতে হয় আমাদের দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা খুবই ভালো। কারণ,কোন সময়েই এত শিক্ষার্থীর পাস এবং জিপিএ-৫ এর এমন বাম্পার ফলন হয়নি এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এই হার যথেষ্ট বেশি। গ্রাফ অনুযায়ী বর্তমানে আমাদের দেশে শিক্ষিত হচ্ছে অসংখ্য শিশু। তাহলে সমস্যাটা কোন জায়গায় হলো?

সমস্যা হলো এই যে এত অসংখ্য শিক্ষার্থী প্রতিবছর পাস করে বের হচ্ছে আর জিপিএ-৫ পাচ্ছে, এর পুরোটাই তারা নিজেরা পড়াশোনা শিখে পাচ্ছে না। কিছুটা নিজেদের পড়াশোনা, কিছুটা পাচ্ছে উদারভাবে খাতা দেখার ফলে আর বাকী অংশ লিপ্ত হচ্ছে ভয়ংকর এক অপরাধের সঙ্গে-প্রশ্ন ফাঁস!

সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি করার পর ভাবা হয়েছিল এবার বুঝি শিক্ষাক্ষেত্রে আর কোন সমস্যা থাকবে না। অন্তত শিক্ষার্থীরা তো নকলের মতো কোন অপরাধমূলক কাজ করবে না! কিন্তু সকলের সব ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে দিয়ে শুরু হলো অন্য এক অপরাধ। প্রায় প্রত্যেকটি বোর্ড পরীক্ষায় ফাঁস হয় প্রশ্ন, আর শিক্ষার্থীরা সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে নিজেরা পায় ও অন্যান্য বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। শুধু শিক্ষার্থীরা নিজেরা নয়, সারারাত জেগে থেকে তাদের বাবা-মায়েরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুঁজে বেড়াচ্ছে প্রশ্ন! যেখানে বাবা-মায়ের সবার আগে সন্তানকে নৈতিকতার শিক্ষা দেয়ার কথা।

এই সময়ে এসে একটু থমকে দাঁড়াতে হয়। বাবা-মা! তবে কি এখনকার বাবা-মায়েরা সন্তানদেন ভালো চান না? তবে কি তারা চান না তাদের সন্তানেরা নীতি-নৈতিকতায় পূর্ণ একজন আদর্শ মানুষ হয়ে উঠুক? না, বাবা-মা অবশ্যই তা চান। তবে সমস্যাটা হচ্ছে কোথায়?

গলদটা কিন্তু গোড়াতেই। গলদটা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাতেই। অবস্থাটা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে কারো সন্তান জিপিএ-৫ না পেলে সে সমাজে মুখ দেখাতে পারে না। জিপিএ-৫ না পেলে একজন শিক্ষার্থীকে সবাই মিলে দোষারোপ করে। এই জিপিএ-৫ ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় টিকে থাকার জন্যই শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকেরা করছেন এই ভয়ংকর অপরাধ। এই শিক্ষাব্যবস্থার কারণেই দশম এবং দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা তো বটেই, অষ্টম এমনকি পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও পরিচিত হচ্ছে এক ভিন্ন জগতের সঙ্গে-অপরাধের জগৎ।

এই খাতা দেখার উদারনীতি আর প্রশ্ন ফাঁসের কারণে যে লক্ষ লক্ষ পাস করা শিক্ষার্থী আর জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর জন্ম দিচ্ছে এই দেশ, কী লাভ হচ্ছে এতে?  শুধু ছকে দেখানো যে আমরা কত শিক্ষিত জাতি? বাইরের দেশের প্রশংসা পাওয়া? আর আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ? জাতির ভবিষ্যতের চেয়ে বুঝি বাইরের প্রশংসাই বড়-এই শিক্ষাই পাচ্ছি আমরা প্রচলিত ‘শিক্ষা’ পদ্ধতির মাধ্যমে। এই হাজার হাজার ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েই কিন্তু ঘটনা শেষ হয় না, মাত্র শুরু হয়। এরা প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পায়না, এরপর চাকরিক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ পায়না। যার ফলে আরও এক জিনিসের বাম্পার ফলন করছে এই দেশ, তা হলো শিক্ষিত বেকার!

কোথায় যাচ্ছে এই দেশ? এই নৈতিকতাহীন শিক্ষিত সমাজ কিংবা শিক্ষিত বেকারেরা কোথায় নিয়ে যাবে এই দেশকে? কেউ কি বলতে পারে এদেশের ভবিষ্যৎ কী? কী দিন অপেক্ষা করছে? যারা পঞ্চম শ্রেণি থেকেই পরিচিত হচ্ছে এক ঘৃণ্য অপরাধের সাথে, তাদের হাতে এই দেশকে কী করে আমরা ছেড়ে দিই কেউ কি বলতে পারবেন?

বরাবরই আমাদের দেশে শিক্ষা নিয়ে একটা ছেলেখেলা হয়েছে। প্রথমে ছিল ভয়ংকর মুখস্ত পদ্ধতি। তখনও শিক্ষার্থীরা এক ধরণের অপরাধ করতো, তা হলো নকল। এরপর যখন সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি আনার পর সকলে হাপ ছেড়ে বাঁচতে চাইলো, ভাবতে চাইলো কোমলমতি শিশুদের মনে আর কোন অপরাধ প্রবণতা ঢোকার আশংকা নেই, তখন অবাক হয়ে পুরো দেশ লক্ষ্য করলো এবার ব্যাপারটা আরও ভয়ংকর। যেখানে পুরো বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল করার প্রক্রিয়া চলছে, সেখানে তার আগেই এদেশের ছোট ছোট শিশুরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে অপরাধ করা শিখে যাচ্ছে! কারণ, তাকে জিপিএ-৫ পেতেই হবে; সে যে কোন উপায়েই হোক। তা না হলে সে কোন ভর্তি পরীক্ষায় টিকবে না, তার বাবা-মায়ের সমাজে মান-সম্মান থাকবে না। এমনকি অনেক স্কুলে এই নিয়মও আছে যে জিপিএ-৫ না পেলে নবম শ্রেণিতে নিজের পছন্দের বিভাগে যেতে পারবে না!

সত্যিকার শিক্ষা কতজন পাচ্ছে- তা একটা প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত-এই প্রচলিত ভালো শিক্ষার্থী অর্থাৎ জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের থেকে কিন্তু কিছুই পাচ্ছে না এই দেশ। বরং এই শিক্ষাপদ্ধতি চিহ্নিত হচ্ছে একটি অপরাধী তৈরির পদ্ধতি হিসেবে।

শেখাকে কবে একটু গুরুত্ব দিতে শিখব আমরা? কবে এদেশের ছোট ছোট শিশুকে আমরা শেখাতে পারব ‘শিক্ষা’ মানে শেখা, জিপিএ-৫ পাওয়া নয়? কবে আমরা এদেশের বুকে লক্ষ লক্ষ অপরাধীর জন্ম না দিয়ে খাঁটি মানুষের জন্ম দেব? ‘প্রশ্ন ফাঁস’ নামের এই অপরাধের গ্লানিই বা আমরা কতদিন বয়ে বেড়াব?

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ইনিশিয়েটর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ইনিশিয়েটর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

 

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।