প্রচ্ছদ » বাংলাদেশ » প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা

প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা

হোসাইন কবির | বাংলা ইনিশিয়েটর

‘ওরা আমার মুখের ভাষা
কাইরা নিতে চায়।
ওরা, কথায় কথায় শিকল পরায়
আমার হাতে পায়।’

এমন অনেক কবিতা আর গান একা ধারে সাহস যুগিয়েছিল এবং কলম যোদ্ধাদের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার হত। ভাষার জন্য এমন আত্মত্যাগ আর কোন জাতি করেছে কি না তা জানা নেই। একটি জাতির স্বকীয়তা প্রমাণ করে তার ভাষা। ভাষিক সংস্কৃতির সমৃদ্ধিই ভাষাগোষ্ঠীর একমাত্র পরিচয়বাহী। রাষ্ট্রযন্ত্র কিংবা ক্ষমতালোভীদের কূটচক্রান্তে এই ভাষা কিংবা ভাষিক জনগোষ্ঠী আক্রান্ত হলে প্রতিরোধ ও আন্দোলনই হয়ে থাকে সচেতন ভাষাবাহীর সত্তাকে স্বাধীন করার একমাত্র পথ।  আর ১৯৪৭ সালে দেশ যখন ভাগ হয় তখন থেকে অবহেলিত নিষ্পেষিত হয়ে আসছে বাংলার প্রতিটি মানুষ।

পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের ওপর বিভিন্ন গণবিরোধী নীতি চাপিয়ে দেয় ক্ষমতাসীন পশ্চিম পাকিস্তান। এর মধ্যে অন্যতম ছিল রাষ্ট্রভাষা ঊর্দূ করার নীলনকশা। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় এক ভাষণে রাষ্ট্রভাষা ঊর্দূ করার ঘোষণা দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রথমে ওই নীতির বিপক্ষে অবস্থান নেন। আন্দোলন এ ঝাপিয়ে পরে সর্বস্তরের মানুষ, ঢাকার রাজপথ  বিক্ষুব্ধ রুপ নেয় ।

সচেতন জনগণ ওই নীতিকে প্রত্যাখ্যান করে ছাত্রদের হাতকে শক্তিশালী করতে তাদের সমর্থন দেন। রুখে দেওয়ার ঘোষণা দেন বাংলা ভাষা নস্যাতের সকল ষড়যন্ত্র। ফলে অমানুষিক নিপীড়ন শুরু হয় বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর ওপর। শুরু হয় বাঙালী দমন ও নিধন প্রক্রিয়া।

বাংলার মানুষ এর একটাই দাবী ছিল ঊর্দূর পাশাপাশি বাংলা ভাষাকেও যেন রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়, একটি পরিসংখ্যান এ দেখা যায় উর্দূ ভাষায় কথা বলত মাত্র ৬.০৭ ভাগ মানুষ আর বাংলা ভাষায় কথা বলত ৫৪ ভাগ মানুষ।

তমুদ্দীন মজলিশ “পাকিস্তান এর রাষ্ট্র ভাষা কী হবে? বাংলা নাকি ঊর্দূ? “এই নিয়ে একটি পুস্তিকা বের করেছিল। বাঙ্গালি জনগণের ভাষা আন্দোলনের মর্মন্তুদ ও গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিবিজড়িত একটি দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ১৯৫২ সালের এই দিনে (৮ ফাল্গুন, ১৩৫৮) বাংলাকে পাকিস্তান এর অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েকজন তরুণ শহীদ হন। সালাম,শফিক, বরকত,রফিক সহ আরও নাম না যানা অনেক মানুষ মৃত্যু কে বরণ করে নেয় তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে , তারা জানতো এর পরিণাম ভালো নয়, কিন্তু তারা ভয় করে পিছিয়ে যায় নি।

মায়ের মুখের ভাষা রক্ষার্থে অকাতরে জীবন বিসর্জন দেওয়ার ঘটনা ইতিহাসে বিরল। বলা যায়, এর একমাত্র দাবিদার বাঙালী। যে কারণে বাংলা ভাষা আজ সর্বজনীন ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯৯৯ সাল থেকে ইউনেস্কোর ঘোষণার পর থেকে বিশ্বব্যাপী ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে।

বাংলাদেশ আমাদের জন্মের অহঙ্কার। বাংলাভাষা আমাদের বেঁচে থাকার অলঙ্কার। জাতির ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষায় রচিত কবিতা ও গানে আত্মমুক্তির যে ঋদ্ধ উচ্চারণ ধ্বনিত হয়েছিল, বুদ্ধিবৃত্তিক যে চেতনা সম্প্রসারিত হয়েছিল কাব্যচেতনার, তা এখনো প্রবহমান। বাঙালীর ইতিহাসে ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের নাম যেমন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, তেমনি বাঙালীর মাতৃভাষা বাংলা ভাষাকেও জাগ্রত রাখতে আমাদের সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। আর এতেই বাঙালীর মুক্তি।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।