প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » সম্পাদকীয় » সমাজসেবার উদ্দেশ্যেই কি সমাজসেবা?

সমাজসেবার উদ্দেশ্যেই কি সমাজসেবা?

সূচনা পাল | বাংলা ইনিশিয়েটর

বর্তমানে বাংলাদেশে এমন অনেক সংগঠন দেখা যাচ্ছে, যারা দাবি করছেন তারা সমাজসেবায় নিয়োজিত। এসব সংগঠনের মাঝে কিছু রয়েছে সুপরিচিত সংগঠন, যাদের বেশ ডাকনাম আছে, মানুষ তাদের এক নামেই চেনে। আবার আরেক শ্রেণীর সংগঠন রয়েছে যারা পরিচিত না হলেও পরিচিত হবার জন্য প্রবল বাসনা নিয়ে মনের ভেতরে আশার ঘর বাধতে থাকে যেন তারাও তাদের কাজ দ্বারা একদিন সমাজে প্রশংসিত হতে পারে ।

তবে এই দুই শ্রেণীর সংগঠনের প্রতিনিধিরাই মনে করেন যে তারা সত্যিকার অর্থেই সমাজসেবা করছেন, সমাজসেবা করে রীতিমতো সমাজের চেহারাই পালটে দিচ্ছেন। শুধু যে নিজেরাই মনে করেন তা কিন্তু নয়, অন্যদেরও সে কথা মনে করিয়ে দিতে চান যে এই সমাজের পেছনে তাদের অনেক অবদান । যাই হোক, এই যে তারা নিজেরা মনে করেন বা অন্যদের মনে করাতে চান যে তারা সমাজের জন্য কাজ করছেন, এর পিছনের মূল কারণ টা কি? তারা কি সত্যিকার অর্থেই সমাজসেবায় নিয়োজিত, নাকি অন্যকিছু?

এবার একটু গভীরে যাওয়া যাক। সমাজসেবী সংগঠনসমূহ, তাদের মধ্যে সিংহভাগই যতটা না কাজে ব্যস্ত, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রচারে ব্যস্ত। এর মানে হল এই যে, সংগঠনসমূহ যতটা না দান করছে, সমাজের সেবা করছে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি তা সম্প্রচার করছে। আর এই প্রচার কাজের প্রথম মাধ্যম হিসেবে তারা বেছে নিয়েছে তাদের কৃত কাজের প্রমাণ হিসেবে প্রচুর পরিমাণে ছবি তোলা, ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়াকে। ব্যপারটা বেশিরভাগ সময়ই অনেকটা এমন দেখায় যে কেউ একজন হয়তো এক হাত দিয়ে একটি পথশিশুকে কিছু টাকা দিচ্ছেন আর অন্য হাত দিয়ে তার ছবি তুলে তা সামাজিক মাধ্যমে সবাইকে দেখানোর জন্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আবার কখনো যদি কোনো কর্মসূচীর আয়োজন করা হয় তাহলে তো একেবারেই লাগামহীন হয়ে যাইয় এসব সগঠন।

সম্প্রতি আমার দেখা এক “শীতার্তদের কম্বল দান” কর্মসূচীতে কম্বল দান করা হচ্ছিল। সেখানে বেশ একটি লম্বা লাইনে গরীব,দুঃখী, শীতার্তরা দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেখানে দেখলাম সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট, এক গরীব মহিলার হাতে কম্বল তুলে দেয়া অবস্থায় প্রায় ৫ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন ক্যামেরাম্যান এর ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। এর কারণ ছিল আলো ছায়ার কারণে ছবি ভাল আসছিলনা। এদিকে যে পিছনে বেশ এক লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে মানুষগুলো কষ্ট পাচ্ছে সে বিষয়ে তাদের বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই। তাদের খেয়াল রয়েছে ছবি তোলায়, সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করায়, সবাইকে কিভাবে জানান দেয়া যায় যে তারা কত মহান করছেন তার উপর। ব্যাপারটা অনেকটা এমন হয়ে দাড়াচ্ছে যে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। অর্থাৎ তারা যদি ১০০ শতাংশ সময় সমাজসেবামূলক কর্মসূচীতে ব্যয় করে বলে দাবী করেন, তাহলে খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে যে তার মধ্যে ৮০ শতাংশ সময়ই তারা ছবি তোলায়, প্রচার করায় খরচ করেছেন।

আমার কথার মানে এই নয় যে সংগঠণসমূহ তাদের প্রচার বন্ধ করে, বিনা প্রচারে কাজ করবে। তারা প্রচার করবে,কিন্তু সেই প্রচার অবশ্যই তাদের কৃত কাজের চেয়ে বেশি পরিমান হওয়া উচিত না। কিন্তু বর্তমানের সমাজসেবী সংগঠনসমূহের সিংহভাগের মধ্যেই প্রচারের প্রবণতাই অধিক লক্ষ্য করা যায়।

এখানে যারা সেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে, তাদের মধ্যেও বেশিরভাগই নিজেকে প্রচারের জন্য এসব সংগঠণের সাথে যুক্ত হয়। তাদের চেতনাটা অনেকটা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে এরকম সংগঠণসমূহের সাথে যুক্ত হলে তারা অনেক বেশি মানুষের সাথে যুক্ত হতে পারবে, সবাই না হলেও অনেকেই তাদের চিনবে। ফলে তারাও কিছুটা জনপ্রিয় হবার সুযোগ পাবে। কারণ আজকাল নিজেকে জনপ্রিয় করার জন্য না হলেও নিজের ফেসবুক প্রোফাইলের এবাউট এ লেখার জন্য হলেও তো কিছু করা প্রয়োজন। এই এবাউটে লিখার জন্যই হোক আর নিজেকে জনপ্রিয় করার উদ্দেশ্যেই হোক, ব্যক্তি তখন সমাজসেবার কাজটি বেছে নেয়। এই যে সমাজসেবার কাজটি বেছে নেয়া, এর কারণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশে আর যাই হোক সমাজসেবী সংগঠণসমূহের অভাব নেই। আর এই সংগঠনসমুহের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। তাই নিজেকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য বা স্রোতের ধারায় গা ভাসিয়ে দেয়ার জন্য এর থেকে সদুপায় তারা আর চোখের সামনে দেখতে পায় না। তখনই তারা বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে পরে এবং নিজেকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে দাবী করে।

কখনো আবার কেউ কেউ নিজের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নিজে নিজেই একটি সংগঠন তৈরি করে ফেলে। কয়েকজন ছেলে পেলে যোগাড় করে, একটি নাম দিয়ে দিলেই তো হয়ে গেল সংগঠন। এরপর ফেসবুকে একটি পেইজ খুলে সেখানে সমাজের করুণ অবস্থা নিয়ে ব্যাথিতহৃদয় পূর্ণ কথাবার্তা লিখে পোস্ট দিবে। আর তারপর দেখা যাবে বছরে ২/৩ টা কর্মসূচীর আয়োজন করবে, প্রোফাইলে লিখবে “Working as president in ‘অমুক ফাউন্ডেশন’”। ব্যাস হয়ে গেল কাজ!আর কি লাগে?? এরপর গলা বাড়িয়ে মুখ বড় করে বলবে “আমি ‘অমুক’ ফাউন্ডেশন এর প্রেসিডেন্ট”। আর লোকে ভাববে না যেন কি! ভাববে সমাজসেবা করছে কিন্তু সে যে সমাজসেবার নাম করে প্রচারে ব্যস্ত হয়ে আছেন তা বুঝবার জন্য আরেকটু গভীরে গেলেই তা স্পষ্ট হয়ে যায় । এসকল সংগঠন আবার বিভিন্ন সময়ে নানা রকমের কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা কাজের চেয়ে অকাজই বেশি করে থাকেন। আর কাজ করলেও তা নিছকই লোক দেখানো হয়ে যায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো এক সংগঠন এর কর্মসূচীতে পথশিশুদের মেহেদি উৎসব চলছে। সেখানে একজন স্বেচ্ছাসেবক দেখা যাচ্ছে জনসম্মুখে একটি পথশিশুর সাথে বেশ ভাল আচরণ করলেও আড়ালে যখন শিশুটি তার কাছে বারবার খাবার চায়, তখন সে শিশুটির সাথে জঘন্য আচরণ করে, তাকে ঘৃণা করে, অথচ দেখা যায় সেই স্বেচ্ছাসেবকই আবার পথশিশুটির সাথে ছবি তুলে বেশ এক করুণ ক্যাপশন দিয়ে ফেসবুকে প্রোফাইল ছবি দিচ্ছে। ছবিতে লাইক পরছে, মানুষ কমেন্ট করছে, তার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এক্ষেত্রে এই কৃতকাজসমূহকে আমরা কি বলব? সমাজসেবা? অবশ্যই না। অন্তত আমার চোখে তা নয়।

মানুষ যে একে সমাজসেবা বলে তার কারণ আপাত দৃষ্টিতে এই ধরনের কাজে সমাজের কিছু সংখ্যক গরিবদুঃখী বা হাভাতে পথশিশুরা উপকৃত হয়। লোকে যে এ ধরনের কাজকে বাহবা দেয়, দিক। কিন্তু তা বলে এ যেন না ভাবে যে এ সেবায় সমাজের উন্নতি ঘটছে। কারণ এই ধরনের সেবায় আর যাই হোক, সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন অসম্ভব। তাই এই সেবাকে আমি সমাজসেবা বলতে পারিনা। এ হল নিজের সেবা করা। নিজের জন্য সমাজসেবাকে ব্যবহার করা। একে বলা হয় আত্মসেবা। আর আমাদের সমাজে বর্তমানে সমাজসেবার নামে এই আত্মসেবাই চলছে।

আমাদের তরুণ সমাজ নিজেকে সমৃদ্ধ ও জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে সমাজসেবাকে এভাবে ব্যবহার করে আত্মসেবা করছে। আমার কথাগুলো হয়ত শুনতে খারাপ লাগবে, লাগাটাই স্বাভাবিক। কারণ আমাদের পরিস্থিতির কথা সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে মিথ্যা বলা যায়না। আর সত্য কথা যে সর্বদাই শুনতে খারাপ লাগে এ কথা তো কারো অজানা নয়। যাই হোক, এইযে আমি বলছি যে সমাজসেবী সংগঠনসমূহের মধ্যে সমাজসেবার নামে আত্মসেবা প্রলক্ষিত হয়, তা অবশ্যই সকল সংগঠন এবং সকল স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে প্রলক্ষিত হয়না। পৃথিবীতে যেমন আলো-অন্ধকার উভয়ই আছে, তেমনি সমাজেও ভাল-খারাপ যে থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক । হ্যা!! তা তো স্বাভাবিকই। কিন্তু অস্বাভাবিকতা তখনই দেখা যায়, যখন খারাপের ঠেলায় ভালো হারিয়ে যায়। তখনই বিপত্তি ঘটে। কিন্তু আমাদের এই ক্ষীণ জাতির মধ্যেও এমন কিছু ক্ষুদ্রপ্রাণ রয়েছে যারা সত্যিকার অর্থেই সমাজসেবা করতে চায়, যারা সত্যই সমাজের উন্নতি সাধনে সচেষ্ট। তবে তাদের সংখ্যা সমাজে বিরল। বিরল হলেও কিছু সংগঠন, কিছু মানুষ এখনো রয়েছে, যারা স্রোতের ধারায় গা ভাসিয়ে না দিয়ে, আত্মসেবা না করে প্রকৃত অর্থে সমাজসেবায় গা ভাসিয়ে দেয়। তাদেরই প্রশংসা করি।

এই সমাজে যারা প্রকৃতপক্ষে আমাদের চারপাশের পরিবেশ, দেশ, সমাজ নিয়ে ভাবে, যারা সত্যিই পথশিশু, গরীব-হতদরিদ্রদের দেখে ব্যাথিত হয়, তাদের নিয়েই গড়ে তোলা উচিত সমাজসেবী সংগঠন। তাদের নিয়ে নয়, যারা লোক দেখানো সমাজসেবা করে এবং প্রচারে অধিক ব্যস্ত। আমার কথার মানে এই নয় যে সংগঠন্সমুহ প্রচার করা বন্ধ করে দিবে। প্রচার করাও আবশ্যক। কারণ, প্রচার না করলে মানুষ সেই সংগঠন সম্পর্কে জানতে পারবে না, আর জানতে না পারলে প্রকৃত সমাজসেবী মানুষেরা সেই সংগঠনের সাথে যুক্ত হতে পারবেনা। তাই প্রচারও দরকার। কিন্তু সে প্রচার অবশ্যই কৃত কাজের চেয়ে বড় হয়ে উঠবে না।মনে বদ্ধমূল চেতনা রাখতে হবে যে আমাদের মুখ্য কাজ সমাজসেবা, আত্মসেবা নয়।

আর প্রচারের উদ্দেশ্য যেন কোনোভাবেই লোক দেখানো বা নিজেকে জনপ্রিয় করা না হয়, উদ্দেশ্য যেন হয় মানুষকে সমাজসেবায় উদ্বুদ্ধ করা। তবেই সে সেবা আত্মসেবা না হয়ে প্রকৃত সমাজসেবা হয়ে উঠবে।

>