প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » সম্পাদকীয় » শিক্ষা শিশুদের জন্য দিন দিন শ্রমে পরিণত হচ্ছে?

শিক্ষা শিশুদের জন্য দিন দিন শ্রমে পরিণত হচ্ছে?

 সূচনা পাল | বাংলা ইনিশিয়েটর

অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণেই একটা সময়ে আমাদের দেশের ব্যাপক সংখ্যক শিশু শিশুশ্রমে নিয়োজিত ছিল। তবে, এখন যে শিশুশ্রম একেবারেই নেই, সে কথা কিন্তু সত্য নয়। তবে এ কথা সত্য যে, প্রত্যক্ষ শিশুশ্রম পূর্বের চেয়ে বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। এর কারণ যদি লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি দেশেও নিষিদ্ধ হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম। তবুও সারাদেশে এমন ৫২ লক্ষ শিশু রয়েছে যারা প্রতিদিন পায়ে ফেলছে মাথার ঘাম। অথচ তারা যে পারিশ্রমিক পায় তা তাদের পরিশ্রমের তুলনায় অতি সামান্য।

আজকের শিশুরাই আগামি দিনের ভবিষ্যৎ তাই, এই শিশুরাই যদি শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে শিশুশ্রমে নিয়োজিত হয়, তাহলে সেই শিশুদের হাত ধরেই পিছিয়ে পড়তে থাকবে আমাদের সমাজ, দেশ ও জাতি। ফলস্বরূপ দেশের উন্নতি, জাতির উন্নতিও অসম্ভব পর্যায়ে পৌছে যাবে। তাই শিশুশ্রম বন্ধ করা এখন অত্যন্ত প্রয়োজন।

শিশুশ্রম বন্ধ করার লক্ষ্যে আমাদের বর্তমান সরকারও কঠিন অঙ্গিকারবদ্ধ হয়েছেন। আমাদের সরকার ও সমাজ তাই দেশের উন্নতি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে শিশুশ্রম বন্ধ করে শিশুদের শিক্ষার আলো দিতে চান। আর এই শিক্ষার আলো তারা ছড়িয়ে দিতে চান অবশ্যই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দ্বারা । তাদের বিশ্বাস এতে শিশুদের শারীরিক কষ্ট লাঘব হবে,তারা উন্নতির শিখরে পৌছাবার পথ খুঁজে পাবে। এই বিশ্বাস এবং চাওয়া যে অতি সৎ সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই শিক্ষাব্যবস্থার প্রক্রিয়ার ফলে সত্যই শিশুদের শ্রম লাঘব হচ্ছে কিনা, তাদের কষ্ট হ্রাস পাচ্ছে কিনা সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

লোকে যে এই শিশুর হাত থেকে ইট ভাঙার যন্ত্রপাতি সরিয়ে বই খাতা তুলে দেয়ার প্রক্রিয়ার প্রশংসা করে, করুক। আমিও করি, কারণ এটি নিঃসন্দেহে একটি মঙ্গলকার প্রক্রিয়া। কিন্তু বিপত্তিটা তখনই সৃষ্টি হয় যখন শিশুকে আমাদের শিক্ষব্যবস্থার জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হতে হয়। তাই আমি বলব এই প্রক্রিয়ায় শিশুশ্রম নিরোধ না হয়ে আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অনেকেই হয়ত আমার কথা শুনে হেসে উঠবেন। কিন্তু আমার বক্তব্যের যে ভিত্তি ও যুক্তি উভয়ই বিদ্যমান তা অতি শীঘ্রই বুঝতে পারবেন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কথা এবার বলা যাক। আমাদের মায়েরা শিশুদের মুখ থেকে দুধের গন্ধ কাটার আগে সে মুখ থেকে পড়ালেখার বুলি শুনতে চান। এরপর যখন শিশুর মুখ থেকে দুধের গন্ধ সামান্য কেটে যায়, তখনই শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন। তবে সে বিদ্যালয় কিন্তু আবার যে সে বিদ্যালয় নয়, সে হল দেশের নামকরা সব বিদ্যালয়সমূহ। তাদের মতে, এসব বিদ্যালয় থেকে তাদের সন্তানরা এতটা বিদ্যা অর্জন করে ফিরবেন যার সুবাদে তারা জীবনে আপনা আপনি উন্নতির শিখরে পৌছে যাবে। এ ধারণা যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন সে ধারণা এই শ্রেনির মাতৃকুল এর নেই। যাই হোক, তাদের এ লক্ষ্যে মাতারা তাদের সন্তানদের প্রাণপণ চেষ্টা করে অসংখ্য ভর্তি গাইড, বই, শিট পড়ানো শুরু করেন। অনেকে আবার তাদের সন্তানদের ‘ভর্তি কোচিং’ নামক অজায়গায় ভর্তি করিয়ে দেন। কারণ দেশে তো আর বিদ্যাদাতার অভাব নেই। আর এসব জায়গায় শিক্ষার একাংশও হয়না, বরং অশিক্ষাই হয়।শিক্ষার নামে গাদাগাদা প্রিন্টেড শিট বাচ্চাদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় যাতে তারা সেই শিট মুখস্থ করে পরীক্ষার হলে গিয়ে তা খাতায় উদগীরন করতে পারে। তারা সেই শীটের একাংশও জীর্ণ করতে পারুক আর না পারুক, তাতে কিছু আসে যায়না। আর তাদের মাতারা যে এই শিটসমূহ বহু সাধ্যসাধনা করে সন্তানদের পড়িয়েই দম নেন এ ব্যাপারে দ্বিধা নেই, আর সন্তান যদি তা করতে না চান , তাহলে যে তার উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করতে হবে সে বিষয়েও মাতাদের কোনো দ্বিধা থাকে না।

এই যে শুরু হল শিশুর উপর মানসিক চাপ, এ চাপ তার সমগ্র শিক্ষা জীবনব্যাপিই চলতে থাকে। এরপর যখন শিশুটি বহু চাপ সামলিয়ে স্বনামধন্য স্কুল সমূহে ভর্তি হয়ে যায়, তখন তাদের ব্যাগভর্তি বইখাতার ওজন হয় তাদের নিজেদের শরীরের ওজনের চেয়ে বেশি। আর সেই ব্যাগ ভর্তি বইখাতা নিয়ে নিয়মিত তাদের পাড়ি জমাতে হয় বিদ্যালয়ে। এতে যে তাদের মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সে খেয়াল কারো নেই।

এ পর্যন্ত ই কিন্তু শেষ নয়, এরপর বাসায় ৩/৪ জন গৃহ শিক্ষক তো আছেনই। এরপর আছে কোচিং,অমুখ শিক্ষক, তমুক শিক্ষক ইত্যাদি ইত্যাদি। মা-বাবারা তাদের সন্তানদের এতসব শিক্ষকের কাছে দিয়েই নিশ্চিন্ত হয়ে যান এই ভেবে যে এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষগণ তাদের ছেলেমেয়েদের এতটা শিক্ষা দিয়ে দিবেন যাতে তারা তাদের ভবিষ্যৎ জীবন সুখে শান্তিতে অতিবাহিত করতে পারবেন। কিন্তু তারা একবারও সন্তানের মুখের দিকে তাকান না যে তাদের সন্তানরা আদৌ এত চাপ নিতে পারবে কিনা। এই চাপ যে সময়ের সাথে কমতে থাকে তা কিন্তু নয়, আরো বাড়তে থাকে।

বোর্ড পরীক্ষায় সন্তানের জিপিএ-৫ আনার জন্য শিক্ষকের কাছে পড়ানোর প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে যায়। কখনো যদি কোনো ছেলে বা মেয়ে জিপিএ-৫ আনতে না পারে, তাহলে যে তাদের জীবনের কোনও মূল্য নেই সে কথা বাব-মা তাদের সন্তানদের পুনঃপুনঃ বুঝিয়ে দেন। এরপর সকল বাবা-মাই আবার তাদের সন্তানদের ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার বানাতে চান। আর তাদের সন্তান যদি ইঞ্জিনিয়ারিং বা ডাক্তারিতে চান্স না পান, তাহলে যে তাদের জীবনের কোনো মূল্য নেই একথাও তারা সন্তানদের বুঝিয়ে দেন। এতে যে সন্তানদের উপর কি পরিমাণ মানসিক চাপ সৃষ্টি তা বলার মত নয়। অনেকে আবার এই চাপ থেকে মুক্তির কথা চিন্তা করে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়।

বাবা-মা যে তাদের সন্তানদের ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করেন, তার কারণ আমদের শিক্ষাব্যবস্থা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ছেলে মেয়েরা সুশিক্ষিত হয়েও চাকরিবাকরি পায়না, আর প্রশ্ন ফাঁসের মত ঘটনা তো রয়েছেই। আবার যখন তখন প্রশ্নের ধারা পরিবর্তন করার ঘটনাও রয়েছে। এইত গত বছর ২০১৬ সালে এসএসসি ব্যচ ২০১৭ এর টেস্ট পরীক্ষা শুরুর সময় হঠাত করে লিখিত ৬ টি সৃজনশীল থেকে ৭ টি সৃজনশীল করা হল। শিক্ষার্থীদেরদের যে পরীক্ষার হলে ৭ টা সৃজনশীল লিখতে গিয়ে হাতের রগ থেকে ঘাড়ের রগ পর্যন্ত ব্যথা হয়ে যায় সেটা তাদের দেখার বিষয় নয়। তাই বাবা-মা রাও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিরুপায় হয়ে সন্তানদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। আর শিশুরা এতে চরম মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়। তাদের আর আপনার বলে কিছু থাকেনা। জীবনিশক্তি কমে আসে।

আমাদের এই শিক্ষাব্যবস্থাকে মানতে গিয়ে শিশুরা যে মানসিক ও শারীরিক চাপের শিকার হয় তা শিশুশ্রমের শারীরিক চাপের চেয়ে কোনো অংশে কম বলে আমি মনে করিনা। তাই একে শিশুশ্রম নিরোধ করা বলে নাকি বৃদ্ধি করা বলে সেটা আপনারাই এবার ভাল বলতে পারবেন। আমার চোখে একে শিশুশ্রম বৃদ্ধিই বলে। সর্বোপরি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের উপর চরম শারীরিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে।যে চাপ শিশুশ্রমের চেয়ে কোনো অংশে কম না। তাই যদি সত্যিকার অর্থেই শিশুশ্রম নিরোধ করে শিশুকে শিক্ষার আলো দিতে হয়, তবে সর্বপ্রথম শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করতে হবে। তবেই আমাদের সমাজ, সরকার শিশুশ্রম বর্ধক না হয়ে শিশুশ্রম নিরোধক হয়ে উঠবে। আর দেশ, জাতি ও সমাজের উন্নতি তরান্বিত হবে।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।