প্রচ্ছদ » বাংলাদেশ » ৭ মার্চের ভাষণ ও বাঙ্গালির স্বাধীনতা

৭ মার্চের ভাষণ ও বাঙ্গালির স্বাধীনতা

নুহিয়াতুল ইসলাম লাবিব | বাংলা ইনিশিয়েটর
৭ মার্চ তারিখটি বাঙালির জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর মাঝে অন্যতম একটি দিন।আর তাই তো এ দিনটি এলে প্রত্যেক বাঙ্গা্লির হৃদস্পন্দন একটু হলেও বেড়ে যায় আর বুকের মাঝে ধ্বনিত হয় মুজিবের দ্বর্থহীন কন্ঠে বলা সেই দুটি কথা

এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণটির মাধ্যমে প্রত্যেক বাঙ্গা্লির মাঝে স্বাধীনতার জন্য যে ক্ষুধা সৃষ্টি করেছিল তার ফলস্বরূপ আমরা পেয়েছি আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ। পেয়েছি আমাদের বাংলা মা কে।কিন্তু কি ছিল এই ভাষণে ? কেনই বা শেখ মুজিবুর রহমানের এই ভাষণ শুনে বাঙ্গালি জাতি তাদের জীবন বিপন্ন করে হলেও স্বাধীনতা শব্দটির সাথে পরিচিত হতে চেয়েছিল? আর কেনই এ ভাষণকে আব্রাহাম লিংকনের ঐতিহাসিক গেটিসবার্গ ভাষণটির সাথে তুলনা করা হয়?

১৯৩৭ সাল তখনো ভারত পাকিস্তান বিভক্ত হয় নি কিন্তু পাকিস্তান নামক একটি নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি হচ্ছে তা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল বিশ্ববাসী।আর তখনই সর্বপ্রথম মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ বলেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা”।এটিই ছিল বাংলা ভাষার উপর পাকিস্তানদের প্রথম আক্রমন।তবে বাঙ্গালিদের নেতা শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক তাৎক্ষনিক এর বিরোধিতা করেন।এরপর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি আনুষ্ঠিকৃতভাবে স্বীকৃতি পেলে, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটিতে যে বাঙালি নামে এক জাতির বসবাস রয়েছে তা পাকিস্তান সরকার নিতান্তই ভুলে গিয়ে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করবার প্রস্তাব করেন।কিন্তু ভাষার প্রতি আঘাত কি বাঙালি এতো সহজে মেনে নেবে? আর তাই ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি থাকা স্বত্তেও ১০ জন করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের দিক থেকে মিছিল বের করে ছাত্র সমাজ। পুলিশ প্রথমে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে, এক পর্যায়ে মিছিলে গুলি বর্ষন করে পুলিশ । পুলিশের গুলিতে মারা যায় সালাম, বরকত, রফিকসহ আরো নাম না জানা অনেকে।অবশেষে বাঙ্গালির আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠলে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সংবিধানের ভাষা বাংলা করতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার।

পাকিস্তান সরকার ভাষার দাবি বাধ্য হয়ে মেনে নিলেও বাঙ্গালিদের প্রতি পাকিস্তানিদের বৈষম্য ছিল উল্লেখযোগ্য।প্রেসিডেন্টের সচিবালয়, দেশরক্ষা, শিল্প, স্বরাষ্ট্র, তথ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন, কৃষি সব খাতেই বাঙ্গালির প্রতি বিপুল বৈষম্য লক্ষণীয়।তাই বাঙ্গালির মাঝে ধীরে ধীরে ক্ষোভের বাসা বাধতে শুরু করে তখন থেকেই।

১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ হয় যা ১৭ দিন স্থায়ী হয়। এ সময় পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ সম্পূর্ণ অরক্ষিত থাকে আর এর মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার জনগনের প্রতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের চরম বৈষম্যমূলক আচরণ ফুটে উঠে। আর এ অবহেলার বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম সুস্পষ্ট রুপ লাভ করে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার মাধ্যমে। কিন্তু বাঙ্গালির ৬ দফা মেনে নেওয়া পাকিস্তান সরকারের পক্ষে ছিল অসম্ভব । কেননা দাবি মেনে নিলে পাকিস্তান সরকার বাঙ্গালিদেরকে আর শোষন করতে পারবে না। পাকিস্তান সরকার দাবি গ্রহন না করে উলটো দমন-পীড়ন শুরু করে বাঙ্গালিদের উপর।

বঙ্গবন্ধু এ দীর্ঘ সময় পাকিস্তান সরকারকে পর্যবেক্ষন করে বুঝতে পেরেছিল যে স্বাভাবিক নিয়মে এরা বাঙ্গালিদের দাবি মেনে নিবে না । ১৯৭০ সালের নির্বাচন তার সুস্পষ্ট প্রমাণ। বিপুল পরিমান ভোটে নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান জয় করলেও গদিতে বসতে দেয় নি পাকিস্তান সরকার বরং ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে শুরু করে নানা রকম টালবাহানা। আর তাই বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালে ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে(বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্দ্যান) জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করবার লক্ষ্যে একটি জনসভার আয়োজন করেন আর বঙ্গবন্ধুর এই ভাষনই ছিল বাঙ্গালিদের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক যাত্রা।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে ফুটে উঠেছিল পশ্চিম পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠীর শোষন-শাসন, বঞ্চনার ইতিহাস, ৭০ এর নির্বাচনে জয়ের পর বাঙ্গালির সাথে প্রতারণাসহ বাঙ্গালির রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমি। তাছাড়া এ ভাষণের মাধ্যমে বাঙালি পায় ঐক্যবদ্ধ হবার প্রেরণা ও মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশনা।এ ভাষনের মাধ্যমেই শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন এবং বাঙ্গালিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবার আহবান দেন তিনি বলেন, “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুলো, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ো”।আর তাই এ ভাষনের পরেই বাঙ্গালির একটি মাত্র গন্তব্য নির্ধারণ হয়ে যায় আর তা হলো স্বাধীনতা।

বঙ্গবন্ধুর এই ভাষনে বাঙালি স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন দিতেও দ্বিধা বোধ করে না । সবাই উপলব্ধি করতে পারে স্বাধীনতা বাঙ্গালিদের জন্য কতোটা জরুরী।আর তাই তো মা-বাবা,ভাই-বোন, স্ত্রী কন্যার মায়া ত্যাগ করে কতো মুক্তিযোদ্ধারা কেবল একটি শব্দের আশায় যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিল আর শব্দটি আমাদের অতি পরিচিত “স্বাধীনতা”।

৭ মার্চের জ্বালাময়ী সেই ভাষণটির সৃষ্টি না হলে হয়তো আজকের বাংলাদেশ বাংলাদেশ হয়ে উঠতো না , হয়তো বা পূর্ব পাকিস্তান নাম ধরে পাকিস্তানীদের গোলামি করেই আমাদের কাটাতে হতো।কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে আজ আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র । আর এজন্যই ৭ মার্চ দিনটি আমাদের কাছে এতোটা তাৎপর্যপূর্ণ।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।