প্রচ্ছদ » বাংলাদেশ » কোনো দিক থেকে পিছিয়ে নেই দেশের মহিলারা

কোনো দিক থেকে পিছিয়ে নেই দেশের মহিলারা

 শাফিউল ইসলাম | বাংলা ইনিশিয়েটর

“এই মগবাজার,ফার্মগেট,গুলিস্তান!!! ”

এগুলো আমাদের অতি পরিচিত কিছু শব্দ। এ শব্দ গুলোর কথা বলাতে স্বাভাবিকভাবে যার কথা মাথায় আসে তিনি হলেন বাস কন্ডাক্টার বা হেল্পার। আমাদের জনজীবনে এক বিরাট জায়গা জুড়ে আছে পাবলিক বাস। আমরা সর্বত্রই শুনছি এ শব্দ গুলো। একজন চিৎকার করে প্রতিনিয়তই যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষন করছেন এবং আহবান জানাচ্ছেন বাসে উঠার জন্য। কিন্তু এ বিষয়টি তখনি আপনার কাছে বিস্ময়ের মনে হতে পারে , যখন এ কাজ টা কোনো মহিলা করবেন।

হ্যা, বলছি মহিলা কন্ডাকটর এর কথা। বর্তমানে ঢাকা এবং চিটাগাং এ “বি আর টি সি মহিলা সার্ভিস” বাস চালু রয়েছে। বাস গুলো মহিলা হেল্পার দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এরকমই একজন “বি আর টি সি মহিলা সার্ভিস বাস” এর কন্ডাক্টার “মোসাম্মৎ সুমি”।

২৫ বছর বয়সী সুমি থাকেন শ্যামলীতে। ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি। অভাবের তাড়নায় আর বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেন নি। তারপর বিয়ে হয়ে যায় একজন এম্বুলেন্স চালকের সাথে। তারপর এক কন্যা সন্তানের জননী হন তিনি। শুরু হয় জীবন সংগ্রাম।স্বামীর উপার্জিত অর্থ যথেষ্ট না হওয়ায় সংসারের হাল ধরতে এবং এক মাত্র মেয়ের পড়াশুনার খরচ যোগাতেই স্বামীর সাথে তাকেও জীবিকা অর্জনের জন্য “বি আর ট সি মহিলা সার্ভিস” এ মহিলা হেল্পার হিসেবে চাকরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। কোনো মাসে ৬ হাজার, আবার কখনো বা মাসে ৮ হাজার উপার্জন করে থাকেন “মোসাম্মৎ সুমি”। এভাবেই চলে যায় তার সংসার একথা বলছিলেন তিনি।

একজন নারী যে হেল্পার হবেন সেটা সমাজের অনেকেই মেনে নিতে পারে না। এমনকি পেশাগত কারণে কম কথাও শুনতে হয় না তাদের! মজার ছলেই হয়তো বাদ যায় না পুরুষ যাত্রীদের কটু কথাও। তবুও জীবিকার তাগিদে চালিয়ে যাচ্ছেন তার সংগ্রাম। সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং এসব বিকৃত মনোভাবী কিছু ব্যাক্তিদের জন্য তিনি তার পেশার কথা কখনো জানাতে পারে নি নিজের আত্নীয় স্বজন কেও। কিন্ত চাকরি করে যাচ্ছেন ৪ বছর যাবৎ। অথচ ঠিকই মিটিয়ে চলেছেন আত্নীয় স্বজন্দের চাহিদাও। এভাবেই অনেক কথা কষ্ট নিয়ে বলছিলেন কিন্তু সবশেষে একটি কথা বলেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ” মানুষের কথায় কান দেই না, আমি কাজ করে খাই। কারো টা বসে বসে খাই না।” এভাবেই তার বলিষ্ঠ ও দৃঢ় মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। তাছাড়া কোনো অভিযোগ আছে কি না তা জানতে চাইলে একটু মৃদু হেসে সব কষ্ট নিজের মাঝে চেপে রেখেই বললেন, “না, কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ রোজগার এর ব্যবস্থা দিয়েছেন আমি খুশি।”

এভাবেই হয়তো মোসাম্মৎ সুমির মতো অনেক শ্রমজীবী নারীরা প্রতিনিয়তই নানা প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে যাচ্ছেন।

এমন আরেকজন শ্রমজীবী মহিলা “মোসাম্মৎ জেসমিন” দীর্ঘ ৫ বছর যাবত চট্টগ্রামে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে যাচ্ছেন। ছেলে মেয়ের সকল খরচ তিনি রিকশা চালিয়েই একা বহন করে যাচ্ছেন। মাসে ১৬ হাজার বা কখনো ১৮ হাজার উপার্জন করে থাকেন তিনি। কিন্তু তবুও কথা পিছ যেন ছাড়তে চায় না তাদের মতো শ্রমজীবি মহিলাদের। হতে হতে তাকেও পদে পদে অপদস্থ। কিন্তু তবুও হার মানেন নি জেসমিন বা সুমিদের মতো শ্রমজীবী নারীরা।

নারীরা কোনো দিক দিয়েই যে আর পিছিয়ে নেই তার অনেক দৃষ্টান্তের মধ্যে তারা অন্যতম।পুঁথি পাঠ করা থেকে জুতা সেলাই, এমনকি হিমালায় পর্বত থেকে নীল বিস্তৃত আকাশ সেখানেও রয়েছে নারীদের বিচরণ।প্রধানমন্ত্রী থেকে স্পিকার,গৃহবধূ থেকে চাকরিজীবী সব কিছুতেই যেনো রয়েছে তাদের পারদর্শিতার ছোঁয়া। কারণ তারায যে মা! ১০ মাস একটা ভ্রুণ কে বড় করেছেন তার গর্ভে রেখে। গর্ভধারণ এর অসহ্যনীয় ব্যাথা যারা সহ্য করতে পারেন, তাদের কাছে পরিশ্রম করে রিকশা চালানো বা গলা চেঁচিয়ে হেল্পারি করা কি বা আর আহামরি কাজ!!

সালাম জানাই সকল স্তরের শ্রমজীবী নারীদের, যারা প্রতিনিয়ত সকল প্রতিকূলতাকে শক্ত হাতে প্রতিহত করে এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। ভুলে গেলে হবে না, আমাদের পোশাক শিল্পে রয়েছে নারীদের বিরাট অবদান। পোষাক শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করতে নারীরাও পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমান তালে কাজ করে যাচ্ছে। ২০১১ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত আদমশুমারীর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের নারীর সংখ্যা ৭কোটি ১০ লাখ ৬৪ হাজার। পুরুষ ও নারীর সংখ্যার অনুপাত ১০০:১০৩। সুতরাং আমরা এ বিপুল নারীগোষ্ঠীকে যথাযথভাবে জনবলে পরিণত করতে না পারলে উন্নয়ন এর “উ” তে গিয়েই আটকে যাবো। তাই আন্তর্জাতিক নারী দিবস এ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই লাইন গুলো মনে করিয়ে দিতে চাই,

” এ বিশ্বে যাহা কিছু মহান, চির কল্যানকর,

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।।”

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।