প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » সম্পাদকীয় » অন্ধের ভান করে সমাজের অনিয়মগুলো উপেক্ষা আর কতদিন?

অন্ধের ভান করে সমাজের অনিয়মগুলো উপেক্ষা আর কতদিন?

খাতুনে জান্নাত | বাংলা ইনিশিয়েটর

৭১-এ যুদ্ধের পর থেকে বাঙালি জাতিকে ‘বীরের’ জাতি বলা হয়, সাহসী জাতি বলা হয়। কে বলে? বাঙালি নিজেই। ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ যে জাতি করেছে, তা অবশ্যই বীরের জাতিই করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তার উত্তর পুরুষকেও কি সে কারণে আমরা বীরের জাতি বলতে পারি? তারা কি সেরকম কিছু করেছে? রবীন্দ্রনাথের ছেলেও কি তবে রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠলো?

সমাজে অনিয়মগুলো হতে হতে ব্যাপারটা এমন হয়ে গেছে যে আমরা এখন এর সাথে অভ্যস্ত! এগুলো আমাদের জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা! কোনো অনিয়ম দেখলে আমরা প্রতিবাদী তো হয়ে উঠিই না, বরং সে রাস্তা দিয়ে চোখ বন্ধ করে সটকে পড়ি! এই কি তবে বীরের জাতির নমুনা?

স্কুল-কলেজের সামনে, বাসস্ট্যান্ডে, রেস্টুরেন্টে কিংবা পার্কে প্রতিদিন কত মেয়েকে উত্ত্যক্ত করা হয় তা কি আমরা জানিনা? নাকি আমাদের চোখে এসব দৃশ্য কখনো পড়ে না? কখনো কি আমরা প্রতিবাদ করছি? ব্যাপারগুলো ঘটতে ঘটতে এমন হয়েছে যে আমাদের কাছে ঘটনাগুলো একেকটা ‘সাধারণ’ ব্যাপার! কিন্তু আমরা কখনো ভাবি না আমাদের এই সাধারণ প্রতিবাদ না করা থেকেই উত্ত্যক্তকারীরা কী বিপুল পরিমাণ উৎসাহ পাচ্ছে, যা আকারে বড় হতে হতে পহেলা বৈশাখে নারী লাঞ্চনার মতো বড় ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে। তারপরও আমাদের মধ্যে প্রতিবাদের কোনো আগুন নেই। ব্যাপারটা এমন, ও ধর্ষিত হচ্ছে হোক, তাতে আমার কী! তা বটে! তবে আমার আজ কোনো প্রতিবাদ না করায় ধর্ষণকারী যে সাহস পাচ্ছে, তাতে যে কাল আমার বোন কিংবা আমার মেয়ের সাথেই একই ঘটনা ঘটবে না,তার গ্যারান্টি কে দিতে পারে?

আমাদের দেশের একদল প্রাণোচ্ছল তরুণ,যাদের এখন নিজের পাশাপাশি দেশকে এগিয়ে নেয়ার কথা, সেখানে তারা নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। মাদকের ভয়াবহ ছোবল তাদের জীবনকে গ্রাস করে ফেলছে। যেখানে আমাদের তরুণদের জীবনই তাদের নিজেদের কাছে মূল্যহীন, সেখানে নিজের দেশের মূল্য তাদের কাছে কতটা কিংবা দেশ তাদের কাছে আদৌ কিছু আশা করতে পারে কিনা, তা এখন প্রশ্নের মুখে। আমরা কি প্রথমেই পারতাম না এমন কোনো উদ্যোগ নিতে যাতে আমাদের দেশের কিশোর-তরুণেরা মাদকের দিকে ঝুঁকে না পড়ে? সবই কি সরকারের দায়িত্ব? আমাদের কি কোনোই দায়িত্ব নেই? আজ আমরা যদি এই ব্যাপারে উদ্যোগ নিতাম,তাহলে হয়তো দেশের এতো কিশোর-তরুণ সামান্য একটা জিনিসের কারণে নিজেদের জীবন বিপন্ন করতে বসতো না।

আচ্ছা, আমাদের দেশটা অনেক নোংরা, তাইনা? বেশিরভাগ মানুষই আমার সাথে একমত হবেন। কিন্তু নোংরাটা হলো কী করে? রাস্তায় ময়লাগুলো কি একা একা উড়ে আসে? নাকি কোনো প্রেতাত্মা এসে ফেলে দিয়ে যায়? নাহ্, বাইরে থেকে কেউ না। কাজটা আমরা নিজেরাই করি। তাহলে আমরাই আবার কোন অধিকারে বলি, ‘বাংলাদেশ নোংরা’? আমাদের নিজেদেরই কি এখন নৈতিক দায়িত্ব হয়ে পড়েছে না এই নোংরা দেশটাকে সুন্দর করে তোলার? ‘আমি একা করলে কী আর এমন হবে’ এই যুক্তি অনেকেই দাঁড় করাই আমরা। আমাকে তো পুরো দেশ ঠিক করার দায়িত্ব দেয়া হয়নি। আমি নিজে যতটুকু পারি, ততটুকু করি অন্তত, তাহলেই হবে। আমি নিজে যদি একটা ময়লা গিয়ে ডাষ্টবিনে ফেলে আসি, তবে তার দেখাদেখি ১০ জন ফেলবে; তাদের দেখাদেখি আরও ১০০ জন। আমার শুধু ফেললেই দায়িত্ব শেষ হবে না, কেউ যদি রাস্তায় ময়লা ফেলে, তবে তাকে বলতে হবে যে এখানে ময়লা ফেলার জন্য ডাষ্টবিন আছে, সেখানে ফেলুন। এতটুকুও যদি আমরা না করতে পারি, তবে এদেশ নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার আমি পাই কোথায়?

আমরা চোখে দেখতে পাই। তবুও অন্ধ সেজে থাকি। এই অন্ধত্ব, এই কাপুরুষতা ধীরে ধীরে আমাদের সমাজকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। অন্ধের ভান করে আছি, কিন্তু কতদিন থাকতে পারব? সমস্যাগুলো কতদিন এড়াতে পারব? কিংবা আদৌ কি এড়াতে পারছি? আমার কোনো আপনজনকে যদি আজ রমনায় লান্থনার শিকার হতে হয়, তবেও কি উপেক্ষা করতে পারব সমস্যাটা? বসে থাকতে পারব অন্ধ সেজে? আমার দেশটা একটা ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হলে কি আমার কিছুই আসে-যায় না? আমার প্রিয়জন মাদকের কালো স্পর্শে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাক, আমার কী!

উপেক্ষা তো করছি আমরা। অন্তত আমরা মনে করছি যে অন্ধের ভান করলেই বুঝি উপেক্ষা করা যায়। কিন্তু তা তো মোটেও হচ্ছে না। তীরটা এসে শেষে আমার পিঠেই লাগছে। তাই পিঠে লাগার আগেই কি আমরা সচেতন হতে পারিনা? এরকম বহু অনিয়ম আছে সমাজে, যা প্রতিদিন আমাদের চোখে পড়ে। আমরা প্রতিবাদও করিনা,আর সেই অনিয়ম যাতে না ঘটে তার জন্য কোনো পদক্ষেপও নিই না। যার ফলাফল ১৬ কোটি মানুষের অর্ধেক অনিয়ম করে বেড়াচ্ছে আর বাকী অর্ধেক চোখে ঠুলি বেঁধে বসে আছে। অথচ অনিয়ম বন্ধ করার জন্য কেউই নেই।

অন্ধ সেজে থাকলেও যাতে উপেক্ষা করতে পারব না, দেখি না একটু চেষ্টা করে বন্ধ করতে পারি কিনা। দেশটা আমাদের, দেশটাকে গড়ার দায়িত্বও আমাদের। দেশের কথা ভেবে না হোক,তীরটা শেষে আমার পিঠেই লাগবে তা ভেবে হলেও এখন অনিয়মগুলো বন্ধ করা প্রয়োজন।

পরিবর্তন আসুক আমাদের মনে, পরিবর্তন আসুক আমাদের চিন্তাধারায়। বাঙালী বীরের জাতি,কথাটা সত্যি হোক। অন্ধ সেজে আর কতদিন?

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ইনিশিয়েটর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ইনিশিয়েটর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

>