প্রচ্ছদ » ভ্রমন » ভারত ভ্রমণের সেই দিনগুলো!

ভারত ভ্রমণের সেই দিনগুলো!

  সূচনা পাল | বাংলা ইনিশিয়েটর

বেশ কিছুদিন আগে আমি ভারতভ্রমণে গিয়েছিলাম। ভ্রমণ থেকে ফিরে এসে ভাবলাম সে ভ্রমণের গল্পটা বরং লিখেই ফেলি। তাছাড়া বাঙালির লোক দেখানো স্বভাব তো আছেই। তাই আমার মনের মাঝে যে এরকম একটা ইচ্ছা জাগবে সেটাই স্বাভাবিক। সতেরই মার্চ রাত দশটায় বাড়ি থেকে পোটলাপুটলি নিয়ে বের হলাম। বের হবার সময় আরো একবার দেখে নিলাম ভিসা পাসপোর্ট নিয়েছি কিনা। কারন এমন রেকর্ড আমার আছে যে এয়ারপোর্টে গিয়ে ফিরে এসেছি পাসপোর্ট ভিসা নেইনি বলে। সে কথা ইতিহাসই থাক। ব্যাগপ্যাক নিয়ে রিক্সায় উঠলাম রাত দশটায়। যাত্রা করলাম বাস স্টেশনের উদ্দেশ্যে। গাড়ি রাত এগারোটায়। সময় নিয়ে খুতখুতে স্বভাবটা আমার সবসময় ধরেই আছে।তাই বরাবরের মত এবারেও আমি বেশ আগেই গন্তব্যস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। রিক্সায় উঠার পরপরই বুঝতে পারলাম রিক্সাওয়ালা একটু বেশিই বন্ধুসুলভ। প্রথমদিকে তার কথা ভাল লাগলেও ধীরে ধীরে অসহ্য মনে হতে লাগল। উপায়ান্তর না দেখে তার সেই সুমধুর বক্তৃতায় নিজের কানকে ভুলিয়ে ভালিয়ে শেষ পর্যন্ত পোঁছে গেলাম বাস স্টেশনে।ঘড়িতে বাজে ১০,৪০। সময় অনু্যায়ী ২০ মিনিট পর গাড়ী আসার কথা। কিন্তু গাড়ি এল ৪০ মিনিট পর ।আর যাত্রীরাও সবাই এমন সময়ে আসতে লাগল আর এমন ভাব করল যে দেখে মনে হল এটাই মনে হয় সবাভাবিক। ও হ্যা এটাই তো সাভাবিক।আমি তো ভুলেই গেসিলাম যে আমি এখনো বাংলাদেশের বাইরে যাইনি। অতঃপর টিকিট হাতে বাসে উঠে নিজের সিট খুজে বসে পড়লাম।বাসের মাঝামাঝি জানালার পাশের সিট।দেখেই ভাল্লাগল। সিটে বসে যাত্রাপথে কতই না সুন্দর দৃশ্য দেখব ভেবে আমার মনে উথালপাথাল শুরু হয়ে গেল। কিন্তু সে আশায় গুড়াবালি। বাসে উঠার সাথে সাথেই ঘুমে দুচোখ জুড়িয়ে এল। যখন আমার ঘুম ভাঙল তখন সকাল সাতটা ।বাইরে তাকিয়ে দেখি চারপাশে জল। প্রথমটায় স্বপ্ন ভাবলেও শীঘ্রই বুঝতে পারলাম যে বাস ফেরীতে আছে। বাসে বসেই সকালের নাস্তা করলাম। এরপর সময় কাটতে লাগল।

বাংলাদেশ ইন্ডিয়া বেনাপোল বর্ডারে যখন আমি পোছেছি তখন সকাল এগারোটা।বারো ঘন্টা লং জার্নির ৮/৯ ঘন্টাই আমি কাটিয়েছি ঘুমিয়ে। এই এক সমস্যা আমার। বাসে উঠলেই ঘুমপায়। যাই হোক বর্ডারে ভিসা পাসপোর্ট হাতে নিয়ে ঢুকে যাবতীয় কাজকর্ম সারলাম। বাংলাদেশ বরডার পেরিয়ে ঢূকলাম ইন্ডিয়ান বর্ডারে। কাউন্টার লাইনে দাঁড়িয়ে আবার একই প্রশ্ন শুনতে হল আমাকে,’’আপকা ফটোমে চ্যাশ্মা কিউ নেহি হেইন?’প্রশ্ন শুনে মেজাজ গরম হয়ে গেল। তবু ঠান্ডা হয়ে বললাম ‘আজ সকালে চশমা নিয়েছি তাই’। অনর্থক মিথ্যা কথা। সত্যিটা ব্যাখ্যা করার মত সময় ও ধৈর্য কোনোটাই তখন আমার ছিলনা। আর মাঝেমধ্যে মিথ্যা বলার মধ্যেও পৈশাচিক আনন্দ পাওয়া যায়। আর সামনে যদি হিন্দুস্থানী অফিসার থাকে ,তাহলে তো কথাই নাই। শেষ পর্যন্ত ভারত বর্ডার পেরিয়ে পা দিলাম ভারতে। ব্যাপারটা খবই সুন্দর। একটা গেট আছে,সেই গেট এর এপারে বাংলাদেশ ওপারে পা দিলেই ভারত।ভারত বাংলাদেশের আবওহাওয়া সম্পূর্ণ একরকম।শুধু ওখানকার সময় বাংলাদেশ থেকে ৩০ মিনিট পিছানো। তাই আমাকে যখন বলা হয়েছিল যে বর্ডারে ১১ টায় লাইন। আমি দ্বিধায় ভুগছিলাম যে এগারটা অর্থ বাংলাদেশ সময় এগারোটা নাকি ইন্ডিয়ান। যাই হোক। ভারতে যাব শুনে কয়েকজন বন্ধুবান্ধব আমাকে বলেছিল সেখান থেকে শাহরুখ খান,অনুপম রায়,কুতুব মিনার ,তাজমহলকে ব্যাগে ভরে নিয়ে আসতে। সে কথা মনে করে আপন মনেই হাসতে শুরু করলাম।

বরডার পেরিয়ে দেখি মামা গাড়ী পাঠিয়ে দিয়েছে। যদিও আমার ইন্ডিয়ান ট্রেন ভ্রমণের শখ ছিল,কিন্তু সে শখ শখই রয়ে গেল। উঠে গেলাম গাড়ীতে।মামা ভারতের বড়সড় একজন শিল্পপতি।তাই সে একরকম জোর করেই তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন।অগত্যা উঠে গেলাম গাড়ীতে। গন্তব্যস্থল মামার বাড়ী কালনা শহর। কালনাকে আমি বড়সড় শহর ভাবলেও পরে জানতে পারলাম যে কালনা মফস্বল শহর। সেদিনের মত বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নিলাম। দুইদিন পর যাত্রা করলাম কলকাতার উদ্দেশ্যে । কলকাতার রাস্তাঘাট দেখে আমি অভিভূত হলাম।ঢাকা শহরের সাথে কলকাতা শহরের মিল অনেক থাকলেও পার্থক্য ও আছে বেশ। কলকাতার রাস্তাঘাট যথেষ্ট পরিষ্কার । রাস্তার জনগণ সবাই একসাথে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। ট্রাফিক আইন মেনে চলছে। বাহ!সিগন্যালে হঠাত গাড়ি থেমে গেল। একটি ৭/৮ বছরের ছেলে এসে বলল,’দিদি একটু ছুনবে?’ আমি বললাম হ্যা বল। “আমার কাছে খুব ছুন্দর গোলাপ আছে ।তুমি নেবে? এক খানা ৫ টাকা করে। দুখানা নিলে ৮ টাকা। “ছেলেটি থেকে আমি দুইটি গোলাপ কিনলাম। লক্ষ্য করে দেখলাম ছেলেটি স কে ছ উচ্চারণ করছে। তবে তার ভাষা একদম শুদ্ধ চলিত ভাষা। পরে দেখলাম শুধু ছেলেটিই নয়,ভারতের বেশিরভাগ মানুষই এভাবে কথা বলে। আবার এরা ছোট বড় সবাইকেই তুমি করে সম্বোধন করে। এখানে হিন্দুদের বাস। অন্যান্য ধর্মের মানুষও আছে কিন্তু তা নগণ্য।

 

এখানকার মানুষের খাবারে বেশ ভিন্নতা রয়েছে। বাঙ্গালিদের খাবার আমাদের অনুরূপ হলেও দক্ষিন ভারতের, পাঞ্জাবের খাবারে যথেষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। দক্ষিন ভারতের বিভিন্ন খাবারের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল ধোসা। ধোসা সাইজে দেখতে বিশাল হলেও খেলেই আপনি বুঝতে পারবেন যে ব্যবহার্য উপাদানের পরিমান বেশি না। এই ধোসা পরিবেশন করা হয় বিভিন্ন ধরনের তরকা বা স্যূপ দিয়ে। দক্ষিন ভারতের আরেকটি জনপ্রিয় খাবার হল ইডলি। এটি আমাদের দেশের ভাপা পিঠার অনুরূপ। শুধু ভেতরে নারকেল গুড়েড় পুরের জায়গায় সবজি ও অন্যান্য মশলা জাতীয় উপাদানের পুর দেয়া। ভারতের ঘড়োয়া হোটেলগুলতে বেশ কম দামে সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায়। কিন্তু এদের বিশেষত্ব হল এরা রান্নায় বেশ পরিমানে চিনি দেয়। ভারতে গিয়ে এ কারনেই আমার খাও্যা দাও্যায় বেশ সমস্যা হয়েছিল। এমনিতেই ঝাল খেয়ে অভ্যাস,সেখানে যদি কেউ মিষ্টই দিয়ে ভরিয়ে রাখে কেমন হবে।

যাই হোক,কলকাতায় গিয়ে যে ব্যাপারটা আমি বারবার টের পেয়েছি তা হল সেখানকার নারীরা বেশ স্বতন্ত্র । তাদের দেখলে মনে হয় সত্যিই নারীপুরুষের মধ্যে কোনো বৈষম্য নেই। বরং নারীদের দাপটই মনে হয় পুরুষদের চেয়ে বেশি। এ প্রসঙ্গে এক সন্ধ্যার কথা বলা যায়।সেদিন আমি মাকে নিয়ে ডাক্তারখানার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম টোটোতে করে। টোটো হল আমাদের দেশের হলুস কাল রঙ এর অটোগুলো। এই টোটো গুলো আমাদের দেশের লেগুনার মত অল্প দূরত্বে যাত্রী চলাচল বহাল রাখে। যাই হক,সেই টোটোতে পিছনে ৩ জন ও সামনে ড্রাইভারের পাশে একজন এর বসার জায়গা। টোটোতে আমি আর মা পিছনে বসে ছিলাম। হঠাত করে এক ভদ্রলোক হাত নাড়ীয়ে আমাদের টোটো দাড় করাল। লোকটা ড্রাইভারের পাশের সিটে বসতে যাবে এমন সময় কোথা থেকে একজন মহিলা এসে লোকটিকে একরকম ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে পরল। এরপর লোকটি যখন আবার পিছনের সিটে বসতে গেল তখন আরেকজন মহিলা এসে সিট দখল করে নিল। লোকটি নিরুপায় হয়ে দাড়িয়ে রইলেন। অবশ্যই এটি ভাল কিছু না। কিন্তু আমি বাজি ধরে বলতে পারি যে আমাদের দেশের মহিলারা একাজ কখনোই করতে পারত না। এমনকি আমি নিজেও এমনটা করার আগে দুবার ভাবতাম। তাই বলি ভারতের মহিলারা যতটা না স্বতন্ত্র ততটা স্বতন্ত্র হতে আমাদের আরো ১০ বছর লেগে যাবে,তাতেও হবে কিনা সন্দেহ আছে।

সংগত কারণেই ভারতের দর্শনীয় স্থানগুলো আমার দেখা হয়ে উঠেনি। তবে যতটুকু দেখেছি তাতে এতটুকু বলতে পারি যে এরা সাধারণত খুব একটা অতিথি পরায়ন হয়না। তবে এদের মধ্যে পাঞ্জাবরা ব্যাতিক্রম। পাঞ্জাবরা খুবই অতিথি পরায়ন। যানবাহনের কথা বললে বলা যায় এখানে সাইকেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। বড়,বুড়ো,বাচ্চা সবাই সাইকেল চালায়। আর দূরপাল্লার যাত্রার জন্য এরা বাসের ব্যবহার একদমই করেনা,ব্যবহার করে ট্রেন। অফিসে যাতায়াত এর জন্যও অধিকাংশ মানুষ ট্রেনই বেছে নেয়,কারণ সেখানের ট্রেন ব্যবস্থা খুবই ভাল। আর কলকাতায় দুই একটা ট্রামও দেখা যায়। তবে যে বিষয়টা আমাকে আশ্চর্য করেছে তা হল কলকাতার বাসের ড্রাইভার আর পুলিশ কথা বললে মনে হয় সমশ্রেনীর দুইজন মানুষ কথা বলছে যেখানে কিনা বাংলাদেশের বাস ড্রাইভার আর পুলিশ কথা বললে মনে হয় চাকর আর মালিক কথা বলছেন।

ভারতে স্কুলগুলোতে ৬ষষ্ঠ শ্রেনী থেকে বাংলা মিডিয়াম স্কুলে ইউনিফর্ম হল শাড়ী আর ইংরেজী মিডীয়ামে শর্ট স্কারট,শারট ও টাই। যাই হোক। আমি যেসব জায়গায় গিয়েছি তার মধ্যে মায়াপুর অন্যতম। মায়াপুর অসম্ভব সুন্দর জায়গা। আসলে এটি হিন্দুদের এক বিশাল উপাসনালয়। মায়াপুরের ভিতরে ঢুকলে মনে হবে আপনি রীতিমত বেহেশত অথবা সবর্গে এসেছেন। ভিতরে ক্যামেরা বা ফোন নেয়া যায়না। সেখানে আমি অনেক বিদেশীদের দেখলাম ভারতীয় পোশাক পরে মন্দিরের কাজ করছে অথবা ভজন, প্রার্থনা করছে। এদের দেখে আমার একটি কথাই মাথায় এল তা হল, ভারতীয়রা পাশ্চাত্য সংস্কৃতি অনুকরন করতে ব্যকুল অথচ তারা দেখতে পাচ্ছেনা যে যাদের সংস্কৃতি তারা অনুকরণ করতে চাচ্ছে তারাই কেমন ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি ঝুকে আছে। তাদের পোশাকাশাক দেখেই মূলত আমার এই ধারণা হল। কারন যেসব বিদেশীরা সেখানে চলাফেরা করছিলেন তারা সবাইই ছিলেন শাড়ী পরা অথবা চুড়িদার পরা, ওড়না প্যাঁচানো অর্থাৎ শালীন। আর স্থানীয় ভারতীয়রা এসেছিল স্লিভলেস, ব্যাকলেস, ওড়নালেস জামা কাপড় ,জিন্স পরে।

যাই হোক,সেখানে এক দল বিদেশি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান করছিলেন আর একজন বিদেশি মহিলা শাড়ি পরে তার তালে তালে নাচছিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে তা দেখছিলাম,হঠাত সে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন নাচার জন্য। বেশ ভালই লাগছিল তালে তালে পা ফেলে নাচতে। একএকটা সুর মনে হল যেন শরীরে বিধে যাচ্ছে আর বলছে “আপন ছন্দে আপন তালে নেচে মুখরিত করো তুমি চারপাশ”………

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।