প্রচ্ছদ » উড়াল » তারুণ্য » মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিশোর-তরুণদের ভাবনা

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিশোর-তরুণদের ভাবনা

  খাতুনে জান্নাত | বাংলা ইনিশিয়েটর

বাংলাদেশ-নামটার সাথে মিশে আছে আরেকটি শব্দ। যার নাম মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাসের সেই মুক্তিযুদ্ধের কারণেই পেয়েছিলাম এই দেশটা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেকের মনেই আছে ভুল ধারণা। বর্তমান প্রজন্মের অনেক কিশোর-তরুণরাও একে ‘গন্ডগোলের সময়‘ বলে থাকে! আবার অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের সময় ও মুক্তিযোদ্ধাদের দেয় যথাযথ শ্রদ্ধা।

কী ভাবে আমাদের দেশের কিশোর-তরুণেরা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে? প্রশ্নের উত্তরটা জানতে চেয়েছিলাম কয়েকজনের কাছে। দেখে নিন তাদের উত্তর।

ফাতেমা জান্নাত রুহি
শিক্ষার্থী, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল

আমরা তরুণ প্রজন্ম।আমরা কিশোর-কিশোরী। আমরা নবচেতনায় উদ্যম।আমরা হয়ত মাতৃভাষার আন্দোলন,স্বাধীনতা কিংবা স্বাধিকার আদায়ে রাজপথে নামিনি।দেখিনি কালো রাত; শুনিনি সেই ভয়ানক আর্তনাদ। শুধু দেখেছি মুক্তিযোদ্ধাদের শুনেছি তাদের স্বপ্নগাঁথা। কখনো বা শিউরে উঠেছি বর্বরতার কাহিনী শুনে। জেনেছি একদল স্বাধীনচেতা দেশপ্রেমিক তাদের সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে দেশমাতৃকারল অধিকার আদায়ে।বঞ্চিত লাঞ্ছিত মানুষ গুলোকে তাদের স্বপ্নের সোনার বাংলা উপহার দিতে। তারা শুধু জানত তাদের যা আছে তাই নিয়ে নামতে হবে ময়দানে। তাদের এই ভালোবাসাই আজ আমাদের গর্ব। সাহসিকতা হাতিয়ার। তাই আমরা আজও বলতে পারি ‘৭১ এ পেরেছি আজও পারব। তবু কোনো শাসন শোষন নীতি হতে দেব না শহীদদের পবিত্র রক্তে রঞ্জিত বাংলায়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি রইল বিনম্র নেত্র অভিভাষণ। আমরা কৃতজ্ঞ,আমরা ধন্য। গর্বিত বাঙালি; উদ্ভাসিত স্বজাতি।

 

শাফিন রহমান
শিক্ষার্থী,শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজ
আমাদের এই অংশটি অনেক দিন ধরেই শোষিত হচ্ছিল। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে মানুষ শোষণের শিকার ছিলো। যখন ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছিলো, নিশ্চয়ই এখানকার লোকেরা ভেবেছিলো একটু শান্তি মনে হয় এখন আসবে। কিন্তু তখন নতুন শোষণ শুরু হয়। মানুষ আর কত সহ্য করতে পারে? এক না এক সময় আন্দোলন হতোই। স্বাধীনতা আমাদের প্রাপ্য ছিলো। কিন্তু এই সাধারণ কথাটি যখন পাকিস্তানী শাসক নামের শোষকরা বুঝতে পারেনি। তাদের বোঝানোর জন্যই বোধহয় আন্দোলনগুলো একের পর এক হচ্ছিলো । মুক্তিযুদ্ধই আমাদের আজকের এই বাংলাদেশ এনে দেয়। যদি মুক্তিযুদ্ধ না হতো তাহলে হয়তো আজও আমরা সেই পাকিস্তানের অংশই হয়ে থাকতাম।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশি কিছু বলার নেই কারণ মুক্তিযুদ্ধ যারা আমরা দেখিনি তারা কখনো সেই সময়কে আসল রূপে উপলব্ধি করতে পারব না । যারা দেখেছে তারা জানে তাদের সেই সময়কে কথা দিয়ে বলা যাবে না।

এইচ এম ফায়েকুজ্জামান ফাহাদ
শিক্ষার্থী,বর্ণমালা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়

মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতাযুদ্ধ – যাই বলি না কেন, আমাদের পরিচয় ঘটেছে তো এটার দ্বারাই। ১৯৭১ সালে ঘটে যাওয়া বিষয়টাকে নিছক যুদ্ধ বলাটাও আমার মতে ভুল হতে পারে। এটা ছিলো লড়াই, এটা ছিলো এক গভীর চেতনা। যা আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছে দেশের জন্যে জীবন দিতে। হ্যাঁ, আমি লড়াই করি নাই, আমি রক্তও দেই নাই। তবুও, আমি কল্পনা করেছি নিজেকে সেই স্থানে। স্বাধীন বাংলাদেশ সামান্য একটা পতাকা না, স্বাধীন বাংলাদেশ শুধুমাত্র সামান্য একটা বাক্য না। এটা বাংলার স্বাধীন মানুষের আবেগ, তাদের ভালোবাসা, তাদের অধিকার, তাদের চাওয়া। সত্য কথা বলতে স্বাধীনতা নিয়ে একটা মানুষের চেতনা তখনই কার্যকরী হবে যখন সে দেশকে ভালোবাসবে অতঃপর দেশকে ভালোবেসে দেশকে জানতে চেষ্টা করবে।

ফয়েজ আহমেদ ফাহাদ
শিক্ষার্থী, শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজ।
৩০ কোটি প্রাণের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। ২৫ শে মার্চ, এই কালো রাতে নিষ্ঠুর পাক বাহিনীরা বাংলার নিরীহ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মা,বাবা,ভাই, বোন,হিন্দু, মুসলিম সকলকে নির্বিচারে হত্যা করে। অবশেষে লক্ষাধিক প্রাণের বিনিময়ে আমরা ফিরে পেয়েছি আমাদের দেশ। এই মুক্তিযুদ্ধের কারণেই আমরা ফিরে পেয়েছি মা, মাতৃভূমি ও বাংলা ভাষা। এই মুক্তিযুদ্ধ আমাকে আমার অনুপ্রেরণা জোগায়।

 

সায়মা আক্তার
শিক্ষার্থী, শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজ

আজকে আমরা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক। এই স্বাধীনতা কি সহজে এসেছে? না,এটি এত সহজে আসেনি। লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে, লক্ষ মায়ের সন্তান হারানোর কষ্টের বিনিময়ে, লক্ষ বোনের ভাই হারানোর কষ্টের বিনিময়ে আজ এই দেশ স্বাধীন

বছরের পর বছর শোষিত হবার পর ২৬ মার্চ মহামুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। এটি শুধু শোষণ-শাসন থেকে বাঁচার জন্য ছিল না,এই মুক্তিযুদ্ধ ছিল মাতৃভূমির মর্যাদার জন্য। মানুষকে তার অধিকার দেয়ার জন্য।

২৫ শে মার্চের পরই শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। গ্রাম-শহর সব জায়গায় দেশকে স্বাধীন করার প্রচেষ্টা শুরু হয়। দেশটিতে যেন এমন কোনো মাটি নেই যা রক্তে রাঙা হয়নি। এইভাবে যারা দেশকে স্বাধীন করে গিয়েছেন,তাদের জন্য শ্রদ্ধা।

অরিত্র আহমেদ
শিক্ষার্থী, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ
‘মুক্তিযুদ্ধ’ নামের এই ছোট্ট শব্দের মধ্যে কতখানি ব্যাপকতা লুকিয়ে আছে, আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ সামনা-সামনি দেখিনি, তারা এ-সম্পর্কে বড়জোর উপলব্ধিই করতে পারব, অনুভব করতে পারব না চাইলেও। আমরা পাইনি যুদ্ধে যাওয়া স্বজনদের আর না ফিরে আসার অনুভূতি, আমরা প্রত্যক্ষ করিনি রাস্তায় অসংখ্য অর্ধ-গলিত বেওয়ারিশ লাশ পড়ে থাকার সেই ভয়াবহ দৃশ্য, খাকি পোশাকের মিলিটারিদের পশুর দৃষ্টি, তাদের ক্ষুধার্ত কালো রাইফেলের নল। তবে সম্পূর্ণ না হলেও কিছুটা ধারণা করতে পারি মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপকতা সম্পর্কে। ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটি শুনলেই আমার চোখে ভেসে ওঠে অসংখ্য সন্তানহারা বাবা-মায়ের কান্না, বাংলার দামাল সন্তানদের অসাধারণ বীরত্ব, তাঁদের দেশপ্রেম।

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। শব্দসীমার কারণে এখানেই শেষ করছি ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা জানিয়ে।

নাজমুস সাকিব নাফসিন
শিক্ষার্থী, শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজ

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির চেতনার মূল। পাকিস্তানের ২৪ বছর শাসনকালে বাঙালির মধ্যে যে নিজস্ব জাতীয়তাবাদী ও স্বদেশিকতার চেতনা তৈরি হয়, তা মানুষকে স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হবার অনুপ্রেরণা জোগায়। বাঙালির এই চেতনার কাছে হার মানে হানাদার পাক বাহিনী। তবে এর জন্য বাঙালিকে চরম মূল্য দিতে হয়, ৩০ লক্ষ শহিদের রক্ত। মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের নতুন প্রজন্ম কে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন। এবার আমাদের পালা এ দেশকে বিশ্বের দরবারে সমুন্নত করা। মুক্তিযুদ্ধের সেই দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যথার্থ চর্চার মধ্য দিয়েই আমরা গড়ে তুলতে পারি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা।

জয় বাংলা

 

বাংলা ইনিশিয়েটর/ ১০ এপ্রিল ২০১৭ / এসএসকে/জান্নাত

>