প্রচ্ছদ » বাংলাদেশ » “আমাদের কোনো পহেলা বৈশাখ নাই”

“আমাদের কোনো পহেলা বৈশাখ নাই”

নুহিয়াতুল ইসলাম লাবিব | বাংলা ইনিশিয়েটর

বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত নগরী বলতেই প্রথমে ঢাকার নামটিই যেন চোখে ভেসে আসে।তবে সবারই একই অভিযোগ, ৩০২.৪ বর্গকিলোমিটারের এই ঢাকা অন্যতম ব্যস্ত নগরীর পাশাপাশি অন্যতম জ্যামের নগরীও বটে।এই জ্যাম যেন ঢাকার পিছু কিছুতেই ছাড়ছে না, একেবারে আঠার মতো লেগে আছে ঢাকার সঙ্গে।শাহবাগ, ফার্মগেট, মহাখালী, মগবাজার এসব স্থানে গেলেই হদিস মেলে তার।তাই ঢাকাবাসীর মনে এ নিয়ে এক ধরণের দুর্ভোগ যেন সবসময় লেগেই আছে। তবে এই জ্যামের শহরেও কি না নগরবাসীরা কেবলমাত্র ট্রাফিক পুলিশদের কল্যানে যেন একটুখানি হলেও স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারছেন। কেননা একমাত্র তাঁরাই যে রোদ,ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে এই দুর্বিসহ জ্যাম নিরসনে প্রতিদিন সকাল হতে রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

মাথায় একটি নেভিব্লু রঙের ক্যাপ,চোখে কালো সানগ্লাস, মনে হতে পারে চলচিত্রের কোনো নায়কের বিবরণ দিচ্ছি, না চলচিত্রের কোনো নায়ক নন তবে নায়কদের তুলনায় কোনো অংশে কমও নন, বলছি ট্রাফিক সার্জেন্ট তানজিলা আক্তারের কথা।

বেলা ঠিক বারোটা বেজে দশ মিনিট। মাথার উপর তখন চৈত্র মাসের কড়া রোদ যেন জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলছে। দয়াগঞ্জ-মীর হাজারিবাগ-ধোলাইপাড় সড়কের আশেপাশে চলছে যানবাহনের দৌরাত্ম্য। তার মধ্যেই বেশ বিচক্ষনতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেল তাকে। হাত দিয়ে গাড়ি থামার নির্দেশ দেওয়ামাত্রই গাড়িগুলো গুটিসুটি মেরে থেমে গেল। পরক্ষনেই হুইসেল বাজিয়ে সংকেত দিলেন গাড়ি যাবার জন্য। ২০১৫ সালের ৩১ মে থেকে শুরু হয়েছিল তানজিলা আক্তারের এ পথচলা। বেশ চ্যালেঞ্জিং পেশা, আর চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করেন বলেই এখানে আসা। ছোটবেলা থেকেই ইউনিফর্ম পড়ে কাজ করবার এক অদ্ভুত নেশা চেপে বসেছিল তানজিলা আক্তারের মনে। তাই তো ইডেন কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উপর মাস্টার্স শেষ করে এখন একজন মহিলা পুলিশ, বর্তমানে একজন ট্রাফিক হিসেবে কাজ করছেন।

গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর, বর্ষার ঝুম বৃষ্টি এ সবকিছুকে উপেক্ষা করে চাকরির প্রথম দিন থেকে এখন পর্যন্ত বিরামহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। রাত পোহালেই অর্থাৎ সূর্য্যিমামা উঁকি দিতেই শুরু করতে হয় তার ব্যস্তময় জীবন।সকাল ৬ টা থেকে বিকেল ৩ টা পর্যন্ত ক্লান্তিময় এ কাজে এতোটুকু ফাঁকি দেন না কখনোই। তার প্রমাণ সরেজমিনেই দেখা গেল নগরীর ব্যস্ততম দয়াগঞ্জ সড়কে, বেশ অভিজ্ঞ ট্রাফিকের মতোই কাজ করছিলেন তিনি।

আট ভাইবোনের পরিবারে তিনিই সবার ছোট। ভাই-বোনের মাঝে কেউই এধরণের পেশায় জড়িত নয়। কৌতুহলের বশে তাই মাথায় প্রশ্ন এলো বাংলাদেশের মতো প্রেক্ষাপটে বসবাস করেও একজন মহিলা ট্রাফিক হলেন যে ? জানতে চাইলে তিনি বললেন, “সবাই বলতো মেয়ে হয়ে সার্জেন্টের কাজ পারবে না । সারাদিন রাস্তায় ঘুরোঘুরি করতে হবে। তবে সব মেয়েরা তো আর ঘরে চুড়ি পড়ে বসে থাকতে পছন্দ করে না, আর ওরকম জীবন আমার পছন্দ না বিধায় এ দিকটায় আসা”।

নিজের পরিবারকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়া তো দূরের কথা সে কথা কল্পনা করাও যেন এক ধরণের পাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রাফিক পুলিশদের জন্য। প্রতিদিন বিরামহীনভাবে এ কষ্টসাধ্য কাজ করে যাওয়ার কথা তুলতেই তিনি বলে উঠলেন, “আল্লাহর তিনশো পঁয়ষট্টি দিন আমাদের কাজ। আমাদের কোনো পহেলা বৈশাখ, ঈদ-পূজা নাই।প্রতিদিনই ডিউটি করতে হয় আমাদের”।

দিনরাত এই ক্লান্তিকর পরিশ্রমের ফলেও দু বছরের এই ক্যারিয়ারের মাঝেই তার ঝুলিতে জমে গিয়েছে বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা। গাড়ি চালকের লাইসেন্স চেক কিংবা নিয়ম কানুন সংক্রান্ত কারণে প্রায়ই বেশ কিছু যানবাহনকে আটকাতে হয়। কিন্তু সমস্যাটা তখনই ঘটে যখন ক্ষমতাবান মানুষদের বলে অপরাধ করা স্বত্বেও ছেড়ে দিতে হয় গাড়ির চালকদেরকে। শুধু তাই নয় এর জন্য উপর্জুপুরি বেশ কিছু কথাও গিলতে হয়। তাছাড়া পোস্টিং হয়ে যাবার ভয় তো আছেই। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করতে যে পরিমান কষ্ট তার চেয়ে বেশি কষ্ট এতে, এমনটি জানালেন চব্বিশ বছর বয়সী এই তরুণী।

শত কষ্ট স্বত্তেও কোনো এক অদৃশ্য কারণেই হয়তো নিজের বাকি জীবনটাও এ পেশায় থেকে যেতে চান তিনি। এখন পর্যন্ত কোনো প্রকার অসৎ কাজ করার রেকর্ড নেই আমার । ভবিষ্যতেও নিজের ক্যারিয়ারে কোনো প্রকার কালো দাগ যেন না লাগে সেজন্যও বেশ সচেতন থাকি সবসময়। আমাদের নামে সবার অনেক অভিযোগ, তবে সব অভিযোগ যেমন সত্য নয় আবার আমরা সবাইও একেবারে দুধে ধোয়া তুলশী পাতাও নই তবে এ কথা জোর গলায় বলতে পারি চাকরির প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত নিজের শতভাগটি দিয়েই কাজ করে যাচ্ছি আর শেষ পর্যন্তও করে যেতে চাই কেননা আমার কাজের দ্বারা আমি দেশকে সামান্যতম উপকার হলেও করতে চাই।

প্রাপ্তির কথা বলতে গেলে হয়তো বা কিছুই নেই আবার অনেক কিছুই আছে। দিনশেষে হয়তোবা বাড়ি ফিরতে হয় ক্লান্ত পথিকের বেশে, হয়তো ঘামে ভেজা ওই শরীর নিয়ে অন্যদের মতো হাতে বড় বড় মাছ কিংবা গরুর মাংস নিয়ে ঘরে ফেরা হয় না। তবে দেশের জন্য যে কিছু করতে পারছি তাই আমার কাছে অনেক কিছু।

বাংলা ইনিশিয়েটর/১১ এপ্রিল ২০১৭/লাবিব/লাবিব

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।