প্রচ্ছদ » উড়াল » ফিচার » কিভাবে কাটে একজন চা বিক্রেতার পহেলা বৈশাখ ?

কিভাবে কাটে একজন চা বিক্রেতার পহেলা বৈশাখ ?

এইচ.এম.ফায়েকুজ্জামান ফাহাদ, বাংলা ইনিশিয়েটর
 

দৈনিক এক কাপ চা না হলে যেন তৃপ্তি মেলে না কারোই,প্রতিদিন অন্তত এক কাপ চা খান না এমন মানুষ পাওয়া বড্ড কঠিন আজকাল। ইংরেজরা যখন আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলো চা নামক একটি পাণীয়ও পৃথিবীতে বিরাজমান, তখন আমরা তাকে নানানভাবে অস্বীকার করেছি। কিন্তু, এখন এই চা-কে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে নানান রকম ব্যাবসা-বাণিজ্য। এই চা-ই বর্তমানে বাংলাদেশের একটা শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা থেকে প্রতিবছর আয় হচ্ছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। শুধুমাত্র রপ্তানীতেই থেমে নেই এই চা শিল্প। চা-কে কেন্দ্র করে দেশের অনেক বেকার মানুষ সামান্য হলেও কর্মক্ষম হয়েছেন। চা দোকান খুলে আয়-রোজগার করার দ্বারা বেকারত্বও হ্রাস করছেন তারা। রাস্তার পাশে টঙ বানিয়ে, তৈরি করা হয় হরেক রকমের চা, যা বিক্রয়ের দ্বারা আয় করতে সক্ষম হয়েছেন অনেকেই।এরকমই একজন মানুষ হলেন মহিউদ্দিন আহমেদ। শনিড়-আখড়া বাজার থেকে সর্বোচ্চ ১৫০গজ দূরে অবস্থিত তার দোকান। নোয়াখালীর লক্ষীপুর অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করার পর, ৩২ বছরের এই খুদ্র জীবনে তিনি চাকরি করছেন ১৮ বছর যাবৎ। রাতে ব্যাকারিতে কারীগর হিসেবে কাজ করে দিনের বেলা যে অবসর সময় পাচ্ছেন তাতে সামান্য আয়-রোজগার করতেই খুলেছেন এই দোকান।

বিবাহিত জীবনে ২ পুত্র সন্তানের পিতা তিনি। স্ত্রী সহ সন্তানেরা সবাই নোয়াখালীতেই বসবাস করেন। বড় ছেলে মোহাম্মদ রাব্বি (৯) পড়াশোনা করছেন মাদ্রাসার ৩য় শ্রেণীতে। ছোট ছেলে মোহাম্মদ সিয়াম, যার বয়স মাত্র ৩ বছর। মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতেই মাদ্রায় শিক্ষা দান করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

জীবিকার সন্ধানে হাজারো মানুষের মত তিনিও এসেছিলেন ঢাকায়। পরবর্তীতে কাজ শুরু করেন ‘অলিম্পিক ব্যাকারি’ তে। এই দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতির কারণে সামান্য আয়ে যখন পরিবারের খরচ পোষাচ্ছিলো না, তখন ৪মাস আগে তিনি সিন্ধান্ত গ্রহণ করেন চা দোকান খুলবেন। যেই কথা সেই কাজ। খুলে ফেললেন একটা চায়ের দোকান। কিন্তু, যে আয় করার উদ্দেশ্যে দোকানটি খুলেছেন সে আয়ের ছিটেফোঁটাও হচ্ছে না বলে শোনা যায় তার মুখ থেকে। বরং, দৈনিক তাকে ক্ষতি পোহাতে হচ্ছে এই কয়েকমাস যাবৎ।  দৈনিক ১৫০০-২০০০ টাকা বেচা-কেনা হচ্ছে দোকান থেকে। অথচ, দোকানে দৈনিক মাল-সামাল ক্রয় করতেই যাচ্ছে তার থেকে বেশি। আবার, সরকারী জমির উপর দোকান তৈরি হওয়া স্বত্তেও স্থানীয় ক্ষমতাবান লোকদের কাছে দৈনিক ১৩০টাকা করে চাঁদা গুনতে হচ্ছে তাকে। এই বিষয়ে প্রতিবাদ প্রকাশ করেন তিনি।

কথায় প্রচন্ড রকমের আন্তরিকতা লক্ষ্য করা গেলে যখন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা জিজ্ঞেস করা হয় তখন তিনি জানান, “পারিবারিক সমস্যার কারণে ৩য় শ্রেণীর বেশি পড়াশোনা করতে পারি নি। কিন্তু, ছোট বেলা থেকেই বই পড়তে পছন্দ করতাম। সুযোগ পেলেই বই পড়তাম। কিন্তু, ঢাকায় আসার পর আর তেমন বই পড়া হয় নাই। কিন্তু, এখন মোবাইলে অনেক বই আছে। সুযোগ পেলেই ওগুলো নিয়ে বসে পড়ি”।

তিনি জানান, “কবিতা পড়তে বেশি ভালো লাগে। তার সবথেকে বেশি ভালো লাগে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা। তিনি আরো জানান, কবিতা পড়ার থেকে ভালো লাগে তার আবৃত্তি শুনতে।”

তিনি জানান, রাতে ১০ থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত বেকারিতে কাজ করতে হয় তার । তারপর, ফিরে এসে ঘুমিয়ে সকাল ১০টায় দোকান খুলে বসেন তিনি। সারাদিন কাজের মাঝেই থাকা হয় তার। দোকান নিয়ে ব্যাস্ত সময়ের মাঝে ফাঁকা সময় পেলেই দেখা যায় মোবাইলে বই পড়ছেন।

বৈশাখ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “বর্তমান সময়ে বৈশাখ মানেই হল ফুর্তি, আনন্দ। আমি বর্তমানে পহেলা বৈশাখের পক্ষে না। পহেলা বৈশাখের নামে  এখন যেটা চলতেছে তা ভালো না। সংস্কৃতি পালন করবো কিন্তু এতে যেন অন্যের ক্ষতি না হয় সেদিকে আমরা খেয়াল রাখি না”।

তিনি আরো জানান, “গেল বছর বৈশাখে ছেলেদের নতুন কোনো পোশাক দিতে পারি নাই। তাই হয়তো তাদের মনে দুঃখ লাগে। আশেপাশের সবাই যখন আনন্দ করে তাদেরও তো করতে মনে চায়। তাই এইবার চিন্তা করেছি যেভাবেই হোক এই বৈশাখে বাড়ি যাবো এবং ছেলেদের নিয়ে একসাথে সময় কাটাবো।”

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।