প্রচ্ছদ » উড়াল » ফিচার » “পরিবারের আনন্দই আমার কাছে পহেলা বৈশাখ”

“পরিবারের আনন্দই আমার কাছে পহেলা বৈশাখ”

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৭১২:১২:৪৩ অপরাহ্ন

[pfai pfaic=”fa fauser fa-spin ” pfaicolr=”” ] সূচনা পাল | বাংলা ইনিশিয়েটর

পহেলা বৈশাখের কথা ভাবতেই আমাদের চোখের সামনে ফুটে উঠে ঝলমলে সুন্দর একটি দিনের প্রতিচ্ছবি।যে দিনে থাকবেনা কোন দুঃখ,কষ্ট,থাকবেনা কোনো হাহাকার।থাকবে শুধু সুখের সমারোহ আর এক ঝলকানি হাসির স্রোতধারা।তাই এই দিনটিকে ঘিরে বেশ আগে থেকেই সবার মনের মাঝে রংবেরঙের আশা,পরিকল্পনা,স্বপ্ন বাসা বাধে।সবাই সেই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে যে মুহূর্তে কিনা ঘড়ির কাটা ১২ টার দাগ পেরুবে আর সময়ের স্রোত থেকে খসে পরবে পুরোনো একটি বছর। সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই আগমন ঘটবে নতুন বছরের, বর্ষপঞ্জিকায় যোগ হবে আরো একটি বছর।শুরু হয়ে যাবে বাঙালি জাতির প্রানের মহাউৎসব পহেলা বৈশাখ।

পহেলা বৈশাখকে ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,গান-বাজনা।যুবক-যুবতীরা দলে দলে লাল-সাদা শাড়ি/পাঞ্জাবী পরে নেমে পরে রাস্তায়।বাদ থাকেনা বাচ্চা-বুড়ো,বড় কেউই।সবার পরিবারকেই ঘিরে ধরে অনুষ্ঠানের আমেজ।সব মিলিয়ে বেশ এক সুখের মধ্যে দিয়ে কাটে আমাদের পহেলা বৈশাখ।তবে যে ব্যক্তি এই পহেলা বৈশাখের দিনেও নিজের সুখের চিন্তা বিসর্জন দিয়ে তার পরিবারের সুখের কথা ভাবে, তার কাটানো পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে আমরা অনেকেই সন্দিহান ।তিনি আর কেউ নন,আমাদের সবার ঘরের মা। এমনই একজন হলেন অনামিকা পাল।

ঢাকার মুগদা এলাকাতে অনামিকা পালের আবাসস্থান। জন্ম, মাদারিপুর জেলার শিড়ুয়াইল গ্রামে।বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করেছেন প্রায় ২২ বছর পার হয়েছে।তিনি একজন কন্যা সন্তানের মাতা। স্বামী , বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক,যিনি বর্তমানে একটি সরকারী বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন।২০ বছর ধরেই পরিবারের সব সদস্যের প্রতি দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।পাশাপাশি তিনি একজন সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন।সংসারের সকল দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একজন আদর্শ শিক্ষিকা হিসেবে দশভূজার মত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কিন্তু শিক্ষিকার পাশাপাশি তারও একটি সাংসারিক জীবন রয়েছে।শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংসারিক জীবন কেমন কাটছে তা জানতে চাইলে তিনি বললেন,” আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন।আমার যখন বিয়ে হয়েছে,তখন আমার বয়স ১৭ বছর।১৭ বছর বয়সেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছে আমাকে।তখন থেকেই স্বপ্ন দেখেছি সুন্দর,সাজানো গোছানো একটি সংসারের,যে সপ্ন সব মেয়েরাই দেখে।বিয়ের ৩ বছরের মাথায় আমার স্বামীর চাকরি হয় ঢাকায়,বাসা নিয়ে সেখানেই পাড়ি জমাতে হয় আমাকে,গড়ে উঠে আমাদের একক পরিবার।এরপর আমাদের একটি কন্যা সন্তান হয়।সে এবার মাধ্যমিক দিয়েছে।আর্থিক অভাব না থাকা সত্ত্বেও নিজের সম্মান বা পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতেই আমি সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে চাকরি নিই একটি বিদ্যালয়ে।আমার পরিবার এতে আমাকে কোন রকম বাধা প্রদান করেনি,বরং বেশ ভালভাবেই সহায়তা করেছে।“ তিনি আরো জানান ,”বই পড়তে খুব ভাল্লাগে আমার।বইয়ের প্রবল নেশা ছোটবেলা থেকেই ব্যাপক পরিমাণে ছিল আমার।কিন্তু আগেরদিনের মানুষের নারীশিক্ষার প্রতি প্রবল অনুরাগ থাকায় আমার সে ইচ্ছাকে ধামাচাপা দেয়ার ব্যাপক চেষ্টা চলেছিল।যার ফলে আমাকে বই পড়তে হত লুকিয়ে লুকিয়ে।যখন গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ত,তখন হ্যারিকেনের আলোতে লুকিয়ে লুকিয়ে বই পড়তাম আমি।পাতার পর পাতা পড়ে পড়ে রাতের অন্ধকার কাটিয়ে ভোরের আলোর কাছে পৌছে যেতাম আমি।এখনো বই পড়ার নেশা যায়নি আমার।কাজের ফাঁকে অবসর পেলেই বই পড়ি আমি। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর বই আমার খুব প্রিয়”।

কথার মধ্যেই তিনি জানান তার সকাল হয় ভোঁর ৫ টা ৩০ এ।উঠে ঘরের কাজ,রান্নাবান্না করতে করতেই তার সময় হয়ে যায় বিদ্যালয়ের।বিদ্যালয় ছুটি হয় ৪ টায়।ফিরে এসে আবার রান্নাবান্না,পরিবারের সবাইকে হাতে হাতে সাহায্য করা এর মাঝেই সময় কাটে তার। তার পহেলা বৈশাখ কেমন কাটে জানতে চাইলে তিনি বলেন,”বিয়ের পর থেকে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে আমি উপোষ রাখি,সারাদিন সংযম করে উপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করি যাতে নতুন বছর আমার পরিবারের জন্য শুভ হয়,কোনো বাধা বিপত্তি যেন আমার পরিবারকে স্পর্শ না করে।“ তবে তিনি জানান,”বর্তমানে পহেলা বৈশাখকে যেভাবে পালন করা হচ্ছে সেভাবে আসলে করা উচিত নয়।শহর জুড়ে যে আনন্দের বিলাস,তা কেমন যেন শুধু মধ্যবিত্ত ,বড়লোক সম্প্রদায় কেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে,যেখানে পহেলা বৈশাখে সকল শ্রেনীর মানুষের অংশগ্রহণ কাম্য।একশ্রেনীর মানুষ তো তার পরিবারকে সময়ই দিতে পারছেনা,পারছে না ভাল খাবার বা পোশাক দিতে।তাই আমার মতে বর্তমানে যেভাবে টাকা উড়িয়ে ফুর্তি করে পহেলা বৈশাখ পালিত হচ্ছে,সেভাবে পালন না করে যদি টাকাগুলো গরিব-দুঃখীদের দান করা হয় তাহলে হয়ত তারা পহেলা বৈশাখের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতনা।“ এবার পহেলা বৈশাখকে ঘিরে তার পরিকল্পনা জানতে চাইলে তিনি বললেন,”প্রতিবারের মত এবারো আমি উপোষ করব,আমার মেয়ে প্রতিবছরই আমার কথা রাখতেই মূলত পহেলা বৈশাখ পরিবারের সাথে কাটায়।তবে এবার সে বন্ধু-বান্ধবের সাথে বাইরে ঘুরতে যেতে চাচ্ছে।আমার মন টানেনা,হাজার হোক,আমি তো মা।আর ২০১৫ সালে বৈশাখের দিন টিএসএসি চত্বরের ঘটনার কথা মনে পরলেই আঁতকে উঠি।ভেবে হতাশ হই যে আমরা এমন দেশে বাস করি যেখানে মেয়েরা এতটুকু নিরাপত্তাও পায়না।যাই হোক,আমার পহেলা বৈশাখ কাটে পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়ে।পরিবারের সবার জন্য রান্নাবান্না,মেয়েকে শাড়ি পরিয়ে দেওয়া,হাসি-ঠাট্টা আবার কখনো সপরিবারে বাইরে যাওয়া,এভাবেই কাটে আমার পহেলা বৈশাখ।সত্যি কথা বলতে পরিবারের আনন্দই আমার কাছে পহেলা বৈশাখ। প্রতিবারের মত সারাজীবন পহেলা বৈশাখে যেন পরিবারের সাথে এভাবে একসাথে সময় কাটাতে পারি,এটাই আমার চাওয়া”

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।