প্রচ্ছদ » বিনোদন » ‘পাঠশালা’ শুধুমাত্র একটি সিনেমা নয়, এটি একটি আন্দোলন

‘পাঠশালা’ শুধুমাত্র একটি সিনেমা নয়, এটি একটি আন্দোলন

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০১৭১১:৪৭:০২ পূর্বাহ্ন

[pfai pfaic=”fa fa-user fa-spin ” pfaicolr=”” ]  এইচ এম ফায়েকুজ্জামান ফাহাদ ও শাফিন রাহমান

ভিন্ন ধারার গান প্রবর্তনকারী রাজত্ব ব্যান্ডের সদস্য “ফয়সাল রদ্দি” এবার আসছেন তার নিজস্ব গল্প, স্ক্রিপ্ট এবং পরিচালিত চলচ্চিত্র নিয়ে। পরিচালক হিসেবে ফয়সাল রদ্দির পাশাপাশি থাকছেন ‘আসিফ ইসলাম’। আসিফ ইসলাম বাংলাদেশের বাহিরে থাকায় তাকে ছাড়াই করতে শুরু এবং শেষ করতে হয়েছে আমাদের ইন্টারভিউ।

পৌঁছাই “পুরানা পল্টন” তখনই বেঁজে ওঠে ফোনের রিং। ফোনটি হাতে নিতেই দেখি ফয়সাল রদ্দি’র ছবি ভেসে উঠেছে। তারপর, নির্দেশিত ঠিকানা অনুযায়ী পৌঁছাই ‘রেডমার্ক প্রোডাকশান’ এর কার্যালয়ে। ভেতর থেকে অভিজাত ভঙ্গিতে হেঁটে এলেন তিনি। বসতে বললেন আমাদের। এরপর, শুরু হলো আমাদের আলাপ-আলোচনা।

চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশের অনুপ্রেরণা কীভাবে পেলেন?

ছোটবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি আমার আকর্ষণ একটু বেশি ছিল। লেখা-লেখিও করতাম ছোটবেলা থেকেই। বিশেষ করে গান, কবিতা, নাটক ইত্যাদি লিখতাম। আমার লেখা নাটক বেশ কয়েকবার মঞ্চস্থও হয়েছিলো। স্কুলে জীবনে এবং কলেজ জীবনেও নিজেরা থিয়েটার বানিয়ে নিজেই পরিচালনা করেছি অনেক নাটক।

পড়াশোনায় ভালো হবার কারণে বাবা যখন বলতেন ছেলে ডাক্তার হবে। তখনও বুঝে উঠতে পারি নি আমার পথ কোথায়। ডাক্তার হবার জন্যে ভর্তি পরীক্ষা দিই। কীভাবে যেন পরীক্ষায় টিকেও যাই। কিন্তু, ভর্তি হবার বেলায় আমি নেই। তখন বাবা বললেন, আইন নিয়ে পড়াশোনা করতে । অতঃপর, আইন বিষয়ক পড়াশোনা করতে যাই লন্ডনে। পড়াশোনা শেষে ফিরে এসে যখন পেশাদারি উকিল হবার কথা ছিলো তখন তাও করি নি। তখনও বুঝতে শিখি নি আমার কোনটা করা উচিত। কিন্তু এটুকু বুঝি এটা আমার জন্যে নয়। তারপর, শুরু করলাম গান-বাজনা। খুললাম রাজত্ব ব্যান্ড। তখনও সিনেমার প্রতি একটা আলাদা ঝোঁক ছিলো। অবশেষে অনেক আগের পরিকল্পনা করা গল্প “পাঠশালা” নিয়ে শুরু করি প্রথম সিনেমা নির্মানের কাজ।

সিনেমা নির্মাতা হিসেবে পরিচালকের পদটাই কেন বেছে নিলেন?

স্বয়ং আমি একদিন চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে পরিচিতি পাবো তা কখনও স্বপ্নেও ভাবি নি। আগেই বলেছি আমার লেখা অনেক নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। যার বেশিরভাগই পরিচালনা করেছি আমি নিজেই। আমি লক্ষ্য করেছি, আমার মধ্যে একটা ক্ষমতা ছিলো যা কোনো অভিনেতার মধ্য থেকে তার শ্রেষ্ট অভিনয় আমি বের করে আনতে পারতাম। একে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বলে কিনা জানি না। তবে আমার কাছে এটা একজন পরিচালকের ক্ষেত্রে সাধারণ বিষয়।

তবে একটা বিষয় যেটা না বললেই নয়, আমি শুধু মাত্র পরিচালনা করা না পাশাপাশি আমি স্ক্রিপ্ট করি, গান বিষয়ক সকল চিন্তাভাবনা এই ৩টা কাজ আমার। আসিফ ইসলামও আমার মতই ৩টি কাজ করেন।

বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে “পাঠশালা” জাতীয় সিনেমা তেমন আয় করতে পারছে না। তবুও কেন এরকম একটি সিনেমা বানাতে আগ্রহী হলেন?

প্রথমেই বলি, আমরা স্বাধীন নির্মাতা। আমাদের কোনো রকম পিছুটান নেই। যদি এমনটা হতো, কোনো কোম্পানীর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে আমরা সিনেমা বানাচ্ছি তাহলে সেটা হতো অন্য বিষয়। কারণ তারা চায় ব্যাবসায় সফল চলচ্চিত্র। সফল চলচ্চিত্র ও ব্যাবসায় সফল চলচ্চিত্রের মাঝে এক বিশাল পার্থক্য আছে। তখন আমাদের “পাঠশালা” এর মতো সিনেমা নির্মানে এক প্রকারের বাধা পড়তো। আমরা স্বাধীন বিধায়, আমাদের সেরকম আমোদ-প্রমোদ নির্ভর কোনো সিনেমা বানানোর প্রয়োজন পরে না।

আরেকটা কথা, পাঠশালা শুধুমাত্র একটা সিনেমা নয়, এটি একটি আন্দোলন। ‘সব মানিকের জন্য স্কুল চাই’ এরকম একটি বার্তা বাহন করে “পাঠশালা”। এখানে শুধুমাত্র সিনেমার মানিককেই বুঝানো হয় নি। দেশের সব বঞ্চিত শিশুদের প্রতিচ্ছবি হলো পাঠশালা সিনেমার মানিক। আমি মানিককে সব জায়গায় দেখতে পাই।

একটা কথা না বললেই নয়, মানুষ বই পড়ে যতটা না শিখতে পারে তার থেকেও বেশি শিখতে পারে সিনেমা দেখে। সিনেমা আবিষ্কারের পেছনের মূল লক্ষ্য ছিলো শিক্ষাদান। এ ভারতীয় উপমহাদেশের যে প্রথম সিনেমাটি নির্মিত হয়েছিলো তাও ছিলো একটি শিক্ষণীয় চলচ্চিত্র। “পাঠশালা” এর উদ্দেশ্যও একই রকম তাই ব্যাবসা নিয়ে আমরা তেমন কোনো চিন্তা করি নি। তবে সব নির্মাতাই চান তার সিনেমা ব্যাবসা সফলও হবে এবং সফলও হবে।

সত্যি কথা বলতে আমরা সিনেমার ক্ষমতা এখনো বুঝে উঠতে পারি নি। সিনেমার ক্ষমতা এতোই বেশি হতে পারে যে, তা একটি সম্পূর্ণ সমাজকে বদলে ফেলতে পারে। এমন অনেক প্রতিচ্ছবি আমরা দেখেছি আগেও।

পাঠশালা সম্পর্কে সংক্ষেপে সামান্য আভাষ বা সিনেমার মূলভাব যদি আমাদের বর্ণনা করেন

কিছুক্ষণ আগেও বলেছি, পাঠশালা শুধুমাত্র একটি সিনেমা নয়, এটি একটি আন্দোলন। যাতে করে আমরা মানুষের মূল্যবোধ, মানবিকতা সামান্যতম হলেও বিকাশ করার চেষ্টা করেছি।
পাঠশালা একটি ১০বছর বয়সী ছেলে মানিকের গল্প। যার বাবা মারা যান। মাও অসুস্থ্য। এমন সময়ে তার পড়াশোনাও গেলো বন্ধ হয়ে। পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়লো তার কাঁধে। গ্রামের এক বিজ্ঞ লোক তাকে বলে ঢাকা গিয়ে কাজের কাজ কিছু করলে হয়তো সামান্য হলেও আয় করা সম্ভব।

মানিক চলে এলো ঢাকায়। একটি গাড়ির গ্যারেজে কাজ করছে মানিক। সামান্য ১০বছর এর ছেলে সারাদিন কাজ করছে একটি গ্যারেজে। মানিক দুঃখি। তার দুঃখ শুধুমাত্র গ্রাম ছেড়ে এসেছে এ কারণে নয়। তার সবথেকে কষ্টের জায়গা তার স্কুল। যে স্কুলে পড়তো সে, তা ছেড়ে আসতে হয়েছে তাকে।

মানিক আরো কষ্ট পায় যখন সে সকালে গ্যারেজে যাওয়ার সময় দেখতে পায়, তার বয়সী ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। সেই কষ্ট চেপে রাখতে বেগ পেতে হয় তাকে। আর সে কারণেই রাতে বই পরে কষ্ট নিবারণের চেষ্টা চালায় মানিক।
পাঠশালা সিনেমার মূল আকর্ষণ হচ্ছে মানিককে জিততে দেখা। আরো আছে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার একটা উদ্দীপণা জাগিয়ে তোলার অনুপ্রেরণা। সিনেমার ভাষায় যদি বলতে যাই তাহলে বলা চলে “হ্যাপি এন্ডিং”। কীভাবে মানিক জিতবে তা জানতেই দর্শকদের দেখতে হবে “পাঠশালা”।

পাঠশালা নিয়ে আনন্দের বা কষ্টের কোনো স্মৃতি আছে কী?

আনন্দ এবং কষ্ট উভয়ই আছে। খারাপটা দিয়েই শুরু করা যাক।

সিনেমাটি নিয়ে কাজ শুরু করার আগ মূহুর্তে আমাদের উৎসাহিত করেছেন অনেকেই। কিন্তু কাজ যখন শেষ হলো কেউই “পাঠশালা” এর বাণিজ্যিক সফলতা নিশ্চিত করতে পারলেন না। কারণ বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ি এরকম সিনেমা মানুষ গ্রহণ করে না। তাছাড়া, এই ঢাকা শহরে হাতে গোণা কয়েকটি সিনেমা হল ছাড়া “পাঠশালা” আর কথাও চালানো সম্ভব না। কারণ পাঠশালা এর মতো সিনেমার দর্শকগণ নিচুমানের কোনো সিনেমা হলে যাবেন না অবশ্যই।

দেশের প্রতিটি জেলায় যদি সরকার চায় একটী করে সিনেমা হল নির্মান করা কিন্তু সম্ভব। কত কত একর খালি সরকারি জমি পড়ে আছে প্রতিটি জেলায়। সেখানে সরকার চাইলেই প্রতিটি জেলায় নিজ উদ্যোগে সিনেমা হল নির্মান করতে পারেন। বাহ্যিক উন্নয়ন দিয়ে কোনো লাভই হবে না যতদিন না মানুষ ভেতর থেকে উন্নত হচ্ছে। সিনেমাও মানুষকে অন্তর থেকে সুন্দর করে তুলতে পারে।

প্রতিবছরই সরকারি অনুদানে কিছু সিনেমা নির্মান হচ্ছে। মজা ব্যাপার হচ্ছে এসব সিনেমা চালানোর জন্যেও হল পাচ্ছেন না নির্মাতাগণ। অথচ, যদি সরকার নির্মিত হল থাকে তাহলে কিন্তু এ চলচ্চিত্রগুলো ঘুরে ঘুরে সারাবছর চালানো সম্ভব। এতে করে নির্মাতাগণও আগ্রহী হবেন এরকম সিনেমা নির্মাণ করতে।

এবার আনন্দের কথায় ফিরে আসি।

আমি লন্ডনে থেকেছি অনেক অনেক বছর। সেই সুবাদের পরিচয় হয় সেখানকার অনেক নির্মাতার সঙ্গে। তেমনি কয়েকজন-কে ই-মেইলে “পাঠশালা” পাঠাই। এবং বলি এটা একটি বাংলা সিনেমা আপনি দেখুন। ইংরেজি সাবটাইটেলও দিয়েছিলাম।

পাঠশালা দেখে তারা যখন আমাকে রিভিউ লিখে মেইল করে তার মূলভাব ছিলো এরূপ, “It was a pleasure to see your amazing film “Paathshala”. সত্যিকার অর্থেই সেটা ছিলো আমাদের সবথেকে আনন্দের মূহুর্ত এবং আমাদের সবথেকে বড় অর্জনও বটে।

পাঠশালা ২০১৬ সালের নভেম্বরে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু এখনও মুক্তি পেচ্ছে না কেন?
পাঠশালা সিনেমাটি যে ঘরানার , সে রকম সিনেমা মানুষ দেখতে তেমন একটা আগ্রহ দেখায় না যদি না তা কিছু ফিল্ম ফ্যেস্টিভ্যাল ঘুরে না আসে। আমরা গতবছর কাজ শেষ করতে করতে সময় অনেক হয়ে যায়। ফিল্ম ফ্যেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণের সেই সুযোগটাও আমরা হারাই। এটি যখন বুঝতে পারি তাই ২০১৬তে পাঠশালা মুক্তি দেয়া থেকে বিরত থাকি। এ বছর আমরা ইতোমধ্যেই কয়েকটি ফ্যেস্টিভ্যালে পাঠাবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি

কবে আসছে “পাঠশালা”?

কবে আসছে এরকম কোনো সিদ্ধান্ত আমরা এখনো নিই নি। তাই এবার সম্ভাব্য সময় বলে দর্শকদের বিরক্ত করছি না আপাতত। সামনে রোজা আসছে তখন তো অসম্ভব। এরপর ঈদ। তখন নানান বাণিজ্যিক সিনেমা হল দখল করে রাখে। তাই রোজার ঈদ আর কুরবানির ঈদ এই দুই ঈদের মধ্যবর্তী যেকোনো ঠান্ডা সময় দেখে আমরা “পাঠশালা” মুক্তি দেয়ার চেষ্টা করবো।

পাঠশালা” সিনেমাতে আপনার সবথেকে আত্মবিশ্বাসের জায়গা কোনটি?

পাঠশালা মূলত বানানো সেসকল শিশুদের জন্যে যারা দারিদ্রতার কারণে স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না । আমরা “পাঠশালা” তাদের অবশ্যই দেখাবো, যেভাবেই হোক।

এখানে আমার আত্মবিশ্বাসের কথা যদি বলতে যাই তা হল, এই সিনেমাটি দেখলে মানিকের মতো বঞ্চিত ১০জন শিশুর মত অন্তত ৪জন আবার তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী হবে।

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।