প্রচ্ছদ » উড়াল » ফিচার » এই মসলিন,জামদানী আমাদের ঐতিহ্য , আমরা যদি এ পেশা ছেড়ে দেই,তাহলে আমাদের ঐতিহ্য যে মুছে যাবে

এই মসলিন,জামদানী আমাদের ঐতিহ্য , আমরা যদি এ পেশা ছেড়ে দেই,তাহলে আমাদের ঐতিহ্য যে মুছে যাবে

প্রকাশ : ২ মে ২০১৭২:৪২:২৩ অপরাহ্ন

[pfai pfaic=”fa fauser fa-spin ” pfaicolr=”” ] সূচনা পাল, বাংলা ইনিশিয়েটর

প্রাচীণ কালে আমাদের গর্ব ,ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্যতম নিদর্শন ছিল ফুটি কার্পাস নামক তুলা থেকে তৈরিকৃত অতি সূক্ষ্ণ সুতার মসলিন কাপড়।এই চড়কা দিয়ে কাটা এবং হাতে বোনানো মসলিনের জন্য সরবনিন্ম ভাবে ব্যবহৃত হত ৩০০ কাউন্টেরও বেশি সুতা,যার সুবাদে মসলিন কাপড় হত স্বচ্ছ কাঁচের মত।আর এই অতিসুন্দর ও স্বচ্ছ,মিহি কাপড় ব্যবহৃত হত সাধারণত রাজকীয় পোশাক তৈরি করার জন্য।এই মসলিন কাপড় ইতিপূর্বে ঢাকাই মসলিন নামে পরিচিত ছিল।তখনকার দিনেই এই মসলিনের কাপড়ের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পরেছিল দেশবিদেশে।তবে এই মসলিন কাপড়ের বিদায় ঘটেছে বাংলা থেকে উনবিংশ শতাব্দীতেই।

ধারণা করা হয় যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা মসলিন তৈরি বন্ধ করার উদ্দেশ্যে মসলিন বয়নকারীদের হাতের বুড়ো আঙ্গুল উৎখাত করে দিতেন।তবে একথাও কথিত রয়েছে যে তাঁতিদের হাত ব্রিটিশরা নয় বরং তারা নিজেরাই নিজেদের আংগুল কেটে ফেলতেন যাতে করে এই তাঁতের কাজ তাদের আর না করতে হয়।এ কারণেই উনবিংশ শতাব্দীর পর বিলুপ্তি ঘটে মসলিন কাপড়ের।তবে মসলিনের ২৮ রকম ধরনের মধ্যে এখনো রয়ে গেছে জামদানী শাড়ী,যা প্রাচীনকালের মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারিণী হিসেবে রয়ে গেছে বাংলায়।

বর্তমানে এই জামদানী শাড়ীর ব্যাপক চাহিদা ও সুখ্যাতি রয়েছে।যেকনো উৎসব অনুষ্ঠানে বাঙালি নারীদের অত্যন্ত সুপরিচেয় বস্ত্র হল জামদানী শাড়ি। ঢাকাই জামদানী হিসেবেই এ শাড়ি খ্যাত।ঢাকাতে এই জামদানী শাড়ির মূল্য শুরু হয় ১০৫০ টাকা থেকে আর শেষ হয় ৪০০০০ টাকা বা আর বেশি মূল্যে গিয়ে।এই শাড়ীর মূ্ল্য সম্পূর্ণ ভাবে নির্ভর করে শাড়ীর নকশার উপর।যে শাড়ীর নকশা যত বেশি সে শাড়ীর দাম তত বেশি। আর যারা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তাদের হাতের নিপুণতা ফুটিয়ে তুলে এই শাড়ীতে,তাদেরকে আমরা তাঁতি হিসেবেই চিনি। এরা বিভিন্ন ধাপে গুটি থেকে সুতা বের করে,সুতাকে ব্যবহারযোগ্য করে,রঙ করে,শুকিয়ে,তারপর শাড়িতে নকশা তুলে।তাদের এই অসাধারন হস্তশিল্পের সুবাদেই আমরা বর্তমানে নতুন করে ফিরে পেয়েছি জামদানী শাড়ী।সাধারনত এই শাড়ী বুনিয়েই তাতীরা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে।

এমনই একজন তাঁতির সন্ধান পাওয়া যায় সোনারগাঁওতে ।তার সাথে কথা বললে জানা যায় যে তার নাম জহিরুল আলম।বৈবাহিক জীবনে তিনি দুই পুত্র সন্তানের পিতা।তার পরিবার চলে এই তাতীর কাজ থেকে উপার্জিত টাকা থেকে।তিনি তাঁত বুনোয় সোনারগাঁও তাঁত পল্লীতে। বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি জানান,”আমার খানদানি পেশা হইল এই তাঁত বুনানো।মুঘল আমল থেকেই আমার বাপদাদারা এই কাপড় বুনানোর কাজ করতেন।তারা বুনতেন মসলিন কাপড়।তাদের থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে এই প্রতিভা পেয়ছি আমি।বর্তমানে এই তাঁত বুনিয়েই আমার সংসার চলে।আমার বয়স এখন ৬০ বছর।৩০ বছর বয়স থেকেই আমি এককভাবে তাঁত বোনানোর কাজ শুরু করেছি।এর আগে ১৬ বছর বয়স থেকেই আমি আমার বাবার সাথে তাত বুনতাম।কখনো তাকে সুতা তৈরিতে সাহায্য করতাম,কখনও সুতা রঙ করতে।আমার বাবাই আমাকে নিজ হাতে তাঁত বুনান শিখিয়েছিলেন।আবার আমার বাবা শিখিয়েছিলেন তার বাব।বর্তমানে আমার ছেলেও আমাকে তাঁত বুনান,সুতা তৈরি সহ বিভিন্ন কাজে সহায়তা করে।‘’ তার কাজ অনুসারে প্রাপ্ত পারিশ্রমিকের কথা জানতে চাইলে তিনি জানান,’’ আমি জামদানি শাড়ি তৈরির পাশাপাশি তাঁতের শাড়িও বানাই।তবে জামদানী শাড়ি তুলনামূলকভাকবে বেশি বানাই।একএকটি জামদানী শাড়ি তৈরি করতে কখনও আমদের একমাস সময়ও লেগে যায়।তুলা থেকে সুতা তৈরি, সেই সুতা রঙ করা,শুকানো,এরপর হাতের নকশা করা এসব করতে করতে আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়।সে অনুপাতে আমাদের পারিশ্রমিক নিতান্তই অল্প।কারন,যে শাড়িগুলো আমরা এক দেড় মাস বসে বানাই,সেগুলো রজধানী শহরের বর বড় দোকানে বিক্রি হয় প্রায় ৩০০০০/৩৫০০০ টাকায়।কিন্তু আমরা এ টাকার খুবই স্থুলাংশ পাই।তবে এতো আর নতুন কিছু নয় বাংলায়,বাংলার তাঁতিরা তো ব্রিটিশ আমল থেকেই সবসময় শোষিত ।তখনও তার তাদের ন্যায্যমূল্য পায়নি,এখনও আমরা পাইনা।যা পাই,তাতেই আমাদের সংসার টেনেটুনে চালাতে হয়।‘’ এত কষ্ট সহ্য করেও কেন এ পেশায় তারা এখনো রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,”এই মসলিন,জামদানী আমাদের ঐতিহ্য , আমরা যদি এ পেশা ছেড়ে দেই,তাহলে আমাদের ঐতিহ্য যে মুছে যাবে।আর তাছাড়া এই পেশা আমার খানদানী।ভবিষ্যতে আমার ছেলেও এই পেশায়ই কাজ করবে।কারন কাওকে না কাওকে তো আমাদের এই সংস্কৃতি ধরে রাখতে হবে।‘’ তার কথায় প্রচণ্ড রকমের জ্ঞানী মনোভাব এর প্রকাশ পেয়ে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে জানতে চাও্যা হলে তিনি বলেন,” আমি নবম শ্রেনী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছি।আরথিক অভাবের কারনেই ছোটবেলায় আমার পড়ালেখা হয়ে উঠেনি।তবে আমার ছেলেকে আমি শত কষ্টেও পড়ালেখা করাচ্ছি।‘’

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।