প্রচ্ছদ » উড়াল » ফিচার » তবুও মাসফিয়ারা এগিয়ে যায়

তবুও মাসফিয়ারা এগিয়ে যায়

খাতুনে জান্নাত | বাংলা ইনিশিয়েটর

মাত্র সাড়ে ১১ বছর বয়স,অথচ এর মধ্যেই জীবনের প্রবল সব আনন্দ-বেদনার মুহূর্ত পার করে এসেছে মেয়েটা। ক্ষুদ্র একটা জীবনে পাওয়ার পরিধিটা কতই না বড় হয়ে উঠেছে! বলছি ৭ম শ্রেণি পড়ুয়া বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১২ জাতীয় টেনিস দলের দূর্দান্ত খেলোয়াড় মাসফিয়া আফরিনের কথা। ইতোমধ্যেই তারকা বনে গেছে ক্ষুদে এই খেলোয়াড়।

মাসফিয়ার টেনিস খেলার শুরু বাবার হাত ধরে,মাত্র চার বছর বয়সে ২০০৯ সালে। কেনই বা সে খেলাধূলার প্রতি আগ্রহী হলো আর সেই খেলাটাই বা কেন টেনিস হলো তা সে এখন ভেবে বের করতে পারেনা। তবে এখন যে টেনিস তার জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে,তা সে ভালোই বুঝতে পারে।

মাসফিয়ার টেনিস নিয়ে সুখস্মৃতি আছে অনেক। খেলা শুরু প্রথম দিকেই ২০১১ সালে রানার জাতীয় টেনিস টুর্নামেন্টে হয় প্রথম। সেই যে শুরু,এরপর একের পর এক সফলতায় মাসফিয়ার টেনিসের প্রতি প্রবল আগ্রহ শুধু বাড়তেই থাকে। ২০১৬ সালে রানার গ্রুপ আয়োজিত টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন, এটিএন বাংলা কিডস টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন,স্বাধীনতা দিবস জাতীয় টেনিস টুর্নামেন্টে প্রথম রানারআপ এবং ওয়ালটন ফার্স্ট ওপেন টেনিস টুর্নামেন্ট ও ইউরো গ্রুপ টেনিস টুর্নামেন্টে পরপর দুবার চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতে নেয় এই টেনিস তারকা।

ক্লাসে বিভিন্ন বন্ধু এবং শিক্ষকদের কথা বলে মাসফিয়া, যারা প্রচুর অনুপ্রেরণা আর উৎসাহ দেয় তাকে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে এটাও সত্যি, যে তাকে নিরুৎসাহিত করার লোকেরও অভাব নেই। “খেলাধূলা করে কী হবে?” “স্কুলে তো ফেল করবা!” “মেয়ে মানুষ হয়ে এসব ড্রেসআপ যে কতটা খারাপ এটা বোঝো?” এই ধরণের অসংখ্য কথা প্রতিনিয়তই আশেপাশের প্রচুর মানুষের কাছ থেকে শুনতে শুনতে বড় হচ্ছে মাসফিয়া। ভাবতেও অবাক লাগে;এতটুকু একটা মেয়ে যখন দেশকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে সারাক্ষণ বিভোর থাকে তখন তার আশেপাশের মানুষ কীভাবে তাকে উৎসাহ না দিয়ে এরকম অদ্ভুত কথা বলে তার মন ভেঙ্গে দিতে চায় ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা। তবে মাসফিয়ার সহজ সাবলীল কথা, “এসব কথা কখনও পাত্তা দিইনি,দিবও না।”

“স্বপ্ন কী তোমার?” এই প্রশ্ন শুনে মাসফিয়া হেসে বলে, “অসংখ্য স্বপ্ন! এটা তো বলে শেষ করতে পারব না! তবে ভবিষ্যতে খেলার পাশাপাশি এমন কিছু করতে চাই যা দেশের কাজে লাগবে।”

সেরেনা উইলিয়ামসকে আদর্শ মেনে নিজের খেলা চালিয়ে যাচ্ছে মাসফিয়া। খেলাকে কতটা ভালোবাসে তা প্রমাণ হয় যখন সে বলে, “যদি এমন হয় যে জেএসসি পরীক্ষার সময় কোন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট পড়লো,তাহলে অবশ্যই আমি টুর্নামেন্টে যাব। জানি জেএসসি পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ওটা আমি পরেও দিতে পারব। আর এই আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের মাধ্যমে আমি নিজের দেশকে উপস্থাপন করতে পারব। তাই আগে খেলা,তারপর পরীক্ষা। যদিও স্কুলে আমাকে নিয়ে তখন সমালোচনার ঝড় উঠে যাবে!”

মাসফিয়া আমাদের দেশের গর্ব। মাসফিয়ার মতো প্রতিটি খেলোয়াড় প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে চলেছে পুরো বিশ্ব জুড়ে। মরুর দেশের প্রাণহীন করুণ মাটি হোক,আর হোক বরফঢাকা শীতল মাটি-সবজায়গায়ই মেলে ধরছে তারা লাল-সবুজ পতাকা। কিন্তু এতকিছুর পরেও তারা সমালোচনা থেকে বাঁচতে পারছে না। বেশিরভাগ নারী খেলোয়াড় হলে তো কোন কথাই নেই! যদি এতটুকু বয়সেই মাসফিয়া এতসব অদ্ভুত সমালোচনার শিকার হয়ে থাকে, তাহলে অন্য সব নারী আরও কত রকমের সমালোচনার শিকার হয় তা ভাবতেই আতঙ্ক লাগে।

মাসফিয়াদের নিয়ে সমালোচনা চলছেই। চলছে তাদের নিরুৎসাহিত করার নির্মম খেলা। কিন্তু তবুও তারা অদম্যভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এগিয়ে নিচ্ছে এই দেশটাকে। লাল-সবুজ পতাকাকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে তারা,তাদের রুখবে কে?

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।