প্রচ্ছদ » খেলাধুলা » এক যুগ পেরিয়েও রান মেশিন নামেই খ্যাত মুশফিকুর রহিম

এক যুগ পেরিয়েও রান মেশিন নামেই খ্যাত মুশফিকুর রহিম

আবির তাহসিন, বাংলা ইনিশিয়েটর

 

মুশফিকুর রহিম, বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক পরম নির্ভরতার নাম। বাংলাদেশ থেকে যে সকল বিশ্বমানের ক্রিকেটার এসেছেন তার মধ্যে মুশফিকুর রহিমের নামটা থাকবে বেশ উপরের কাতারেই। ৫ ফুট ৪ ইঞ্চির এই ছোটখাটো মানুষটি তার ক্রীড়াশৈলী দিয়ে জয় করেছেন বাংলার  সকল ক্রিকেটভক্তের মন।

১৯৮৮ সালের ৯  মে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বিভাগীয় পর্যায়ে চমৎকার পারফর্মেন্সের মাধ্যমে তিনি নির্বাচকদের নজরে আসেন। ২০০৫ সালের ২৬ মে মাত্র ১৭ বছর বয়সেই বাংলাদেশের ৪১ তম ক্রিকেটার হিসেবে তার টেস্ট অভিষেক হয় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।তবে ক্যারিয়ারের শুরুটা ভালো হয়নি এই উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যানের। জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচের প্রথম ইনিংসে  ১৯ এবং পরবর্তী ইনিংসে করেন কেবল মাত্র ৩ রান। গোড়ালির চোটের কারণে অবশ্য তার এরপর আর ওই সিরিজ খেলা হয় নি।

 

 

টেস্ট অভিষেকের পরপরই ২০০৬ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তার ওয়ানডে অভিষেক হয়। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এ সিরিজেই তিনি তার প্রথম হাফ সেঞ্চুরির দেখা পান। তিনি তার ২য় টেস্ট খেলার সু্যোগ পান ২০০৭ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। সেই ম্যাচে নিজের জাত চেনান মুশফিকুর রহিম। খেলেন ৮০ রানের এক অনবদ্য ইনিংস। যদিও ম্যাচটিতে ইনিংস এবং ৯০ রানের বড় ব্যাবধানে পরাজিত হয় বাংলাদেশ।

২০০৭ সালের বিশ্বকাপে খালেদ মাসুদ পাইলটের স্থলাভিষিক্ত হন তিনি। সেই বিশ্বকাপে তার অপরাজিত ফিফটি এবং সাকিব তামিমের অর্ধশতকে ভারতের বিপক্ষে ৫ উইকেটের বড় ব্যাবধানে জয় পায় বাংলাদেশ। ২০০৯ সালে মুশফিকুর রহিমকে বাংলাদেশের সহ অধিনায়ক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। ২০১০ সালে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচে আবার নিজের যোগ্যতার জানান দেন তিনি। সেদিন তিনি তার প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির দেখা পান। মাত্র ১১২ বলে করা সেই সেঞ্চুরি আবার বাংলাদেশীদের মধ্যে টেস্টে দ্রুততম। একই বছর ফেব্রুয়ারিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হোম সিরিজে তিনি হন বাংলাদেশের পক্ষে ২য় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। প্রথম টেস্টে তিনি মাত্র ৬ষ্ঠ বাংলাদেশি হিসেবে ২ ইনিংস এই করেন অর্ধশতক। সেকারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের মাটিতে মুশফিকের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা ছিল বাংলাদেশের। যদিও তা মেটাতে তিনি পুরোপুরি ব্যার্থ হন। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে তার বদলে তামিম ইকবাল কে সহ অধিনায়ক পদে নিযুক্ত করা হয়

 

২০১১ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের মতো মুশফিকুরের পারফর্মেন্সও ছিল গড়পরতা। তাই অনেকেই মনে করেছিলেন তাকে দল থেকে বাদ দেওাটাই সমীচীন। তবে নির্বাচকরা তার প্রতি আস্থা রাখেন। সে আস্থার প্রতিদান হিসেবে হিসেবে তিনি আগস্ট মাসে জিমাবুয়ের বিপক্ষে ১০০ বলে ১০১ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস উপহার দেন।

 

২০১১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জিম্বাবুয়েতে খারাপ পারফর্মেন্সের পর সাকিব আল হাসাঙ্কে অধিনায়ক পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে মুশফিকুর রহিমকে অধিনায়ক করা হয়। অক্টোবর মাসে তিনি অধিনায়ক হিসেবে তার প্রথম ম্যাচ খেলেন। যা তিনি স্মরণীয় করে রাখেন ম্যান অফ দা ম্যাচ হওয়ার মাধ্যমে। সে ম্যাচে তিনি করেন ২৬ বলে ৪১ রান যা বাংলাদেশের জয়ের মূল জ্বালানি। ওয়ানডে সিরিজ হারলেও মুশফিক ছিলেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। একটি মাত্র টি টোয়েন্টিতে তার অধিনায়কত্বে জয়লাভ করে বাংলাদেশ। নভেম্বর মাসে পাকিস্তান বাংলাদেশে ৩ টি ওয়ানডে এবং ২ টি টেস্ট খেলার জন্য আসে। যদিও সেই সিরিজে মাত্র ১২ রান  করতে পেরেছিলেন ক্যাপ্টেন মুশফিকুর রহিম।

 

মুশফিকুরের অধিনায়কত্বে বাংলাদেশের সেরা সাফল্য আসে ২০১২ সালের এশিয়া কাপে। সেবার প্রথমবারের মতো কোনো বৈশ্বিক আসরের ফাইনালে পৌছায় বাংলাদেশ।  গ্রুপে ভারতের ছুঁড়ে  দেয়া ২৯০ রানের কঠিন টার্গেটে ব্যাট করতে নামলে  মুশফিকুর রহিমের মাত্র ২৫ বলে ৪৫ রানের ইনিংসের সুবাদে শচীন টেন্ডুল্কারের শততম সেঞ্চুরির আনন্দ মাটি করে দিয়ে ম্যাচটি জিতে নেয় বাংলাদেশ। ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে বিতর্কিত শেষ ওভারে মাত্র ২ রানে হেরে রানার্স আপ হয় বাংলাদেশ।

 

২০১৩ সালের ১১ মার্চ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৯০ রানের ইনিংস খেলেন আশরাফুল। ওই দিনই সেই রেকর্ড ভেঙে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করার গৌরব  অর্জন করেন মুশফিকুর রহিম। তাদের ব্যাটিং বীরত্বে ম্যাচটি ড্র করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। তার নেতৃত্বে সফলতম সিরিজ খেলে বাংলাদেশ ২০১৩ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে। বাংলাদেশ দুটি টেস্টেই ড্র করে। ৩ টি ওয়ানডে জিতে নিউজিল্যান্ডকে “বাংলাওয়াশ” এর স্বাদ দেয়। তবে একটি মাত্র টি টোয়েন্টিতে হেরে যায়।

২০১৪ সালটা বাংলাদেশের জন্য যেমন তেমনি মুশফিকের জন্যও কাটে দুঃস্বপ্নের মতো। তার নেতৃত্বে একের পর এক ম্যাচ হারতে থাকে বাংলাদেশ। ওয়ানডে তে প্রায় পুরোটা বছরই জয়হীন থাকে। দুটো টি টয়েন্টিতে জয়লাভ করলেও হেরে যায় দুর্বল হংকং এর কাছে। তবে ওই বছরই তিনি করেন তার তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি। যদিও বাংলাদেশ হেরে যায়। এমতাবস্থায় ২০ সেপ্টেম্বর বিসিবি মুশফিকুর রহিমকে ওয়ানডে এবং টি টোয়েন্টি অধিনায়কত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়। তার জায়গায় অধিনায়কত্ব পান মাশরাফি বিন মুর্তজা। তবে টেস্টে তার নেতৃত্ব বহাল থাকে।

 

২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা পারফর্মার হন। আফগানিস্তানের বিপক্ষে করেন ৭১ রান। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মুশফিক এবং মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ৫ম উইকেটে রেকর্ড ১৪১ রানের পার্টনারশিপ করেন। সেই ম্যাচে মুশফিক আউট হন ৮৯ রান করে। তবে রিয়াদ ঠিকই সেঞ্চুরি করেন। তাদের ব্যাটিং এবং রুবেল হোসেনের জাদুকরী বোলিং ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে বাংলাদেশ। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে বিতর্কিত আম্পায়ারিং এর স্বীকার হয়ে হারতে হয় বাংলাদেশকে। এছাড়া ২০১৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে মুশফিক করেন ১০৬ রানের এক অনবদ্য ইনিংস। যার ফলে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম সিরিজ জয় পায় বাংলাদেশ।

 

 

বাংলাদেশ তাদের টেস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে মর্যাদার জয় পায় ২০১৬ সালে দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। সিরিজের ২য় টেস্টে তাদের বিপক্ষে ১০৮ রানের বড় জয় পায় বাংলাদেশ। যে জয়ে অসামান্য অবদান রাখেন মুশফিকুর রহিম। ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে করেন ১৫৯ রান। সাথে সাকিবের ডাবল সেঞ্চুরিতে প্রথম ইনিংসে ৫৯৫ রান তুল্র হেরে যায় বাংলাদেশ। ফেব্রুয়ারিতে ভারতের বিপক্ষে যখন সব ব্যাটসম্যান রান করতে ব্যার্থ তখন মুশফিকুর রহিম একা হাতে দলকে টেনে নিয়ে যান। সেই ম্যাচে ৮৯ রানের এক ইনিংস খেলেন বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক। যদিও সে ম্যাচে শেষ পর্যন্ত  দলকে জেতাতে পারেন নি।

 

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শততম টেস্ট জয়ে উইকেটের পিছনে গ্লাভস হাতে এবং ব্যাট হাতে দুর্দান্ত পারফর্মেন্সের ঐতিহাসিক সেই জয়েও অবদান কম নয় মুশফিকের। এছাড়া সাম্প্রতিক ত্রিদেশীয় সিরিজে  শেষ ম্যাচেও অর্থাৎ  ২৪ মে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৬ বলে ৪৬ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে বাংলাদেশের জয়ে অবদান রাখেন তিনি। যে জয়ের ফলে প্রথমবারের মতো শ্রীলঙ্কাকে টপকে ৬ নম্বরে ওঠে বাংলাদেশ।

 

ক্যারিয়ারে বিভিন্ন উত্থান পতন ছিল দীর্ঘ বারো বছরের এ ক্যারিয়ারে, তবুও এখন পর্যন্ত মিস্টার ডিপেন্ডেবল তকমাটা লেগে আছে তাঁর নামের পাশেই। বাংলাদেশের সবচেয়ে নিখুঁত ব্যাটসম্যানের খেতাবটিও পেয়েছেন বেশ কয়েকবার।

এ পর্যন্ত খেলা ৫৪ টেস্টে ৩৫.৬৮ গড়ে করেছেন ৩২৬৫। অন্যদিকে ১৭২ ওয়ানডেতে ৩১.৮৪ গড়ে তার রান ৪২৮৪ রান এবং ৫৯ টি টোয়েন্টিতে ২৭.২৮ গড়ে করেছেন  ৭২৬ । উইকেটের পিছনে গ্লাভস হাতেও তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল। এ পর্যন্ত তিন ফরম্যাট মিলিয়ে মোট ২৫৩ টি ক্যাচ এবং ৭৫ টি স্টাম্পিং করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি টেস্ট ব্যাটসম্যানদের র‍্যাংকিং এ ২৪ নম্বরে, ওয়ানডেতে ২৩ এবং টি টোয়েন্টিতে ৮৪ নম্বরে অবস্থান করছেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিনি আরো পরিণত হচ্ছেন।

আজ, ২৬ মে তিনি তা ক্যারিয়ারের ১২ বছর শেষ করে ১৩ বছরে পা রাখবেন। এই দীর্ঘ সময়ে হয়েছেন অনেক রেকর্ডের অংশীদার ।তবে  তার একটি বড় বৈশিষ্ট হলো তিনি চাপের মুখেও ভেঙে পরেন না। এ বছর বাংলাদেশের  টেস্ট ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তার রান ২য় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের অন্যতম নির্ভরতার প্রতীক ডানহাতি এ ব্যাটসম্যান , শুধু এক যুগ নয় আরো অনেক বছর বাংলাদেশ দলকে এভাবেই সার্ভিস দিয়ে যাক এমনটাই প্রত্যাশা বাংলাদেশ দল এবং বাঙালি সকল ক্রিকেট ভক্তদের।

 

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।