প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » সম্পাদকীয় » দেবী থেমিস কিংবা আমাদের ঠুনকো অনুভূতি

দেবী থেমিস কিংবা আমাদের ঠুনকো অনুভূতি

 কাজী মোয়াজ্জমা তাসনিম

গ্রীক পুরাণের ১২ জন টাইটানের একজন থেমিস। স্বর্গীয় আইন কানুন ও ন্যায়বিচারের দেবী। সম্প্রতি হেফাজতে ইসলাম নামক একটা ধর্মব্যবসায়ী দলের দাবির মুখে সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গন থেকে এই থেমিসের আদলে তৈরি করা ভাস্কর্যটা সরিয়ে ফেলায় পক্ষে বিপক্ষে নানা মতের তৈরি হয়েছে। চলুন বিষয়টা একটু খতিয়ে দেখি।

থেমিসের বিষয়টা আপাতত তোলা থাক। আগে চলুন জেনে নেই ভাস্কর্য কী। জ্বী না জনাব। ভাস্কর্য কোন পূজনীয় বস্তু নয়। এটা নিছক একটা শিল্পকর্ম। চিত্রকলা, নকশিকাঁথা, জামদানি, মৃৎশিল্পের মতই এটাও নিরীহ একটা শিল্প। কখনো কখনো এই শিল্পকর্ম গূঢ় কোন অর্থ বহন করে। ভাস্কর্য নির্মিত হতে পারে কোন মহৎকর্ম স্মরণে, হতে পারে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে, হতে পারে প্রতীকী, হতে পারে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে, হতে পারে ঐতিহাসিক, হতে পারে পৌরণিক। অপরদিকে পূজা হল বিশেষ ধর্মাবলম্বীদের উপাসনার মাধ্যম। আবার অনেকেই একে শিরক বলে। অথচ শিরক বলতে বোঝায় যখন সৃষ্টিকর্তার সাথে অন্য কোন কিছুর তুলনা করা বা অন্য কোনকিছুকে সৃষ্টিকর্তার সমকক্ষ মনে করা। অর্থ্যাৎ পূজা কিংবা শিরক, যে কোনটাই হতে চাইলে একে কোন না কোনভাবে ধর্ম কিংবা সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্কিত হতে হবে। অথচ ভাস্কর্যের সাথে ধর্মের দূরবর্তী সম্পর্কও নেই। তবুও একটা শ্রেণির বরাবরই এই শিল্পকর্মের ব্যপারে ধর্মকে টানাহেঁচড়া করাটা উদ্দেশ্যপ্রনোদিত ছাড়া আর কিই বা হতে পারে?

ভাস্কর্য কিন্তু শুধু বাংলাদেশে আছে তা কিন্তু নয়। অনেক মুসলিম প্রধান দেশেই ভাস্কর্য রয়েছে। সৌদিআরব, ইরাক, ইরান, সিরিয়া, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার সহ আরো বিভিন্ন মুসলিম প্রধান দেশেই ভাস্কর্য রয়েছে। তাতে কিন্তু তাদের ধর্মানুভূতি আহত হয়নি।

জাস্টিসিয়া ভাষ্কর্য , যা এখন আর নেই

আসুন আমরা আবার থেমিসে ফিরে আসি। থেমিসের ভাস্কর্যের সাথে ন্যায়বিচারের সম্পর্ক কী সেই প্রশ্ন আসতেই পারে। না। আসলে থেমিসের ভাস্কর্যের সাথে ন্যায়বিচারের কোন সম্পর্ক নেই। ওটা স্রেফ ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে ওখানে বসানো হয়েছিল। থেমিসের ভাস্কর্য সরানোর কারণে দেশ থেকে ন্যায়বিচার উঠে গিয়েছে বিষয়টা কিন্তু আসলে সেরকম না। থেমিসেরা কোনদিন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে প্রশাসন। এটা আপনি যেমন বোঝেন, আমরাও বুঝি।

জনাব, আপত্তিটা কিন্তু আসলে “থেমিসের ভাস্কর্য সরানো” নিয়ে না। যদি সেটাতে আর্কিটেকচারাল কোন ত্রুটি থাকত, যদি এমন হত ভাস্কর্যটা হয়তোবা সেখানে অপ্রাসঙ্গিক বা বেমানান, কিংবা অন্য যে কোন কারণ- কেউ কিন্তু আপত্তি করত না। আপত্তিটা আসলে “ভাস্কর্য সরানোর কারণ” নিয়ে। হেফাজতে ইসলাম নামক একটা প্রতিক্রিয়াশীল দল দাবি করল ভাস্কর্যটা তাদের “ধর্মানুভূতি” তে আঘাত করেছে। সরকার অমনি তাদের কথায় সায় দিয়ে ভাস্কর্যটা সরিয়ে দিল। প্রশাসন কিন্তু পক্ষান্তরে এই চরম সাম্প্রদায়িক দলটাকেই প্রশ্রয় দিল। আপত্তিটা আসলে এখানেই।

এর আগেও আমরা দেখেছি এই দলটার কথামত প্রশাসন পাঠ্যবইয়ে বিশাল রদবদল ঘটালো। পাঠ্যবই থেকে অমুসলিম লেখকদের লেখা বাদ দিয়ে পাঠ্য বইয়ের ইসলামিকরণ করা হল। এই যে লেখাগুলো বাদ দেওয়া হল, এই লেখাগুলো যদি অখাদ্য হত, শিশু- উপযোগী না হত তাহলে কিন্তু কেউ আপত্তি করত না। কিন্তু থেমিসের ভাস্কর্য কিংবা পাঠ্যবইয়ে অমুসলিমদের লেখা- দুটো অপসারণের প্রধান কারণ হল হেফাজতে ইসলাম নামক সাম্প্রদায়িক দলটাকে প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন করা। যেটা অবশ্যই বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিপন্থী।

সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার পেছনের রাজনৈতিক কারণ বিশ্লেষণে আমি যাব না। সেজন্য বড় বড় রাজনৈতিক বিশ্লেষক- গবেষক আছেন। তবে সাপ কিন্তু কখনো পোষ মানে না জনাব। সময়মত বিষদাঁত ভেঙে না দিলে যতই দুধ কলা দিন না কেন, ঠিক আপনার বুকেই ছোবল বসিয়ে দেবে একদিন। আর এই কথাটা বোঝার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হতে হয় না।

৩০ লক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ মা বোনের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলাদেশ। এই দেশ যেমন একজন মুসলমানের, তেমনই একজন হিন্দুর। এই দেশ বৌদ্ধের, খ্রিস্টানের। এই দেশ সাঁওতাল, গারো, চাকমা, মারমা, মনিপুরীদের। এই দেশ বাঙালীদের, এই দেশ অবাঙালীরও। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাতি, দল, মত নির্বিশেষে প্রত্যেকটা নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে এদেশের প্রত্যেকটা ধূলিকণার উপর। সংবিধান তাদের সেই অধিকার দিয়েছে। শুধুমাত্র সংখ্যাগুরুত্বের দোহাই দিয়ে এদেশকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের আবাসস্থল বানিয়ে বাকিদের অচ্ছুৎ ঘোষণা করা যাবে না। হাজার বছরের যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে আসছে এদেশের মানুষ, ক্ষমতার লোভে সেটাকে সাম্প্রদায়িকতার কালো চাদরে ঢেকে দেওয়ার যে অপচেষ্টা চলছে সেটাকে সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করতে হবে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া মাটিকে অন্ধকারের আবাসস্থল হতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই।

লেখকঃ শিক্ষার্থী ও সমাজকর্মী

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ইনিশিয়েটর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ইনিশিয়েটর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।