প্রচ্ছদ » উড়াল » ফিচার » স্টেশন ঘিরে জীবন চলে

স্টেশন ঘিরে জীবন চলে

খাতুনে জান্নাত, বাংলা ইনিশিয়েটর

কেউ হাঁটছে,কেউ ছুটছে আবার কেউ অলসভাবে বসে আছে। বেশিরভাগ মানুষের চোখেমুখে ব্যস্ততার ছাপ। কিছু কিছু হকার আবার সেই নির্লিপ্তভাবে সেই ব্যস্ততা দেখছে আর কিছুক্ষণ পরপর হাঁক দিচ্ছে, “প্রথম আলো,ইত্তেফাক,কালের কন্ঠ,যুগান্তর,মানবজমিন….. “।

জায়গাটি কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন। যেখান থেকে বিশাল ট্রেন হাজার হাজার মানুষকে বুকে নিয়ে পাড়ি দেয় শত শত মাইল। শুধু যে বহুদূর পাড়ি দেয়ার জন্য যাত্রীরাই এই স্টেশনে আসে তা নয়;বিশাল ট্রেন যেমন বুকে তুলে নেয় হাজার হাজার যাত্রী,বিশাল স্টেশন তেমন করেই যাত্রীর সাথে নিজ বক্ষে ধারণ করে অসংখ্য ফেরিওয়ালা,কুলি,হকারকে। স্টেশনকে ঘিরেই চলে যাদের জীবন।

দেখতে বেশ ছোটখাটো। মুখে হাসি লেগেই আছে। স্টেশনের একপাশে বসে চকোলেট,ক্যান্ডি,ওয়েফার-এসব বিক্রি করছে। নাম মোঃ অনিক হাসান আকাইদ। বয়স ১৫ বছর। বয়স জানার পর একটু কৌতুহলী হয়ে তাকালাম ছেলেটার দিকে। সাধারণ একটা শার্ট আর লুঙ্গি পরা। দেখে একটু বড় মনে হয়। তবে তার কথাবার্তা বলার ধরণ মুগ্ধ হওয়ার মতো। প্রায় প্রমিত ভাষায়ই গুছিয়ে কথা বলছে। স্কুলে যায় নাকি জিজ্ঞেস করতেই দাঁত বের করে হেসে বলল, “এবার জেএসসি দিব”। আকাইদের গ্রাম কিশোরগঞ্জে। কিশোরগঞ্জের এক গ্রামেই দুরন্ত আকাইদের শৈশব কেটেছে আর পাঁচটি গ্রাম্য শিশুর মতোই। সাত ভাই-বোনের মধ্যে আকাইদই সবার ছোট। কৃষক বাবা নিজের আর্থিক অচ্ছলতার কথা জেনেও দেখেছিলেন প্রতিটি ছেলে-মেয়েকে শিক্ষিত করে তোলার সাহসী স্বপ্ন। সবার ক্ষেত্রে সে স্বপ্ন সত্যি না হলেও আকাইদের বড় ভাই বাবার স্বপ্ন পূরণ করে। পড়াশোনা শেষ করে এবার সে বিসিএস পরীক্ষা দেবার অপেক্ষায়।

কিশোরগঞ্জেই আকাইদের পড়াশোনার শুরু। হেসে হেসে সে বলে, “পড়াশোনা করতে একদম ভালো লাগতো না”। এই ভালো না লাগার কারণেই দু’বছর আগে ক্লাস এইটে উঠেই ঢাকায় বড় ভাইয়ের কাছে চলে আসে আকাইদ। ভেবেছিল আর লেখাপড়া করার দরকার নেই,এবার একটা কাজ জোগাড় করে নিজের দায়িত্ব নিজে নেবে। আফসোসের সঙ্গে বলে সে, “মা,বাবা,বড় ভাই-সবাই নিষেধ করছিলো। তারা চাইছিলো লেখাপড়া করি। কিন্তু শুনলাম না তাদের কথা।” ঢাকায় এসে আকাইদের এই নিষ্ঠুর জীবনের শুরু। মাত্র দু’বছরে কত অভিজ্ঞতা! কখনো ভালো বিক্রি হয় আবার কখনো হয়ই না। কোন কোন মানুষের দুর্ব্যবহারে মাঝেমাঝেই তার মনে হতো এই জীবনের কোন মূল্য নেই। সবচেয়ে বড় কথা,যখন কোন কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়,তখন তার জন্য জীবন চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তার বড় ভাই নিজের জন্য সামান্য ব্যবস্থা তো করতেই হিমশিম খায়,তারটা কী করে করবে? আকাইদ বলে, “খুব খারাপ লাগত। তখন বুঝেছি লেখাপড়ার মূল্য কী। লেখাপড়া না করলে এভাবে ফেরি করেই জীবন কাটাইতে হবে। কিন্তু এই জীবনের মূল্য কী? তাই এবার স্কুলে ভর্তি হয়ে গেছি।” আকাইদের মুখে খেলা করে রাজ্যজয়ের হাসি।

সকাল ৬ টা থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত একটানা ফেরি করে সে। আবার দুপুরের খাবার খেয়ে দুপুর ২ টা থেকে সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত কাজ। বাসায় গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসা। এভাবেই এখন চলছে আকাইদের জীবন। শুনছি আকাইদের কথা। এমন সময় দেখি সব ফেরিওয়ালা দৌড়ে পালাচ্ছে। কী হলো আকাইদকে জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারি অফিসার এসেছে। এখানে এখন তারা বিক্রি করতে পারবে না। মলিন হাসি দিয়ে আকাইদ বলে, “চইলা যাইতে হবে।” আকাইদ চলে যায়। আমি তাকিয়ে থাকি। এটা শুধু আকাইদের গল্প নয়।

আরো অনেক মানুষের আছে এরকম গল্প। এই জায়গাটা শুধু একটা স্টেশন নয়,একটা আস্ত গল্পের বই। এর প্রতি পাতায় থাকে এরকম অসংখ্য আকাইদদের গল্প। তাদের গল্পগুলো সবসময় আমাদের চোখের অন্তরালেই থেকে যায়। আমরা দ্রুত দৌড়াই ট্রেনের পেছনে আর তারা দৌড়ায় জীবনের ট্রেনের পেছনে। এত দৌড় দৌড় খেলায় আমাদের সময় কই অন্যের গল্প পড়ার? ট্রেন তো মিস হয়ে যাবে!

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।