প্রচ্ছদ » সাইন্স ভিউ » বিজ্ঞান ফিচার » প্লুটো কি আসলে কোন গ্রহ?

প্লুটো কি আসলে কোন গ্রহ?

 ফারহান ইশরাক | বাংলা ইনিশিয়েটর

সৌরজগতের অন্যতম রহস্যময় ও বিতর্কিত একটি গ্রহ হল প্লুটো। অবশ্য এটি গ্রহ নাকি “অগ্রহ” সেটা নিয়েই আজকের লেখা। একটা সময় পর্যন্ত সৌরজগতের গ্রহ হিসেবেই স্থান ছিল প্লুটোর। কিন্তু পরবর্তীতে, যথাযথভাবে বললে ২০০৬ সালে প্লুটোকে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহ তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। যদিও প্লুটো গ্রহ থাকবে কি থাকবে না সেই বিতর্ক এখনো শেষ হয় নি। কিছুদিন পূর্বেও প্লুটোকে পুনরায় গ্রহ হিসেবে অন্তুর্ভুক্ত করা হবে কিনা তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্লুটো গ্রহের মর্যাদা ফিরে পায় নি। এটি এখন একটি বামন গ্রহ হিসেবে সৌরজগতের সদস্য।

প্লুটো গ্রহ নাকি ‘অ’গ্রহ তা জানার জন্য প্রথমে জানতে হবে গ্রহ হিসেবে তার আবিষ্কারের ইতিহাস। Percival Lowell নামক একজন বিজ্ঞানী ১৮৯৪ সালে সৌরজগতের একজন সম্ভাব্য নবম সদস্যের কথা বেশ গুরুত্বের সাথে প্রচার করতে শুরু করেন যাকে তিনি Planet X নাম দিয়েছিলেন। সেই সূত্র ধরে ১৯০৯ সালে তিনি এরকম একটি গ্রহের সম্ভাব্য কো অর্ডিনেট ও ভবিষ্যদ্বাণী করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার জীবদ্দশায় তিনি এধরনের কোন গ্রহের সন্ধান দিয়ে যেতে পারেন নি। যদিও তার মৃত্যু হয় ১৯১৬ সালে, মজার ব্যাপার হচ্ছে ১৯১৫ সালের ই ১৯ মার্চ এবং ৭ এপ্রিল ওই একি কো অর্ডিনেটে প্লুটোর দুইটি ছবি ধারন করা হয়েছিল কিন্তু ছবিগুলো তেমন পরিষ্কার না হওয়ায় বিজ্ঞানিরা বেশিদূর এগুতে চান নি। বলা বাহুল্য, এ সবি লোয়েলের অজ্ঞাত ছিল।

তার মৃত্যুর পর প্ল্যানেট এক্স কে নিয়ে গবেষণা বেশ থিতিয়ে যায় এবং তা আবার পুনরুজ্জীবিত হয় ১৯২৯ সালে, যখন Clyde Tombaugh একজন রিসার্চার হিসেবে লোয়েল অবজারভেটরিতে যোগ দ্যান। তিনি লোয়েলের ভবিষ্যদ্বাণীর সূত্র ধরে তার গবেষনা চালিয়ে যান এবং ১৯৩০ সালের ১৮ ফ্রেব্রুয়ারী ,ওই কো অর্ডিনেটে একটি প্ল্যানেট লাইক অব্জেক্টের গতিবিধি থেকে তিনি নিশ্চিত হন যে আসলেই Planet X এর অস্তিত্ব রয়েছে। সেই সময়ে এ খবরে বেশ হই চই পড়ে যায় এবং সৌরজগতের নবম গ্রহের আবিষ্কারক হিসেবে Clyde Tombaugh ইতিহাসে স্থান করে নেন। অনেক যাচাই বাছাই এর পর গ্রহটির নাম প্লুটো নির্ধারন করা হয়।

এ যাবত সব ঠিক ছিল। বিপত্তি বাধল ১৯৯২ সালে এসে, যখন প্লুটোর আশেপাশেই প্লুটোর মত আরও অনেক অব্জেক্টের সন্ধান পাওয়া গেল। প্লুটো সৌরজগতের যে অংশ জুড়ে আনাগোনা করে তাকে বলা হয় কাইপার বেল্ট ( Kuiper Belt) । এই কাইপার বেল্টেই আনাগোনা করছে প্লুটোর মত আরও হাজারো ছোট ছোট icy অব্জেক্ট । তখন থেকেই সন্দেহের শুরু। তাহলে কি প্লুটো আসলেই কোন গ্রহ নয়? Clyde এর আবিষ্কার শুধুই একটি কাকতালিয় ঘটনা? সন্দেহ ঘনীভূত হল যখন ২০০৫ সালেই আবিষ্কৃত হল এরিস নামক আরেকটি মাইনর প্ল্যানেট যার ভর প্লুটোর চেয়েও বেশি। তাহলে হয় প্লুটোকে মাইনর প্ল্যানেটের ( মাইনর প্ল্যানেটঃ নাম প্ল্যানেট হলেও আসলে কোন গ্রহ নয়, কিন্তু এমন একটি অব্জেক্ট যা সরাসরি সূর্যকে অরবিট করছে যেমন – গ্রহানুপুঞ্জ, ট্রোজানস ইত্যাদি ) অন্তর্ভুক্ত করতে হবে নয়ত এরিস কে দশম গ্রহের সদস্যপদ দিতে হবে।

সকল সন্দেহের অবসান ঘটিয়ে ২০০৬ সালে International Astronomical Union (IAU) ‘গ্রহ’ জিনিসটার তিনটি বাধ্যতামূলক ক্রাইটেরিয়া নির্ধারন করে দেয়। এগুলো হচ্ছেঃ
১। সরাসরি সূর্যকে প্রতক্ষিন করতে হবে।
২। বস্তুটির ভর এমন হতে হবে যেন তার মাধ্যাকর্ষনের ফলে তার আকৃতি গোলাকার ধারন করে।
৩। তার নিজের অরবিটাল জোনে তাকে Gravitationally Dominant হতে হবে, অর্থাৎ তার প্রতিবেশিদের মাঝে কেউ তার সমপর্যায়ের হতে পারবেনা। ( একে এক কথায় Clearing the neighborhood বলে )
এর ফলে কাজ খুব সহজ হয়ে গেল, প্লুটো প্রথম দুইটি চাহিদা পূরন করতে পারলেও তিন নাম্বারে এসে ধরা খেয়ে গেল। IAU ও সাথে সাথে প্লুটোর সদস্যপদ কেড়ে নিয়ে তাকে বামন গ্রহ বা dwarf planet হিসেবে আখ্যা দিয়ে দিল। ফলশ্রুতিতে প্লুটোর স্থান হল মাইনর প্ল্যানেট লিস্টে।

এই ঘোষনার সাথে সাথে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয় গোটা এস্ট্রনমিক্যাল কমিউনিটিতে, বিভিন্ন স্থান থেকে তীব্র প্রতিবাদ আসে প্লুটোকে গ্রহ হিসেবে বহাল রাখার দাবিতে। তারা কোনভাবেই প্লুটোকে একটি সাধারন dwarf planet হিসেবে মানতে রাজি ছিলনা। পরবর্তীতে IAU অনেকটা বাধ্য হয় plutoid নামক একটি নতুন শব্দ চালু করতে, যা প্লুটোর মত অব্জেক্ট, যাদের ভর যথেষ্ট বেশি এবং সূর্যকে সরাসরি প্রদক্ষিন করছে কিন্তু ‘ ক্লিয়ারিং দ্য নেইবারহহুডের’ ক্রাইটেরিয়া ফিল আপ করতে পারছেনা তাদেরকে সম্বোধন করতে ব্যবহার করা হবে।

এত কিছুর পর ও প্লুটো এখনো একটি বামন গ্রহ হিসেবেই মাইনর প্ল্যানেট লিস্টে বহাল রয়েছে। সম্প্রতি নাসার নিউ হরাইজোন স্পেস্ক্রাফট ২০১৫ সালের জুলাই মাসে প্লুটোর ব্যাপারে অনেক বিস্তারিত তথ্য পাঠায়, যার আগ পর্যন্ত প্লুটোর আভ্যন্তরীন পরিবেশ এবং গঠনগত ডিটেইলস নিয়ে মানুষ অনেক টা অন্ধকারেই ছিল বলা চলে।কেননা প্লুটো আকারে অত্যন্ত ছোট এবং পৃথিবী থেকে অনেক দূরে হওয়ায় শক্তিশালি হাবল টেলিস্কোপ দিয়েও বেশি সুবিধা করা যাচ্ছিলনা। যদিও সম্প্রতি প্লুটোর আকাশে মেঘের মত বস্তুর সন্ধান পাওয়া যাওয়ায় আবার প্লুটোকে গ্রহ হিসেবে ফিরিয়ে আনার বিতর্ক উঠেছে। আশা করি ভবিষ্যতে প্লুটো গ্রহ নিয়ে এই বিতর্কের সমাপ্তি হবে।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।