প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » সম্পাদকীয় » কমেন্টে এই কাজগুলো না করলে হয় না?

কমেন্টে এই কাজগুলো না করলে হয় না?

 খাতুনে জান্নাত, বাংলা ইনিশিয়েটর

ফেসবুক – বর্তমান বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগের এক ভিন্ন নাম। পৃথিবীর সকল মানুষের কাছেই অন্যসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একদিকে, আর ফেসবুক অন্যদিকে। তবে এই সামাজিক মাধ্যমেই যখন অসামাজিকতা প্রদর্শনের এক নির্মম খেলা চলতে থাকে, তখন একে আর ‘সামাজিক’ যোগাযোগ মাধ্যম বলা যায় না।

ফেসবুকের যাত্রা যখন শুরু হয়, পুরো বিশ্ব তখন একে এক বিপ্লব হিসেবে দেখেছিল। এত কম সময়ে নিজের ভাবনাগুলো লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে হাজার হাজার মাইল দূর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার এর চেয়ে ভালো মাধ্যম বোধহয় আর ছিল না। সে কারণেই খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয় ফেসবুক। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় সকল স্মার্টফোন য়্যূজারেরই একটি করে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, যত দিন যাচ্ছে ততই বাড়ছে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অসামাজিক ব্যবহার।

ফেসবুকে কমেন্ট করার একটি অপশন আছে। সেখানে ব্যক্তি একটি স্ট্যাটাস সম্পর্কে নিজের মতামত এমনকি গঠনমূলক আলোচনাও করতে পারেন। কিন্তু বর্তমানে ব্যাপারটা হয়ে যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন! ফেসবুক কমেন্টকে বর্তমানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হচ্ছে গালাগালি করার কাজে! যেসব কথা সামনাসামনি বলা আমাদের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়,খুব সহজেই সে ধরণের কথা আমরা বলে ফেলছি ফেসবুক কমেন্টে। গালাগালি থেকে শুরু করে অশ্লীল মন্তব্য – ব্যক্তি আক্রমণের সকল পন্থাই অবলম্বন করা হচ্ছে এই কমেন্ট অপশনকে ব্যবহার করে।

বিশেষজ্ঞরা মানুষের এই ধরণের মানসিকতা সম্পর্কে বলেন, “সাধারণত সামনাসামনি আমরা কোন মানুষকে ভদ্রতার খাতিরে নিজের অপছন্দের কথাটা জানাতে পারিনা। জানালেও তার মধ্যে একটা সীমাবদ্ধতা থাকে। তবে ভার্চুয়াল জগতে যেহেতু কাউকে কেউ সামনাসামনি দেখে না, তাই কোনকিছু অপছন্দ হলেই খুব সহজেই আমরা এমন কিছু ভাষা ব্যবহার করে ফেলছি, যা বাস্তবে আমরা মোটেই এত সহজে ব্যবহার করতে পারতাম না। আসলে যা আমরা সামনাসামনি করতে পারিনা, কিন্তু করতে চাই, ভার্চুয়াল জগতে তাই করার একটা প্রবণতা আমাদের মধ্যে চলে এসেছে।”

বর্তমানে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কোন ভদ্র মানুষই দৈনিক পত্রিকাগুলোর কমেন্ট পড়তে পারবে না। কোন না কোন মানুষ সেখানে এমন গালাগালি কিংবা অশ্লীল মন্তব্য করবে, যে একটু পর সে নিজেও যদি নিজের মন্তব্য পড়ে,তাহলেও লজ্জা পাবে। আর কমেন্টে হিন্দু এবং মুসলিম – এই দুই গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে চরম ঝগড়া তো এখন নিত্য কর্মকান্ডে পরিণত হয়েছে।

এইতো দু’বছর আগে, ক্রিকেটার নাসির হোসেন তার বোনের সাথে একটি ছবি দিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। সেখানে কিছু মানুষ তাদের দু’জনকে নিয়ে এমন অশ্লীল মন্তব্য করলো যে পরবর্তীতে নাসির হোসেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হলেন। বিভিন্ন নারী তারকাদের ফেসবুকে দেয়া ছবিতেও করা হয় বাজে ধরণের মন্তব্য। যার কারণে বিব্রত হতে বাধ্য হয় সেই তারকা।

তবে এ ধরণের কাজ যারা করে তারা মোটেই অনুতপ্ত হয় না। একজনের ফেসবুক স্ট্যাটাস হুবহু তুলে দিচ্ছি, “যৌনকর্মীদেরকে আমরা কতভাবে অপমাণ করি। অথচ আমাদের আশেপাশে যে এরচেয়েও নিন্মমানের কত মেয়ে আছে তা কি আমাদের চোখে পড়েনা? ফেসবুকে যেসব মেয়ে নিজের ছবি দিয়ে নিজেকে পুরো পৃথিবীর সামনে শোপিস বানিয়ে বেড়ায়, সেই মেয়ে কি যৌনকর্মীর চেয়ে ভালো কিছু? এ ধরণের মেয়ের ছবির কমেন্টে আমি তাদের যোগ্য শব্দটা লিখে দিয়ে আসতে কোনো কার্পণ্য করব না।”

কমেন্টে এ ধরণের কথা লেখার পর যাতে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেয়া যায়, সেজন্য দেখা যায় অনেক মানুষ নিজের সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলে। আর সেই অ্যাকাউন্ট থেকে ইচ্ছামতো অন্যের ছবি কিংবা স্ট্যাটাসে আপত্তিজনক মন্তব্য করে আসছে। শুধু কি স্ট্যাটাস কিংবা ছবিতে মন্তব্য? নিজ অভিজ্ঞতা থেকেও দেখেছি, মেসেজে এমন আপত্তিজনক প্রস্তাব কিংবা কথা লেখে এ ধরণের মানুষ, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এ ধরণের ব্যক্তিবর্গের কারণে ফেসবুক ব্যবহার করাই দুঃসহ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ধরণের কাজগুলো আমরা কেন করি? সামনাসামনি যদি আমরা একজনের সাথে এ ধরণের ভাষা ব্যবহার করে কথা বলতে না পারি, তাহলে ভার্চুয়াল জগতে কেন পারব? ভার্চুয়াল জগতকে কি কোনভাবে আমরা বাস্তব জগতের চেয়ে গুরুত্ব কম দিই? তাহলে এ ধরণের কাজ করার যৌক্তিকতা কী?

বহু বছর চেষ্টার পর মানুষ নামের একটি জাতি সভ্য হতে পেরেছে। সেই সভ্যতার কিছু নিদর্শন আছে,আমরা যেন তা ভুলে না যাই। নিজের নামের আগে থেকে যেন ‘সভ্য’ কথাটি হারিয়ে না ফেলি। আমার আচরণের কারণে কোন একটা মানুষ আমাকে অসভ্য ভাবলো; হোক সে অপরিচিত, হোক সে বহুদূরের, তবুও তো ভেবেছে। তাই কি আমার জন্য লজ্জার নয়?

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ইনিশিয়েটর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ইনিশিয়েটর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।