প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » আমার কথা » লাল-সবুজ পতাকাটা কি এমনি এমনি এসেছে?

লাল-সবুজ পতাকাটা কি এমনি এমনি এসেছে?

  খাতুনে জান্নাত

চ্যাম্পিয়নস ট্রফির খেলা শেষ হলো এই তো কিছুদিন আগে। আগ্রহভরে প্রায় প্রতিটি ম্যাচ দেখেছি। আমি বাংলাদেশী। বাংলাদেশকে সাপোর্ট করব এটাই স্বাভাবিক। সে কারণে সেমিফাইনালে বাংলাদেশ দল হেরে যাওয়ার পর ফাইনালের খেলা দেখেছি ঠিকই, কিন্তু ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে সমর্থন করিনি কাউকেই। কেন করব? খেলা দেখলেই সমর্থন করতে হবে এমন কোন কথা নেই।

ফাইনালে ভারত হেরে গেল। পাকিস্তান জিতলো। ভালো কথা। একদল হারলে আরেকদলকে জিততেই হবে। তারা উল্লাস করুক। আমার কাজ ছিল খেলা দেখা, দেখেছি। কিন্তু আমি অবাক হয়ে দেখলাম, উল্লাস চলছে আমার ফেসবুকের নিউজফিডে।

কী একেকটা কথা! দেখে মনেহয় স্বপ্ন দেখছি নাতো! দুই-একটা উল্লেখ করি।

“পাকিস্তান জিতলে জিতে যায় বাংলাদেশ”

“পাকিস্তান জিন্দাবাদ”।

“আজ বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে আমরাই জিততাম”।

কী চমৎকার বিজয় উদযাপন!

খেলা একটি বিনোদনের বিষয়। হ্যাঁ, নিছকই একটা বিনোদন। আর কিছুই না। সেই খেলার সূত্র ধরে ‘৭১ – এর সমস্ত স্মৃতি ভুলে ‘১৭ সালে এসে আজ আমরা বলি ,পাকিস্তান জিন্দাবাদ!  বাহ্! সংখ্যাগুলোর মতো ইতিহাসও উল্টে গেছে। ছেচল্লিশ বছর আগে যে কথাটি শত অত্যাচারেও এদেশের একটি মানুষের মুখ থেকে বের করা যায় নি, আজ ছেচল্লিশ বছর পর অনায়াসেই তা আমাদের মুখ দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে।

আমরা নতুন প্রজন্ম! আমি শঙ্কিত, আমি লজ্জিত, আমি আতঙ্কিত; এই ভয়ংকর নতুন প্রজন্ম নিয়ে।

আমি ঘৃণা করি পাকিস্তানকে। কেন করব না? যুদ্ধ আমি দেখিনি ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধের অসংখ্য বই পড়েছি। সিনেমা দেখেছি। শহীদের আজাদের মায়ের কথা জেনে হাউমাউ করে কেঁদেছি। শক্তিশালী ক্রিকেটার মুক্তিযোদ্ধা জুয়েলকে চিনেছি। ভাবুক রুমীকে জেনেছি। গল্প পড়তে পড়তে লক্ষ লক্ষ ধর্ষিতা নারী, কিশোরীদের আর্তনাদ শুনেছি। তারা গল্প বলে। তারা গল্প বলে একটি দেশের। সবুজের মাঝখানে কেন লাল সেই গল্প তারা বলে।

যুদ্ধ দেখিনি, শুধু যুদ্ধের কথা পড়েছি তাতেই আমার মনে এত ঘৃণা, আর যারা যুদ্ধ দেখেছে তাদের কথা কি আমরা চিন্তা করতে পারি? বাংলাদেশের প্রতি যে পরিমাণ ভালোবাসা নিয়ে তারা বেঁচে আছে, পাকিস্তানিদের জন্য সেই একই পরিমাণ ঘৃণা কি তারা বুকে করে নিয়ে বাস করছে না? সেটা কি “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” ধ্বনি শোনার জন্য?

আপনি বলতে পারেন এখন পাকিস্তানীদের প্রতি ঘৃণা করে কোনো লাভ নেই, এরা তো আর যুদ্ধ করেনি। তাহলে আপনি কি বলতে পারেন, কেন তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের কাছে ক্ষমা চাইছে না? এর উত্তর কি আপনার কাছে আছে? তারা এখনও আমাদের বিরুদ্ধ মনোভাব পোষণ করে বলেই ক্ষমা চাইছে না। জানেন তাদের পাঠ্যবইয়ে তারা কি শেখায় শিশুদের? তাদের বিভিন্ন শ্রেণির  পাঠ্যবইয়ে আছে,

পঞ্চম শ্রেণি:
— ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর ভারত পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের সহযোগিতায় সেখানকার অধিবাসীদের পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলে। পরে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করে। ভারতের ষড়যন্ত্রে পূর্ব পাকিস্তান পৃথক হয়ে যায়।

নবম-দশম শ্রেণি:
— পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বহু সংখ্যক হিন্দু শিক্ষক কর্মরত ছিলেন। হিন্দু শিক্ষকেরা বাঙালিদের মনে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে।
— পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় এক কোটি হিন্দু বাস করত। ভারত তাদের স্বার্থ বাস্তবায়নে এই হিন্দুদেরকে ব্যবহার করে। ভারত পূর্ব পাকিস্তান পৃথক করতে চেয়েছিল। অনেক হিন্দুই ভারতের চর হিসেবে কাজ করে। পাকিস্তান আমেরিকাকে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেওয়ায় রাশিয়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ছিল। ফলে রাশিয়া ভারতের সামরিক আগ্রাসনে সমর্থন দেয়। অন্যদিকে আমেরিকাও পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতা চেয়েছিল।
— আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে পূর্ব পাকিস্তানের পতন হয়।

উচ্চ মাধ্যমিক:
— মার্শাল ল কর্তৃপক্ষ পুর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অভিযানে জামায়াতে ইসলামী সশস্ত্র সেচ্ছাসেবক দিয়ে অংশগ্রহণ করে। সামরিক অভিযানের মুখে আওয়ামী লীগের অনেক কর্মী ভারতে পালিয়ে যায় এবং শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে। ভারত তাদেরকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ প্রদান করে এবং পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পূর্ব পাকিস্তানে প্রেরণ করে। মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ডিসেম্বর ৩, ১৯৭১ ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়। স্থানীয় জনগণের সমর্থনের অভাব, সামরিক বাহিনী ও সরঞ্জামাদি সরবরাহের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কারণে পাকিস্তানের সৈন্যরা ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্নসমর্পণে বাধ্য হয়।
— ১৯৭১ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী সাহসিকতার এক নতুন রেকর্ড স্থাপন করে।

প্রতিটি শ্রেণির পাঠ্যবইতেই তারা এ ধরণের তথ্য দিয়ে রেখেছে। সব জায়গায় ভারতীয় আর হিন্দুদের ষড়যন্ত্রের বর্ণনা। তাদের অত্যাচারে যে এদেশের আকাশ – বাতাস ডুকরে কেঁদে উঠেছিলো, তার বর্ণনা কই?

আমার পরিচিত একজন খেলায় ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে পাকিস্তানকে সাপোর্ট করেছিল। আমি কারণ জানতে চাওয়ায় সে বলে, “সিম্পল। আমি মুসলিম, তারাও মুসলিম।”

চমৎকার উত্তর! আবারো ধর্মের দোহাই! এই ধর্মের দোহাই দিয়েই পাকিস্তান নামে একটি দেশের সৃষ্টি হয়েছিল। মাঝখানে ভারত, তার দুইপাশে যে দুটি অঞ্চল তা নাকি একটিই দেশ! দুই অঞ্চলের মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, চিন্তা-চেতনা এমনকি মুখাবয়বে পর্যন্ত কোন মিল নেই। মিল আছে শুধু একটি জায়গায় – ধর্ম। সেই ধর্মের দোহাই দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি জাতিকে এক করা হলো, যার পরিণতি আমরা জানি। তারপরও কেউ যখন আবারো সেই ধর্মেই দোহাই দিতে থাকে, তখন নিজের শ্রবণক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ হতে থাকে।

মুক্তিযুদ্ধ বলতে আমরা একত্তরই বুঝি। কিন্তু মুক্তিযু্দ্ধ মানে তো শুধু একাত্তর না। দীর্ঘ ২৩ বছর নানাভাবে অত্যাচারের পর ভোরের আলো ফুটলো, এলো একাত্তর। চূড়ান্ত প্রতিবাদ করলাম আমরা। ধরা যাক ২৩ বছর পরেও আমরা প্রতিবাদ করলাম না। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে গেলাম। প্রতিবাদ শুরু করলাম এখন। তাহলে কী হতো? এখন আপনারা পাকিস্তানের যে প্রজন্মের কথা বলছেন যে, “এদের কী দোষ?” তারা কি আমাদের ছেড়ে দিতো? তাদের পূর্বপুরুষের মতো অত্যাচার তারাও করতো। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তারাই লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করতো। বর্বরের মতো নারীকে এতটুকু সম্মান না দিয়ে পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠতো। কুকুরের মতো মানুষ হত্যা করে বলতো “শুয়রের বাচ্চা মালাউনকা বাচ্চা”। কোন কোন রাজাকার মিথ্যা ফতোয়া দিত, “যুদ্ধের ময়দানে তৃষ্ণার্ত সৈন্যের তৃষ্ণা নিবারণ করা তো অতি পুণ্যের কাজ। বাঙ্গালী নারী তো সেই পুন্যই করছে!” হ্যাঁ, এরাই এই কাজ করতো, এই প্রজন্ম, যাদের প্রতি আমরা কেউ কেউ মমতা অনুভব করছি। তখন এই কথাগুলো এত সহজে মুখ দিয়ে বের হতো তো?

কত কষ্ট আর কত ত্যাগের পর যে এই দেশটা এসেছে তা শুধু যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছে তারাই জানে। আমাদের পতাকার ডিজাইনটা খুব সহজ। কোন ছোট বাচ্চাও তা দুটো রং হাতে দিলে এঁকে ফেলতে পারে। কিন্তু এই পতাকাটা পাওয়ার প্রক্রিয়া মোটেও সহজ ছিল না। বহু রক্তের বেদনা সহ্য করার পর দেশটি একটি পতাকা আঁকতে পেরেছে। তারপর এই সহজ পতাকাটা আমরা পেয়েছি। এত কিছু জেনেও যদি আমরা না জানার ভান করি, আমরা কি নিজেরা নিজেদের ক্ষমা করতে পারব? কক্ষনো পারব না। পারা সম্ভব না।

লাল-সবুজ পতাকাটা এমনি এমনি কেউ এসে দিয়ে যায়নি। এ পতাকা রক্তে ভেসে এসেছে। পতাকার দিকে ভালো করে তাকালে এখনও সে রক্ত দেখা যায়, কান পাতলে শোনা যায় করুণ আর্তনাদ। হ্যাঁ, আমি সে কারণেই ঘৃণা করি পাকিস্তানকে, পাকিস্তানীদেরকে। কারণ, সে আর্তনাদ আমার মায়ের,বোনের। সে কান্না আমার বাবার, ভাইয়ের। তার মধ্যে আমি নিজেকেও দেখতে পাই।

হ্যাঁ, এ কারণেই আমি ঘৃণা করি পাকিস্তানকে।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ইনিশিয়েটর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ইনিশিয়েটর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।