প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » সম্পাদকীয় » মানুষ থেকে পশু হয়ে যাওয়া কি এতই সহজ?

মানুষ থেকে পশু হয়ে যাওয়া কি এতই সহজ?

 কাজী মোয়াজ্জমা তাসনিম
শিক্ষানবিস সহ-সম্পাদক | বাংলা ইনিশিয়েটর

আপনি চুপচাপ বসে আছেন। আপনার সামনে অস্ত্র হাতে যমদূত দাঁড়ানো। আপনি মৃত্যুকে নিজ চোখে দেখতে পাচ্ছেন। মৃত্যু আপনার দিকে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। আপনার ঘাড়ে তার তপ্ত নিঃশ্বাস। আপনি জানেন কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আপনাকে আলিঙ্গন করবে। চিরদিনের মত নিজের সাথে আপনাকে নিয়ে যাবে সে। আপনি হারিয়ে যাবেন। প্রিয়মুখ গুলো কি খুব মনে পড়ছে? বাবার কথা? মা? ছোট বোনটাকে আর কোনদিন দেখতে পাবেন না ভেবে কি খুব কান্না পাচ্ছে? যমদূতের সাথে কিন্তু মৃত্যুর চুক্তি সম্পন্ন। এবার আপনার যাওয়ার পালা। আপনি শেষবারের মত বাঁচতে চাইলেন। কাকুতি মিনতি করলেন। কিন্তু যমদূত হৃদয়হীন।

ধরে নিন এটা একটা দুঃস্বপ্ন। এবার চলুন একটু স্মৃতিচারণ করি। হলি আর্টিজান। নামটা কি চেনা চেনা লাগছে? ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের এই রেস্টুরেন্টে আপনার এই দুঃস্বপ্ন রূপ নিয়েছিল বাস্তবে। মৃত্যুকে দ্রুত পায়ে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছিল কিছু মানুষের। যমদূতের ভূমিকায় ছিল এই দেশেরই কিছু মানুষ। একই মাটির বুকে বড় হওয়া, নিঃশ্বাসে একই বাতাসের অক্সিজেন গ্রহণ করা, একই ভাষায় কথা বলা কিছু মানুষ একজন আরেকজনকে মেরে ফেলেছিল অবলিলায়। এই হত্যাকারীরাও ছোটবেলায় পাড়ার ছেলেদের সাথে দলবেঁধে ক্রিকেট খেলেছে, পড়া না পারায় ক্লাসের বাইরে কান ধরে দাঁড়িয়ে থেকেছে, ঈদের নামাজ শেষে বন্ধুকে পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করেছে। এই হত্যাকারীদেরও প্রথম পাঠ ছিল অ আ ক খ। হত্যাকারীরাও স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” গেয়েছে। গাওয়ার সময় অন্যদের মত কি তাদের গায়েও কাঁটা দিয়ে উঠত না? হয়ত।

বাংলাদেশের মানুষগুলো খুব বেশি সহজসরল। খুব বেশি সাধারণ। অনেক অনেক বেশি হৃদয়বান। একটা সময় এই ছেলেগুলোও তাই ছিল। তারপর তারা একদিন আর সেই সাধারণ মানুষটা থাকল না। ভিলেন হয়ে গেল। গায়ে জঙ্গী তকমা লাগালো। মানুষ থেকে হয়ে গেল সাক্ষাত যমদূত। তারপর তারা সাধারণ মানুষদের হত্যা করল। নিজেরাও জীবন দিল। তরুণ প্রাণ আসলে উৎসর্গের জন্যই। কিন্তু সেই উৎসর্গটা হতে হয় অন্য প্রাণ বাঁচাতে। প্রাণ নিতে নয়। কী সেই যাদুমন্ত্র যার বলে এই সহজ সরল মানুষগুলো হয়ে যায় খুনি? প্রাণ বাঁচাতে নয়, আরো দশটা প্রাণ নিয়ে তবেই তারা মরে? রাতারাতি কিভাবে বদলে যায় সব?

আসলেই কি রাতারাতি? মানুষ থেকে পশু হয়ে যাওয়া কি এতই সহজ? একজন এসে হাতে বন্দুক ধরিয়ে দিয়ে বলল “খুন কর” আর ওমনি সবাই খুনি হয়ে গেল? যাদের সারাজীবন ভাই ডেকে এসেছে তাদের গলায় ছুরি চালানোর দীক্ষা কি এক রাতে পাওয়া সম্ভব?

ছোটবেলায় আমরা একটা কথা প্রায়ই বলে থাকি। কালো পিঁপড়ারা ভালো। তারা কামড়ায় না। কারণ তারা মুসলমান। লাল পিঁপড়ারা খারাপ। তারা কামড়ায়। কারণ তারা হিন্দু। তাই লাল পিঁপড়া দেখলেই পিষে মারতে হয়। কালো পিঁপড়া ছেড়ে দিতে হয়।

হলি আর্টিজেন হামলাকারীরা তাদের জিম্মিদের জিজ্ঞেস করেছিল তারা মুসলমান কিনা। মুসলিম হলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। নতুবা হত্যা করা হবে। হয়েছিলও কিন্তু তাই।

পাঠক, কিছু মিল কি পাচ্ছেন? হয়ত ভাবছেন লাল পিঁপড়া কালো পিঁপড়া নামক নেহায়েত ছেলেমানুষী ব্যাপারের সাথে এত বড় একটা ঘটনার সম্পর্ক কী? মানুষ একদিনে অমানুষ হয় না। তাদের ধীরে ধীরে অমানুষ বানানো হয়। এই পিঁপড়া নিয়ে ছেলেমানুষী কথাটাই কিন্তু খুব সূক্ষ্মভাবে সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত বীজ মাথায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। ঠিক মত সার, জল পড়লে এই বীজই একদিন মহীরুহ হবে সেটা কি খুব অস্বাভাবিক কিছু? এটা আসলে ছোটখাটো একটা উদাহরণ। এরকম খুব ছোটখাটো বিষয়গুলো আমরা সবসময় এড়িয়ে যাই। হুঁশ হয় যখন সেই ছোটখাটো বিষয়গুলো বড়সড় আকার ধারণ করে। কিন্তু তখন আর কারো কিছু করার থাকে না।

জঙ্গী কোন ট্রেনিং ক্যাম্পে তৈরি হয় না। জঙ্গী তৈরির পেছনে আইএস, বোকো হারাম, তালেবানের কোন হাত নেই। ওরা কেবল জঙ্গীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগায়। জঙ্গী তৈরি হচ্ছে আপনার আর আমার ঘরেই। জঙ্গী তৈরির সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক আমরা নিজেরাই। নিজ ধর্মকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের জন্য অন্য ধর্মকে হেয় করি আমরাই। পাড়ার মসজিদে মসজিদে ওয়াজ মাহফিলে, জুম্মার খুতবায় ধর্মের অপব্যখ্যা দিচ্ছি আমরাই। চায়ের আড্ডায়, বন্ধুদের গল্পগুজবে “মালাউন, কাফের, নাস্তিক” শব্দগুলো ব্যবহার করে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছি আমরাই। তারপর আমাদের মধ্যেই কেউ কেউ মন্দির ভাঙছে, কেউ আদিবাসী নির্যাতন করছে, কেউ বা নাম লেখাচ্ছে জঙ্গীর খাতায়। পাঁচজন জঙ্গী হয়ত পুলিশের গুলিতে মারা যাচ্ছে। সাতজন হচ্ছে গ্রেফতার। কিন্তু প্রতিদিন শত শত জঙ্গী জন্ম নিচ্ছে আমাদের চারপাশেই। আমরা জন্ম দিচ্ছি। দায়টা তাদের একার না। দায় আমাদের সবার।

আপনি কি নিশ্চিত আপনার ছোট ভাইটা মনের ভেতর ভিন্ন মতাবলম্বীদের জন্য ঘৃণা পুষে রাখে না? আপনি কি কখনো তাকে শিখিয়েছেন সবাইকে সম্মান করতে, সবাইকে ভালোবাসতে? অন্যদের মতামতকে শ্রদ্ধা করার শিক্ষা আপনি তাকে দিয়েছেন তো? যদি দিয়ে থাকেন আপনাকে অভিনন্দন। যদি না দেন, আপনার ভাইটিই যদি কাল ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করে বসে সেই দায় আপনি এড়াবেন কী করে?

শুধু আইন করে, কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে, দুইদিন পরপর অভিযান চালিয়ে জঙ্গীবাদ নির্মূল করা যায় না। নিবরাসরা একজন একজন করে জন্মায় না। তারা জন্মায় ঝাঁকে ঝাঁকে। আপনার পাশেই আছে অসংখ্য অসংখ্য নিবরাস। আপনার চারপাশেই হাজার হাজার তাহমিদ ঘোরাফেরা করছে। তারা জন্ম নিচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রতি সেকেন্ডে। আইন করে আপনি কয়জনকে প্রতিরোধ করবেন?

এদেশে যেমন একজন নিবরাস জন্ম নেয়, তেমনি জন্ম নেয় একজন ফারাজও। একই দেশে, একই শহরে বড় হওয়া দুইজন মানুষ, একজন বন্ধুদের বাঁচাতে জীবন দেয়, আরেকজন মানুষ মারতে। নিবরাস কিংবা ফারাজ, আমাদের মধ্য থেকেই উঠে আসা দুইজন মানুষ। আমাদের আশেপাশে দল বেঁধে নিবরাসরা আছে, ফারাজ আছে কয়জন? থাকবে কিভাবে? আমরা কি কাউকে ফারাজ বানানোর চেষ্টা করেছি? আমাদের আশেপাশের পরিবেশ নিবরাস তৈরির জন্য উপযুক্ত। ফারাজ তৈরির জন্য নয়। তাই এক হলি আর্টিজানে নিবরাস থাকে সাতজন, আর ফারাজ মাত্র একটা।

হলি আর্টিজেনের মত ঘটনায় শুধু প্রশাসনকে দোষ দিয়ে বসে থাকলে হবে না। জঙ্গীবাদ দমন করতে হবে ঘর থেকে। বন্ধুমহল থেকে। নিজেকে বদলাতে হবে সবার আগে। তারপর আশেপাশের মানুষদের। খুব ছোট ছোট কিছু পরিবর্তনই একসময় এই জঙ্গী তৈরির বিশাল ফ্যাক্টরিটা বন্ধ করে দেবে। হলি আর্টিজেনের মত ঘটনা তখন আর ঘটবে না। একটাও না।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।