প্রচ্ছদ » কিশোর তারকা » নাশাদের ছবিগুলো যেন গল্প বলে

নাশাদের ছবিগুলো যেন গল্প বলে

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০১৭৯:০৬:৫৬ অপরাহ্ন

[pfai pfaic=”fa fa-user fa-spin ” pfaicolr=”” ]  খাতুনে জান্নাত | বাংলা ইনিশিয়েটর

দেখতে বেশ লম্বা-চওড়া। বয়স কত আর হবে! সতেরো কী আঠারো। এবার দিনাজপুর আইডিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি দিয়েছে ছেলেটা। চোখে-মুখে বুদ্ধির ঝিলিক মাখিয়ে মাথা নেড়ে নেড়ে কথা বলা ছেলেটার নাম নাশাদ। নাশাদ সাকেব। তবে তার বিশেষত্ব চোখের ওই বুদ্ধির ঝিলিকে নয়, নয় তার কথায়। উহু, গড়নেও নয়। তার বিশেষত্ব তার হাতে তৈরি একেকটা গল্পে। যে গল্প শব্দ দিয়ে তৈরি হয় না, হয় রংতুলি আর কাগজ দিয়ে।

নাশাদের জীবন অনেকটা মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘দীপু নাম্বার টু’ – গল্পের দীপুর মতো। মনে আছে সেই দীপুর কথা? সেই যে ছেলেটা যে বছর বছর স্কুল বদলাতো? বাবার সাথে প্রতিবছর নতুন নতুন জায়গায় যেতো আর ভরতি হতো নতুন নতুন স্কুলে? নাশাদের জীবনেও ঘটেছে এমন ঘটনা। তার জন্ম হয়েছে দিনাজপুরে। সেখান থেকে একসময় তার বাবা বদলি হয়ে তাকে নিয়ে চলে যান কুড়িগ্রাম ফুলবাড়ীতে। সেখান থেকে রংপুর কাউনিয়ায়। তারপর যায় গাইবান্ধায়। সর্বশেষ তার বাবার বদলি হয় ফেনীতে। কিন্তু সেসময় তিনি চাকরী ছেড়ে দেয়ায় ফেনীতে আর যাওয়া হয় নি নাশাদের। দিনজপুরে গিয়ে স্থায়ী হয় তারা। তবুও তো কত জায়গা ঘুরেছে সে ওই ছোট্ট বয়সে! ইশ! কী মজাই না ছিল তার!

নাশাদের ছবি আঁকার হাতেখড়ি হয় তার বাবার হাতে। তার বাবা একসময় চারুকলায় পড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারিবারিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তা আর সম্ভব হয় নি। তবে ছেলের মনে তিনি শক্ত করে ঢুকিয়ে দিয়েছেন তুলি নিয়ে খেলার নেশা। ছোট্ট নাশাদ কল্পনার সঙ্গে বিভিন্ন রং মিশিয়ে আঁকতো বিভিন্ন ছবি। এঁকে বাবাকে দেখাতো। বাবা ছেলেকে বাহবা দিতেন, সেই সঙ্গে ধরিয়ে দিতেন ভুলগুলোও। বাবাই হয়ে উঠলো নাশাদের প্রথম ছবি আঁকার শিক্ষক।

নাশাদ কিছুদিন একজন শিক্ষকের কাছে ছবি আঁকা শিখলেও অল্প কিছুদিন পরেই তা ছেড়ে দেয়। আবারও শুরু করে নিজের ইচ্ছেমতো আঁকা। এ যেন তার কল্পনাগুলোকে সবার সামনে নিয়ে আসা, আরও বেশী রঙিন করে, চারকোনা কাগজের খাঁচায় বন্দী করে।

নাশাদের আঁকা কিছু পোট্রেইট ছবি

নাশাদের আঁকা ছবিগুলো দেখলে বিশ্বাস হতে চায় না এগুলো তার আঁকা। এত নিঁখুত আর এত চমৎকার, যে যেকোন মানুষ মতামত দেয়ার ভাষাও খুঁজে পাবে না। শুধুমাত্র ছবি আঁকাতেই নয়; আলোকচিত্র, গান এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনিংয়ের কাজেও সে দারুণভাবে পারদর্শী। আলোকচিত্রের প্রতিও কিন্তু সে আগ্রহী হয়েছে তার শিল্পমনা বাবার কাছ থেকে, যাকে জীবনের আদর্শ মানে সে।

নাশাদের মা-ও কম শিল্পমনা নয়। চমৎকার নকশি কাঁথা বুনতে পারেন তিনি। শিল্পকে ভালোবাসা এই মন নিয়ে তিনি নাশাদ এবং তার বাবাকে অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন নিরন্তর। ২০১২ সালে নাশাদ, তার বাবা এবং মা মিলে তাদের বাসায় গড়ে তোলে একটি ছবি আঁকার স্কুল। যার নাম ‘ড্রইং স্কুল’। মাত্র ১৫ জন ছাত্র-ছাত্রী মিলে যে স্কুল শুরু হয়েছিলো, সেখানে বর্তমানে চার শতাধিকেরও বেশি শিক্ষার্থী। শিক্ষক সে এবং তার বাবাসহ প্রথমে ৪ জন থাকলেও বর্তমানে আছেন মোট ১৬ জন।

নাশাদের মতে বর্তমানে ভুল ধারণাগুলো ধীরে ধীরে বদলালেও পুরোপুরি নির্মূল হয়ে যায় নি। সে চারুকলায় পড়তে চায় শুনে অনেকেই যে সহজভাবে তা মেনে নিতে পারে না, তা সে বোঝে। এদেশের সকল মানুষ এখনও শিল্প আর শিল্পীর কদর করতে শেখে নি। তবে আশার কথা, তরুণেরা এই ধরণের কাজগুলোতে স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ দেখাচ্ছে।

নাশাদ বর্তমানে ঢাকায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরতি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। চারুকলার একটি আসন যে তার জন্য বরাদ্দ – এটা তো প্রায় ধরেই নেয়া যায়!

যখন আমরা অলস কোনো দুপুরে কী করব ভেবে পাই না, কিংবা গভীর নিশ্চুপ রাতে বিছানার সাথে মিতালী পেতে চলে যাই স্বপ্নরাজ্যে, নাশাদ হয়তো তখন তুলে নেয় হাতে রংতুলি। নিরবে, নিভৃতে কথা বলে রংতুলির সাথে। যে কথার কোনো ভাষা নেই। কথা বলতে বলতে গড়ে ওঠে একটি অবয়ব। যেই অবয়ব হয়তো নিশ্চুপ সেই মাঝরাতে সব নির্জনতাকে ভেঙ্গে দিয়ে বলে ওঠে, ‘এই নাশাদ! এই !!

নাশাদের কিছু চিত্রকর্মঃ  ( দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন) 

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।