প্রচ্ছদ » আমাদের সাহিত্য » গল্প ও প্রবন্ধ » ওরিয়ং এর দুঃসাহসিক অভিযান

ওরিয়ং এর দুঃসাহসিক অভিযান

খাতুনে জান্নাত | বাংলা ইনিশিয়েটর



ঘরটাতে আস্তে করে উঁকি মারলো ওরিয়ং। এই ঘর পর্যন্ত পৌঁছাতে তাকে সাত খাল তেরো ডোবা পার হতে হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে অবশ্য সাত খাল তেরো ডোবা পার হয়নি সে। এটা তাদের সমাজে একটি প্রচলিত প্রবাদ। বহুদূর পার হয়ে কেউ এলে তারা এটা বলে। ছোটবেলায় সে ঘুমানোর সময় মা তাকে গল্প শোনাতো। সাতটা খাল আর তেরোটা ডোবা পার হয়ে রাজকুমার আসে রাজকুমারীকে ভয়ঙ্কর এক বিপদ থেকে উদ্ধার করতে। কী রোমহর্ষক গল্প! ভয়ে ওরিয়ংয়ের সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠতো। জড়িয়ে ধরতো মাকে। আজও সে এমনই এক ভয়ঙ্কর অভিযানে নেমেছে। এই অভিযানে সে সফল না হতে পারলে এমনকি তার মৃত্যুও হতে পারে! আর সফল হলে তার বীরত্বের গাঁথা শুনেও হয়তো কোনো শিশুর শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠবে। সে মাকে জড়িয়ে ধরে বলবে, “মা,ভয় করছে।” মা বলবে, “ভয় কিসের বাবা? তোমাকেও তো ওরিয়ংয়ের মতো সাহসী হতে হবে!”



নিশি অন্যমনস্কভাবে দাঁড়িয়ে আছে। নাসরিন ম্যাডামের কথা তার কান পর্যন্ত যাচ্ছে ঠিকই,কিন্তু মাথা পর্যন্ত আর পৌঁছাচ্ছে না। মনে হচ্ছে বহুদূর থেকে ম্যাডামের কন্ঠস্বর ভেসে আসছে। তার মন-প্রাণজুড়ে এখন শুধু একটা চিন্তাই ভীষণভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে। শুধু বারবার মনেহচ্ছে সে যদি ব্যাঙ হতো তাহলে কী হতো! কী ভয়ংকর ঘটনাই না ঘটতো তখন! হয়তো আজকে এই ল্যাবে তাকেও কেউ ধরে নিয়ে আসতো কেটেকুটে পরীক্ষা করার জন্যে! ধারালো ছুরি দিয়ে তার শরূর কেটে সবাই শিখত মানুষের শরীরের কোন অংশ কোথায় থাকে। নিন্মি হয়তো তাকে দেখে চিৎকার দিয়ে বলে উঠতো, “ওয়াও! এতো মানুষের শরীরেরই ক্ষুদে সংস্করণ!”

হঠাৎ একটা খোঁচা খেয়ে বুকের মধ্যে ধ্বক করে উঠল নিশির। তাকিয়ে দেখে নিন্মি পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। হাঁফ ছাড়লো নিশি। যাক বাবা,নিন্মি! আস্তে করে বলে উঠলো নিন্মিকে, “তোর এইসব হঠাৎ হঠাৎ খোঁচা-খুঁচি স্বভাব বাদ দিবি? চিন্তার মাঝখানে এরকম করতে কতবার না মানা করেছি তোকে? একদিন দেখবি হার্টফেল করে ফেলব চমকে উঠে।”
“বাহ্! তুই অন্যমনস্ক ছিলি বলে সাবধান করতে এলাম আর এখন আমার দোষ! তা কী এত চিন্তা করছিলেন আপনি?”
“না মানে….,” বলতে একটু ইতস্তত করে নিশি। ভাবছিলাম এই ব্যাঙটার কথা। কতই না কষ্ট ওর জীবনে! আমরা নিষ্ঠুর মানুষেরা এখনই ওকে কেটে-কুটে পরীক্ষা – নিরীক্ষা করব। এত কষ্টের কেন রে ওদের জীবনটা?”
নিন্মি মনে মনে একটু হেসে নিল। নিশি যে এরকম কোনো পাগলাটে চিন্তা করবে এটা তার আগেই মনে হয়েছিল।
“ওফ্ নিশি! ম্যাডাম তো আর ওকে মেরে ফেলবে না। কাজ শেষ হলে আবার সেলাই করে ফেলবে। তখন দেখবি কী সুন্দর করে ও তোকে টা টা – বাই বাই বলতে বলতে তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে যায়।”
এই কথা নিশিকে সন্তুষ্ট করতে পারল না। “দেখ নিন্মি….তোকে যদি কেউ এভাবে কেটে তোর শরীরের পার্টসগুলো দেখে নিয়ে তারপর আবার সেলাই করে দেয়,কেমন লাগবে তোর? পারবি তল তখন আনন্দের সাথে তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ি চলে যেতে?”
“ধূর! আমাকে কেউ কাটবেই বা কেন,আর আমি লাফাতে যাবই বা কেন! আমি কি ব্যাঙ নাকি? আর দেখ,এগুলো তো আমরা মানুষের ভালোর জন্যই করছি। মানুষের জীবন রক্ষা করার জন্য দুই-একটা ব্যাঙকে তো একটু কষ্ট দিতেই হবে,তাইনা?”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিশি। “হ্যাঁ,তা তো ঠিকই বলেছিস।”
“গুড। তাহলে এবার মন দে ম্যাডামের কথায়।”

নিন্মির কথা মুখে মুখে মেনে নিলেও মন থেকে তা মানতে পারেনি নিশি। ব্যাঙটার জন্য খুবই কষ্ট হচ্ছে তার। ব্যাঙটার দিকে তাকালো সে। আশ্চর্য! তার কেন যেন মনে হচ্ছে মায়া মায়া চোখে বাঁচার আকুতি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে ব্যাঙটা। একটা ব্যাঙের জন্য এত মায়া লাগছে কেন তার?



শীরপংয়ের খুব কান্না পাচ্ছে। এ কী ভয়ংকর বিপদে পড়লো সে! সে তো কিছুই বুঝতে পারছে না। এখন তার বারবার মায়ের সাবধানধ্বনি মনে হচ্ছে। মা কতবার বলেছিল একা একা বেশিদূর না যেতে। মায়ের কথা না শুনে এ কী বিপদ ডেকে আনলো সে! ছোটবেলা থেকেই মা তাকে সাবধান করতো, “একা একা কোথাও যাবি না। মানুষের থেকে তো দশহাত দূরে থাকবি। এরা আমাদের ভয়ংকর শত্রু। মানুষ ডাক্তারেরা আমাদের ধরে নিয়ে কেটে-কুটে পরীক্ষা করে! কত বড় সাহস! আমাদের কি গিনিপিগ পেয়েছে?”

শিরপংয়ের এখন ভাইয়ার কথাও মনে পড়ছে। সে সবসময় বন্ধুদের সাথে জটিল সব অ্যাডভেঞ্চারে যায়। ভয়ংকর সব বিপদের মোকাবিলা করে। আর রাতে ঘুমানোর সময় তাকে সেসবের গল্প শোনায়। শীরপং চোখ বড় বড় করে বলে, “তোর ভয় করেনা ভাইয়া?”
ভাইয়া তুড়ি মেরে বলে, “কিসের ভয়? তুই তো এখন ছোট। আরেকটু বড় হলে তোকেও নিয়ে যাব আমি। দেখবি তখন কী মজা হয়!”
ভাইয়ার কথা মনে পড়ার পর শীরপংয়ের এবার সত্যি সত্যি কান্না এসেই গেল। সে জানে তার ভাইয়া পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী ব্যাঙ। কত কী যে করতে পারে! আর কত কী যে জানে! পৃথিবীতে এমন কোনো জিনিস নেই যা তার ভাইয়া জানেনা। তার ভাইয়া হলো চলমান জ্ঞানকোষ। পৃথিবীর সব প্রশ্নের উত্তর সে জানে। আর একটা গুণ আছে ভাইয়ার। তার ভাইয়া পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো ভাইয়া। তাকে যে কত্ত ভালোবাসে! আজ তার এতবড় বিপদে ভাইয়া কি তাকে উদ্ধার করতে আসবে না? শীরপং মনে মনে বলে উঠলো, “তুই কোথায় ভাইয়া? আমাকে বাঁচা!”



এতদিন অনেক অ্যাডভেঞ্চার করেছে ওরিয়ং। কিন্তু ওগুলো আর এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। এতদিন করতো নিজের আনন্দের জন্য। ভেবেছিল মার্কো পোলোর মতো জীবনের সব দূর্দান্ত অ্যাডভেঞ্চার দিয়ে একটা ফাটাফাটি বই লিখবে। পৃথিবীর ব্যাঙেরা তখন তাকে ডাকবে ‘দি গ্রেট অ্যাডভেঞ্চারিস্ট ওরিয়ং’। কিন্তু আজকের অ্যাডভেঞ্চারের সাথে শুধু তার না,তার বোনের জীবনও জড়িত। একটু দেরি হলেই শীরপংয়ের যেকোন বিপদ হতে পারে।

পুরো ঘরটাতে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো সে। কিন্তু শীরপং কোথায়? এখানেই তো তাকে আনতে দেখলো। অনেকগুলো ছেলে-মেয়ে ঘরের মাঝখানে গোল হয়ে দাড়িয়ে আছে। ওদের সামনে কী? একটু এগিয়ে গেল ওরিয়ং। একি! মাঝখানেই তো তার ছোট্ট বোনটাকে আটকে রেখেছে! তাহলে সে ঠিকই ভেবেছে। যখন দূর থেকে দেখল কালো করে সাপের মতো নিষ্ঠুর আর ভয়ংকর একটি ছেলে শীরপংকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে,তখনই ভেবেছিল এরকম কোনো বিপদ হবে তার। কিন্তু এই বদ্ধ জায়গা থেকে সে কী করে উদ্ধার করবে শীরপংকে? কী হবে এখন তার বোনটার?



নিশির মাথায় ম্যাডামের কোনো কথাই ঢুকছে না। হঠাৎ তার চোখ গেল মেঝেতে। আরে! এটা কী? এটা তো আরেকটা ব্যাঙ! কিন্তু এইখানে এলো কী করে?
হঠাৎ করে তার মনে হলো- আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে যে এই ব্যাঙটা ম্যাডামের সামনে যেই ব্যাঙটা আছে তাকে উদ্ধার করতে এসেছে? হয়তো এর মা কিংবা বাবা। বোন অথবা ভাইও হতে পারে। নিশির কেন যেন মনে হলো এই ব্যাঙটাও মায়া মায়া করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আহারে! বেচারা একজনকে উদ্ধার করতে এসে নিজেই না বিপদে পড়ে যায়!

নিশির হঠাৎ জেদ চেপে গেল। এখন যদি এই ব্যাঙটার জন্য সে কিছু করতে না পারে তাহলে নিজেকে সে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারবে না। হয়তো শাস্তি হিসেবে পরজন্মে সৃষ্টিকর্তা তাকে ব্যাঙ বানিয়েও পৃথিবীতে পাঠাতে পারে। নাআআআ! এ হতে পারেনা! কিছু একটা করতেই হবে!

ম্যাডাম তার লেকচার শেষ করে ব্যাঙটাকে কাটতে যাচ্ছিল। নিশি এমন সময় চিৎকার করে বলে উঠলো, “ম্যাডাম!”
নাসরিন ম্যাডাম অবাক হয়ে নিশির দিকে তাকালো। “কী হয়েছে নিশি?”
“ম্যাডাম,এই ব্যাঙটাকে কাটবেন না প্লিজ! দেখুন,ওকে উদ্ধার করতে আরেকটা ব্যাঙ এসেছে। হয়তো আজকে এই ব্যাঙটাকে আপনি কেটে কষ্ট দিলে ওই ব্যাঙটাও খুব কষ্ট পাবে। প্লিইজ ম্যাডাম!”
ম্যাডাম তো এসব কথা শুনে আকাশ থেকে পড়লো। আরে! এসব কী বলছে এই পাগল মেয়েটা? ব্যাঙকে ব্যাঙ উদ্ধার করতে এসেছে? এমন আজব কথা কেউ জীবনে শুনেছে? পুরো ল্যাবজুড়ে হাসির একটা মৃদু গুঞ্জনও শোনা গেল। নাসরিন ম্যাডাম সবাইকে থামানোর জন্য বললেন, “সবাই চুপ! একটা শব্দও যেন না শোনা যায়। আর নিশি,তুমি কী বলছ আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
নিশি এবার বলল, “বুঝতে পারছেন না? মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখুন। এই যে,এখানে আরেকটা ব্যাঙ বসে আছে।”
পুরো ক্লাস এবার ঝুঁকে গেল ওদিকে। ব্যাঙটা তখন ভয় পেয়ে কয়েকটা লাফ দিয়ে একটু দূরে সরে গেল। কিন্তু চলে গেল না।
ম্যাডাম বলল, “আরে সত্যিই তে আরেকটা ব্যাঙ!”
নিশি এবার সাহস পেয়ে বলল, “দেখেছেন? ব্যাঙটা আমাদের এতজনকে দেখেও চলে যাচ্ছেনা। আমি নিশ্চিত যে সে এই ব্যাঙটাকে উদ্ধার করতে এসেছে।”
“তুমি কি করে এটা নিশ্চিত হলে? চলে গেল না মানেই একে উদ্ধার করতে এলো?”
“আপনি দেখতে চান প্রমাণ? এই দেখুন। মোক্ষম সুযোগটা এবার কাজে লাগালো নিশি। ঝট করে ম্যাডামের সামনের টেবিলে থাকা ব্যাঙটাকে মুক্ত করে দিলো সে। আর অমনি এক লাফে ব্যাঙটা নিচে পড়লো। এক মুহূর্ত দেরি না করে একসাথে চলে গেল দুটো ব্যাঙ। রুমের সবাই দৃশ্যটা দেখে হতবাক। কী হলো এটা?

* * *
“তুই আর কখনো একা একা অ্যাডভেঞ্চারে যাবি না।”
“আচ্ছা।”
“আর কখনো মানুষের আশেপাশে ঘুরঘুর করবি না।”
“আচ্ছা।”
“আরেকটু হলেই কী বিপদ হতে যাচ্ছিল বলতো?”
এবার শীরপং কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, “তুই-ই তো আমাকে কোনো অ্যাডভেঞ্চারে নিস না কখনও। শুধু একা একা যাস। আমার কি যেতে ইচ্ছা করেনা?”
ওরিয়ং এবার একটু চুপ করে থাকল। ঠিকই তো!
“আচ্ছা ভাইয়া,তুই না বলেছিলি মানুষ খুব খারাপ,খুব নিষ্ঠুর। কিন্তু ওই মেয়েটা তো আমাকে বাঁচালো। তার মানে মানুষও কি ভালো হয়?”
ওরিয়ং কিছু বলল না। ব্যাপারটা কী হলো সেও বুঝতে পারছে না। ওই মেয়েটা সাহায্য না করলে সে আজ কিছুতেই তার বোনকে উদ্ধার করতে পারত না। তার বোনের মতে সে পৃথিবীর সব তথ্য জানলেও এই তথ্যটা তার অজানা। কী আশ্চর্য! মানুষের মনেও দয়া-মায়া আছে? মানুষও ভালো হয়? ওরিয়ং গভীর চিন্তায় পড়ে গেল।
“ভাইয়া,ও আমাকে এতবড় সাহায্য করল। কিন্তু ওকে আমরা ধন্যবাদ পর্যন্ত দিলাম না। এটা কি ঠিক হলো? চল না আমরা ওকে ধন্যবাদ দিতে যাই।”
ওরিয়ং এক মুহূর্ত কিছু একটা ভেবে বলল, “আচ্ছা।”



নিশি কলেজ ক্যাম্পাসে একটা গাছের নিচে বসে আছে। জায়গাটা একটু নির্জন। নিশ্চিন্ত মনে আকাশ দেখা যায়। হঠাৎ একটা অদ্ভুত দৃশ্য তার চোখে পড়লো। দুটো ব্যাঙ লাফাতে লাফাতে তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার একদম কাছে চলে এসেও এরা তার সামনে অনবরত লাফাচ্ছে। লাফাচ্ছে তো লাফাচ্ছেই। থামছেই না। আরে! এসব হচ্ছেটা কী?

নিশি নামের মেয়েটা কখনোই জানতে পারল না ওরিয়ং ও শীরপং নামে দুটো ব্যাঙ কত গভীর আবেগে তাকে ধন্যবাদ জানাতে এসেছিল।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।