প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » সম্পাদকীয় » অথচ এর নাম শিক্ষাব্যবস্থা !!!

অথচ এর নাম শিক্ষাব্যবস্থা !!!

 কাজী মোয়াজ্জমা তাসনিম
শিক্ষানবিস সহ-সম্পাদক | বাংলা ইনিশিয়েটর


“আগামি বছর আবার পরীক্ষা দিবো। মা, বাবাকে বুঝাইছি। সবাই স্বাভাবিক ছিলো, আমিও। কিন্তু একের পর এক প্রতিবেশী সহপাঠীরা মিষ্টি আর কথার খোঁচা নিয়ে হাজির হতে লাগলো। আমার মায়ের মাথা খারাপ হয়ে গেলো।। বাবা ও আমাকে গালিগালাজ করলো। যে মা বাবা গতকাল আমার মাথায় হাত রেখে বলছিলো চিন্তা করিস না, বুড়ো হয়ে যাস নাই। সামনের বার আবার পরীক্ষা দিস, বছর যাইতে কয়দিন। অথচ, প্রতিবেশীদের মিষ্টি পেয়ে সেই বাবা মা আমাকে জুতা দিয়ে পিটালো, শুধু তাই নয়, আমার উপর রাগ করে বাবা পাতের ভাত লাথি মেরে ফেলে দিলো। অনেক চেষ্টা করেছি লুকিয়ে থাকার, পারলাম না। প্রতিবেশীরা এক হাত জিহ্বা বের করে অনুশোচনা করলো, শুধু অনুশোচনা নয়, আমার জন্য নাকি আমার মা দায়ী। মায়ের আস্কারা পেয়ে আমি নষ্ট হয়ে গেছি। তাদের কৈফিয়ত পেয়ে আমার বাবা মা কে উঠানে প্রচুর মেরেছে। মা এখনো বেহুঁশ। মার জ্ঞান ফিরার আগেই পৃথিবীকে বিদায় জানালাম। ভালো থাকবেন প্রতিবেশীরা ভালো থেকো সহপাঠী বন্ধুরা।।”

উপরের সুইসাইড নোটটি এইচএসসি ২০১৭ তে কুমিল্লা বোর্ডের অকৃতকার্য হওয়া এক পরীক্ষার্থীর। শেষমেশ চলেই গেল ছেলেটা। এক রাশ অভিমান নিয়ে।

আমাদের দেশে প্রতিবছর যেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে তার মধ্যে একটা হল পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ। স্কুল- কলেজ মিলিয়ে মোট চারটা পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটা পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয় ঘটা করে। স্বাভাবিকভাবেই সবাই কাঙ্খিত ফলাফল পায় না। এই কাঙ্খিত ফলাফল না পাওয়া দলের একটা বড় অংশের জীবনেই নেমে আসে অভিশাপ। কেউ সেই অভিশাপ থেকে বের হয়ে আসতে সমর্থ্য হয়। কেউ অভিশপ্ত দিনগুলোর বোঝা বইতে না পেরে আত্মঘাতি হয়। বলছি সেই আত্মঘাতি ছেলেমেয়েগুলোর কথা।

বয়স কত ওদের? ১৫-১৮ এর বেশি না। কৈশোর প্রায় শেষ, তারুণ্যের পদধ্বনি শুনতে পাওয়া যায় একটু কান পাতলেই। মাত্র পৃথিবীকে অল্প অল্প জানতে শুরু করা, একটু একটু করে নিজের চারপাশের জগৎটাকে চিনতে থাকা। জীবনটাকে বুঝতে শেখা। এই বয়সটাতে সবকিছুই রংচঙা, সবকিছুই আনন্দদায়ক। জীবনের এই অসাধারণ সময়টাতে কেন কিছু ছেলেমেয়ের সবকিছুর প্রতি বিতৃষ্ণা জাগে? এত তাড়াতাড়ি কেন মনে হয় হেরে গেছি? কেন চলে যেতে হয় ওদের?

কৈশোরের শুরুটাতে অনেক বিভ্রান্তি থাকে। যত সময় যায় ভ্রান্তি কাটে, পরিপক্কতা আসতে থাকে ধীরে ধীরে, শেষের দিকটা হয় টালমাটাল। ছোটমানুষ আর বড়মানুষ- দুটোর মাঝামাঝি জায়গায় দুলতে থাকে ওরা। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে আবেগ আর বাস্তবতার মাঝে যে দেয়ালটা থাকে সেটা এ বয়সে সুগঠিত হয় না। তাই দুটো মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় প্রায়ই। এই হযবরল অবস্থা প্রকাশ পায় যখন তারা কোন সিদ্ধান্ত নেয়। ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া এ বয়সের ধর্ম। ভুলটা যদি অন্য কোন বিষয়ে হয় সেটা শুধরে নেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু সিদ্ধান্তটা যদি ভুল হয় নিজের জীবন নিয়ে, সেটা আর শোধরানোর সুযোগ পাওয়া যায় না। মানুষের জীবন একটাই। সেটা একবার চলে গেলে ফিরিয়ে আনা যায় না কোনভাবেই।

মনে আছে বলেছিলাম এই বয়সটাতে ছেলেমেয়েরা নিজের আশেপাশের জগৎটা চিনতে শুরু করে? কেমন হয় যদি সে সবার আগে মানুষের কুৎসিত রূপটা দেখতে পায়? একটা মানুষ যদি শুরুতেই বুঝতে পারে তার আশেপাশের জগৎটা অদ্ভুত রকমের নিষ্ঠুর তখন সে কী সিদ্ধান্ত নেবে? বাকি সময়টাও সেই জগতে থেকে যাওয়ার নাকি সেই জগত থেকে একেবারে চলে যাওয়ার?

পরীক্ষার রেজাল্ট গুরুত্বপূর্ণ। ভালো রেজাল্ট অবশ্যই দরকার। কিন্তু এই পড়াশোনা, পরীক্ষা, রেজাল্ট ইত্যাদি ইত্যাদি জীবন না, জীবনের একটা অংশ মাত্র। কোনরকম অক্ষরজ্ঞান ছাড়াই অনেক মানুষ তাদের গোটা জীবন পার করে দিচ্ছে। সুতরাং এই পড়ালেখা আর রেজাল্টের জন্য খামোখা কেউ পুরো জীবন শেষ করে দেবে না। এখন হয়ত আপনি নড়েচড়ে বসে ভাবছেন, “মাথা খারাপ নাকি? রেজাল্ট বের হওয়ার সাথে সাথে আত্মহত্যার ঢল নামছে আর সে বলছে আত্মহত্যা নাকি রেজাল্টের জন্য করে না!” জ্বি ঠিকই বলছি। শুধু রেজাল্ট কাউকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয় না। প্ররোচনা দেই আমরা। আমরা তাদের আশেপাশের মানুষরা তাদের প্রতিটা সেকেন্ডে, প্রতিটা মিনিটে তাদের বুঝিয়ে দিতে থাকি তাদের দ্বারা কিছু হবে না। তারা বোঝা। খামোখা পৃথিবীর অক্সিজেনের অপচয় করছে। রেজাল্ট খারাপ হলে স্বাভাবিকভাবেই মানসিকভাবে বিদ্ধস্ত থাকে সবাই। এর মধ্যে আমাদের এই বাড়তি চাপটা নেওয়ার ক্ষমতা সবার থাকে না। যে সময় কাঁদার জন্য একটা কাঁধ দরকার, জড়িয়ে ধরার জন্য একটা বুক দরকার, মাথায় রাখার জন্য একটা হাত দরকার সে সময়টায় সবাই তাদের পিঠ দেখিয়ে চলে যায়। আপনি ফেসবুকে বড় বড় লেকচার দিতে পারবেন, বিশাল সাইজের মোটিভেশনাল পোস্ট দিতে পারবেন, “রেজাল্টই সব না, মেঘ দেখে করিস নে ভয়” টাইপের জ্ঞানগর্ভ বুলি কপচাতে পারবেন, কিন্তু যে ছেলেটা বা মেয়েটা নিজের আপনজনদের কাছ থেকে বিতাড়িত হয়ে দিনের পর দিন অন্ধকার ঘরে নিজেকে বন্দি করে রেখেছে তার ভেতরটা আপনি কখনো বুঝতে পারবেন না। কখনোই না।

পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্টের পর আত্মহত্যা কিন্তু নতুন কোন বিষয় না। অনেক আগে থেকে হচ্ছে, হরহামেশা হচ্ছে, প্রতি বছর প্রতি দফা রেজাল্ট দেওয়ার পরই হচ্ছে। একটা সিস্টেম ফি- সন জীবন কেড়ে নিচ্ছে, একটা সিস্টেম দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য ছেলে মেয়ের লাশের উপর, একটা সিস্টেম মৃত্যু ঘটাচ্ছে বার বার। আমাদের কেন কখনো মনে হয় নি এই সিস্টেমটা বদলানো দরকার? সিস্টেম বদলানোর বদলে আমরা বিষয়টাকে স্বাভাবিক হিসেবেই মেনে নিয়েছি। আমরা ধরেই নিয়েছি পাবলিক রেজাল্ট পাবলিশ হওয়ার পর কিছু ছেলেমেয়ে মরে যাবে।

অথচ এর নাম শিক্ষাব্যবস্থা। যে ব্যবস্থায় ছেলেমেয়েদের শেখানো হয়। আমরা কী শিখছি? অসুস্থ প্রতিযোগিতা। যে প্রতিযোগিতায় বন্ধু হয়ে যায় প্রতিদ্বন্দ্বী, পাশের বাসার ছেলেটা হয়ে যায় বিপক্ষ দল। ফলাফল হিসেবে আমরা নিউটন, আইনস্টাইন, স্টিভ জবসের বদলে পাচ্ছি জীবিত যন্ত্রমানব আর মৃত লাশ।

বড় বড় কথা সবাই বলতে পারে। মোটিভেশনাল স্পিচ দেওয়া এমন কোন আহামরি গুণ না। যদি সত্যিই এই ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু করতে চান সেই অন্ধকার ঘরটাতে ঢুকে পড়ুন। আলো জ্বেলে দিন। শক্ত করে কাঁধটা চাপড়ে দিয়ে বলুন, “কিচ্ছু হয় নাই রে পাগলা। সব ঠিক আছে। আমি জানি তুই পারবি। চল মামার দোকানে যাই। চা খাব।” আপনার আশেপাশেই আছে ওরা। আপনার ভাই, আপনার বোন, আপনার বন্ধু, আপনার সহপাঠী, আপনার প্রতিবেশি- কেউ না কেউ অবশ্যই আছে। প্লিজ ওদের পাশে দাঁড়ান। এই মুহূর্তে আপনাকে ওদের খুব খুব বেশি দরকার।

আর এই যে তুমি, হ্যাঁ তোমাকেই বলছি, যে একবার হলেও মরে যাওয়ার কথা ভাবছো, আশা করি তুমি লেখাটা পড়ছো। না আমি তোমাকে মোটিভেট করার চেষ্টা করছি না। তুমি কি জানো একটা সময় আমিও তোমার জায়গাটায় ছিলাম? খুব মরে যেতে চাইতাম। কোন মতে দাঁতে দাঁত চেপে খারাপ সময়টা পার করে ফেলেছি। কোনরকম মোটিভেশন ছাড়াই একা একা বের হয়ে এসেছি। তুমিও পারবে। বিশ্বাস কর, এখন আমি খুব ভালো আছি। তুমিও ভালো থাকবে। মানুষের জীবনে খারাপ সময় আসে, ভালো সময়ও আসে। খারাপ সময়ে টিকে থাকতে হয় ভালো সময়টা দেখার জন্যই। বেঁচে থাকো। কেন জানো? নিজের জন্য। পরিবার নয়, প্রেমিক- প্রেমিকা নয়, বন্ধু নয়, আত্মীয় স্বজন নয়, শুধুমাত্র নিজের জন্য। ভালো রেজাল্ট, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, ভালো চাকরি, ভালো সিজিপিএ এগুলো জীবনের একটা অংশ মাত্র। জীবন নয়। যারা তোমার খারাপ সময়ে তোমার পাশে থাকে না তাদের জন্য নিজের জীবনটাকে শেষ করে দিও না। নিজের জীবন সবচেয়ে দামি। যে কোন কিছুর চেয়ে অনেক অনেক দামি।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।